Home /News /explained /
Explained: 'নিরপেক্ষ' নীতিতেই হতে পারে যুদ্ধের অবসান, ইউক্রেন কি সেই পথে হাঁটবে?

Explained: 'নিরপেক্ষ' নীতিতেই হতে পারে যুদ্ধের অবসান, ইউক্রেন কি সেই পথে হাঁটবে?

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ

EXPLAINED | Ukraine Russia War : ইতিমধ্যেই যুদ্ধ থামানোর উদ্দেশ্যে ইউক্রেনের নিরপেক্ষতা নীতিকেই সমর্থন করেছেন ইতিহাসবিদ থেকে শুরু করে যুদ্ধ বিশারদরা।

  • Share this:

#নয়াদিল্লি: দেখতে দেখতে পার হয়ে গেল তিন সপ্তাহ। তবুও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামার কোনও লক্ষণ নেই। চলছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ (Ukraine Russia War)। রাশিয়ান সেনাবাহিনীর মুহুর্মুহু গোলা বর্ষণে ইতিমধ্যেই বিধ্বস্ত গোটা ইউক্রেন। ক্রমাগত রাশিয়ান সেনাবাহিনীর আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা মিলছে না ইউক্রেনের সাধারণ নাগরিকদের। তাই রাশিয়ার আক্রমণ থেকে নিজেদের প্রাণ রক্ষায় ইউক্রেনের সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে সে দেশের সেলিব্রেটিরাও দেশ ছেড়ে পালিয়ে অন্য দেশে ঠাঁই নিয়েছেন। তবে ইতিমধ্যেই ইউক্রেনের পাল্টা প্রতিরোধে তাদের গোলা বারুদের কবলে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন বেশ কয়েক হাজার রাশিয়ান সেনা। পরিস্থিতি যে বেশ ভয়াবহ তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

সাম্প্রতিক রাশিয়া-ইউক্রেন (Ukraine Russia War) যুদ্ধ নিয়ে নতুন করে গোটা পৃথিবী জুড়েই যেন ত্রাহি-ত্রাহি রব উঠেছে। কোনও কিছুর বিনিময়ে পিছু হটতে নারাজ মহাশক্তিধর রাশিয়া। রাশিয়ার আগ্রাসনের মাত্রা এতটাই তীব্র যে, সাময়িক যুদ্ধ বিরতি ঘোষণার মধ্যেও তাদের সামরিক আক্রমণ ইউক্রেনের প্রতি জারি রেখেছে রাশিয়ান সামরিক বাহিনী। আর তাতেই স্তম্ভিত গোটা বিশ্ব। তবে সাম্প্রতিক যুদ্ধের আবহে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষে না জড়িয়ে পৃথিবীর অন্যতম শক্তিধর রাশিয়াকে হাতের বদলে পাতে মারতে ইতিমধ্যেই তাদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি ভিসা-মাস্টার কার্ডের লেনদেন বন্ধ করেছে আমেরিকা, ব্রিটেন সহ ইউরোপের একাধিক দেশ। পাশাপাশি ইতিমধ্যেই রাশিয়াকে কোণঠাসা করতে রাশিয়ান বিমানগুলির জন্য আকাশসীমার পথ বন্ধ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এরপরেও কোনও কিছুতেই ভ্রুক্ষেপ নেই রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের। ফলস্বরুপ নিজের অবস্থানেই অনড় রয়েছেন রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট। পাল্টা সাম্প্রতিক যুদ্ধের আবহে ন্যাটোর নর্থ আটলান্টিক ট্রিয়েটি অর্গানাইজেশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে রাশিয়া। তবে ইতিমধ্যেই যুদ্ধ বিরতি নিয়ে বার কয়েক নিজেদের মধ্যে আলোচনায় টেবিলে বসেছেন রাশিয়া-ইউক্রেনের কূটনীতিকরা। এত কিছুর পরেও যুদ্ধ থামার কোনও লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না বিন্দুমাত্র। তবে ইতিমধ্যেই যুদ্ধ থামানোর উদ্দেশ্যে ইউক্রেনের নিরপেক্ষতা নীতিকেই সমর্থন করেছেন ইতিহাসবিদ থেকে শুরু করে যুদ্ধ বিশারদরা। তাঁদের দাবি, শেষ পর্যন্ত ইউক্রেন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করলে তবেই থেমে যেতে পারে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ।

আরও পড়ুন : এক ছোঁয়ায় মৃত্যু! করোনা আবহে নয়া আতঙ্ক 'হার্টল্যান্ড ভাইরাস', জানেন কতটা মারাত্বক?

'নিরপেক্ষতা' নীতি আসলে কী ?

এক কথায় বলতে গেলে নিরপেক্ষতা হল কোনও পক্ষ বাছাই না করা। পাশাপাশি কোনও জোটে আবদ্ধ না হওয়া। কোনও প্রকার জোটে যুক্ত না হয়ে সংঘাতের পথ এড়িয়ে চলা (Ukraine Russia War)। এ বিষয়ে সাম্প্রতিক রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বাতাবরণে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় বিশযুদ্ধের উদাহরণ টেনে স্টকহোম ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের অধ্যাপক তথা "বিশ্ব ইতিহাসে নিরপেক্ষতা" বইটির লেখক মুলার বলেছেন, নিরপেক্ষতাই হল আসল সমাধান। যা সাম্প্রতিক যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারে। এর কারণ বিশ্লেষণ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে অস্ট্রিয়ার উদাহরণ দিয়েছেন তিনি। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ এবং প্রধান রুশ আলোচক ভ্লাদিমির মেডিনস্কিও উল্লেখ করেছেন ইতিমধ্যেই ইউক্রেনের জন্য একটি 'নিরপেক্ষ' মর্যাদার বিষয়টি আলোচিত হয়েছে।

'নিরপেক্ষতা' ইস্যুতে ইউক্রেনের অবস্থান ঠিক কী?

তিন সপ্তাহের তীব্র লড়াইয়ের পর সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে আলোচনার প্রাক্কালে কূটনীতিকরা ইতিমধ্যেই ইউক্রেনের সম্ভাব্য 'নিরপেক্ষতা'-র দিকগুলি খুঁজে বের করেছেন। ওই আলোচনায় বলা হয়েছে, প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন বা প্রজাতন্ত্রে সদস্যপদ পাওয়ার আশায় ইউক্রেন ক্রমশ ন্যাটোর কাছাকাছি চলে আসছে। সাম্প্রতিক ইউক্রেনের এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই ক্ষুব্ধ হয় রাশিয়া। চলতি সপ্তাহের আলোচনাগুলি ইউক্রেনের রক্তক্ষয়ী সঙ্কট থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাব্য উপায়ের আশার আলো নিয়ে এসেছে বলে দাবি করেছেন কূটনীতিকরা। তবে সাম্প্রতিক যুদ্ধ এবং চলতে থাকা আলোচনার মাঝেই ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভলোদিমির জেলেনস্কির স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করেছেন যে, ন্যাটোতে ইউক্রেনের যোগদানের কোনও সম্ভাবনা নেই। এ বিষয়ে আরও একধাপ এগিয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির দফতর থেকে জানানো হয়েছে, যুদ্ধের থামার পরে রাশিয়ান সৈন্যরা পূর্ব ইউক্রেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চলে থাকবে কি না এবং সীমান্ত কোথায় থাকবে তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি ইউক্রেন ওই আলোচনার টেবিলে পশ্চিমি শক্তিধর দেশ গুলির অংশগ্রহনের দাবিও করে ইউক্রেন। এছাড়াও যুদ্ধ থামলে ইউক্রেনের স্থায়ী নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি লিখিত প্রতিশ্রুতি ইতিমধ্যেই দাবি করেছে ইউক্রেন সরকার।

আরও পড়ুন : টি-শার্ট জানাবে হৃদস্পন্দনের হার, আশ্চর্য কাপড় তৈরি করেছেন বিজ্ঞানীরা!

সাম্প্রতিক রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে 'নিরপেক্ষতা' নীতি কি লঙ্ঘন হয়েছে?

সাম্প্রতিক যুদ্ধের আবহে অবশ্য ইউক্রেনের পক্ষথেকে দাবি করা হয়েছে যে, ইউক্রেন একটি নিরপেক্ষ সামরিক মর্যাদা নিয়ে আলোচনা করতে সর্বদা প্রস্তুত। কিন্তু এ বিষয়ে সাম্প্রতিক দু'দেশের বৈঠকে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ এবং প্রধান রুশ আলোচক ভ্লাদিমির মেডিনস্কি প্রকাশ্যে বলেছেন ইউক্রেনের জন্য নিরপেক্ষ অবস্থার বিষয়টি আলোচনার পাশাপাশি চুক্তিবদ্ধ হলেও এই চুক্তির লঙ্ঘন করার কোনও নিশ্চয়তা নেই। এ বিষয়ে সাম্প্রতিক যুদ্ধের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একাধিক সমালোচকরা রাশিয়াকে দোষারোপ করে বলেছেন যে, আন্তর্জাতিক আইন এবং তার নিজস্ব প্রতিশ্রুতিগুলি গুরুতরভাবে লঙ্ঘন করে রাশিয়ায় প্রথম আক্রমণ চালিয়েছে ইউক্রেনের মাটিতে। কিন্তু সমালোচকদের এই দাবিকে নস্যাৎ করে রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন অবশ্য দাবি করেছেন বিশ্বের পশ্চিমি শক্তিধর দেশ গুলি পূর্ব ইউরোপে ন্যাটো সম্প্রসারণ না করার বাধ্যবাধকতাকে লঙ্ঘন করেছে।

'নিরপেক্ষতা' নীতির ধারনাটি এল কোথা থেকে?

মূলত নিরপেক্ষতা এই ধারণাটি প্রথম উত্থাপিত হয় ইউরোপীয় ইউনিয়নে অংশগ্রহণ না করা সুইজারল্যান্ড থেকে। কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠনের সময় ইউরোপের সব দেশ ওই ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্তি হলেও সুইজারল্যান্ড একমাত্র দেশ যে ওই ইউনিয়ন থেকে নিজেদের দূরে রাখে। তবে সাম্প্রতিক রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের (Ukraine Russia War) আবহে ইউরোপীয় ইয়নিয়নের সদস্য না হলেও ইউরোপের বাকি দেশগুলির মতো নিজেদের দেশের আকাশসীমা রাশিয়ান বিমানগুলির জন্য বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় সুইজারল্যান্ড সরকার। এখনও পর্যন্ত শুধুমাত্র জাতি সঙ্ঘের সদস্য দেশ হিসাবেই নিজেদের নাম অন্তভুক্ত করেছে সুইজারল্যান্ড। কিন্তু ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সুইসরা। অন্যান্য দেশগুলিও কঠোর অর্থে নিরপেক্ষতা থেকে বিচ্যুত হয়েছে বলে দাবি করেছে রাশিয়া। এমনকী রাশিয়ার দাবি, ইতিমধ্যেই সুইডিশ বাহিনী প্রতিবেশী নরওয়েতে ন্যাটোর শীতকালীন অনুশীলনে অংশ নিয়েছে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশকে সঙ্গী করে ন্যাটোর ক্রমশ অগ্রসর মনোভাব নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্নও তুলেছে রাশিয়া। পাশাপাশি তাদের সদস্য না হলেও পরোক্ষে ইউক্রেনকে সমর্থন করে ন্যাটো ক্রমশ পূর্ব ইউরোপে তাদের আধিপত্য কায়েম করতে চাইছে বলে দাবি করেছে রাশিয়া সরকার। আর এতেই রাশিয়ার চক্ষুশূল হয়েছে ইউক্রেন।

রাশিয়া- ইউক্রেন যুদ্ধে 'নিরপেক্ষতা' নীতি কতটা কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে?

এ বিষয়ে ইতিহাসবিদ লিও মুলার দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের প্রাক্কালে অস্ট্রিয়ার উদাহরণ টেনে বলেন, নিরপেক্ষতা নীতি সাম্প্রতিক রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে একটি মডেল হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। যা ইউক্রেনের জন্য সর্বোত্তম হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন জার্মানির নাৎজি বাহিনীর সঙ্গে একত্রিত হয়েছিল অস্ট্রিয়া। ওই সময় চারটি জার্মানির বিরুদ্ধে থাকা মিত্রশক্তির চার বাহিনী অস্ট্রিয়া দখল করেছিল। কিন্তু অপ্রত্যাশিত ভাবে যুদ্ধের পর অর্থাৎ ১৯৫৫ সালে ওই চার মিত্র শক্তি তাদের দখলদার বাহিনীকে অস্ট্রিয়ার মাটি থেকে প্রত্যাহার করার পাশাপাশি অস্ট্রিয়াকে স্বাধীন দেশ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এ বিষয়ে ইতিহাসবিদ মুলার দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘর্ষে এই নিরপেক্ষ নীতি ভীষণ কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। যা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারে বলেও মত দিয়েছেন তিনি।

Published by:Sanjukta Sarkar
First published:

Tags: Russia Ukraine War

পরবর্তী খবর