এক সময় এই ছোট রেলই ছিল বহু মানুষের যাতায়াতের ভরসা, জীবিকার মাধ্যম। সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এই ছোট রেলের বগিতে চেপেই বীরভূম থেকে কাটোয়া আসতেন। কথিত আছে, এই রেলের কোচে বসেই তাঁর বহু উপন্যাসের ভাবনা জন্ম নিয়েছিল। সেই ঐতিহ্যবাহী বগিগুলিই আজ জং ধরে, ঝোপজঙ্গলে ঢেকে, কার্যত বিস্মৃতির পথে।
advertisement
ঐতিহাসিক তথ্য বলছে, ১৯১৪ সালে ইংল্যান্ডের স্টাফোর্ডের ডব্লিউ জি বাগনাল অ্যান্ড কোং সংস্থা একে–১৫ নামের স্টিম ইঞ্জিনটি নির্মাণ করে। প্রায় ২৮ টন ওজনের এই ইঞ্জিনটির উচ্চতা ছিল তিন মিটারের বেশি এবং প্রস্থ প্রায় আড়াই মিটার। ইঞ্জিনটি ক্রয় করেছিল ম্যাকলিওড কোম্পানি। ১৯১৫ সালে বর্ধমান–কাটোয়া এবং ১৯১৭ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর কাটোয়া–আমোদপুর রেলপথ চালু হয়। ওই দুই রেলপথের মালিকানা ছিল ম্যাকলিওড কোম্পানির হাতে। ১৯৬৬ সালে কাটোয়ার দুটি ন্যারোগেজ শাখা ভারতীয় রেলের অধীনে আসে। এরপরেও স্টিম ইঞ্জিনটি দীর্ঘদিন চলাচল করেছে। ১৯৯৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত এটি রেলপথে সক্রিয় ছিল।
১৯৯৫ সালের এপ্রিল মাস থেকে স্টিম ইঞ্জিন পরিষেবা বন্ধ করে ডিজেল ইঞ্জিন চালু করা হয়। ফলে কাটোয়া–বর্ধমান ও কাটোয়া–আমোদপুর শাখায় মোট ১৭টি ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। সেই থেকেই ঐতিহাসিক ইঞ্জিনটি এক নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে কাটোয়া স্টেশন চত্বরে স্থায়ীভাবে দাঁড়িয়ে আছে।
২০১৪ সালে কাটোয়া স্টেশনে ন্যারোগেজ পরিষেবা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়। কাটোয়া–বর্ধমান ও কাটোয়া–আমোদপুর শাখায় ন্যারোগেজ তুলে ব্রডগেজ ও বিদ্যুতায়ন সম্পন্ন হয়। ন্যারোগেজ বন্ধ হওয়ার পর ২১টি ছোট লাইনের বগি কারশেডে রেখে দেওয়া হয়। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে সেগুলির কোনও রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি। বগির ভিতর ও বাইরে জন্মেছে ঝোপজঙ্গল, লোহায় ধরেছে মরচে। কোথাও কোথাও বিষধর সাপের উপদ্রবের অভিযোগও উঠছে।
কাটোয়া শহরের বিশিষ্ট শিক্ষক ড. তুষার পণ্ডিত বলেন, “যখন ছোট লাইন ছিল, তখন সেই ট্রেনে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় কাটোয়া আসতেন। তাঁর বিভিন্ন লেখায় কাটোয়া স্টেশনের এবং এই জনপদের উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করেছি সেই কামরাগুলি নোংরা, আবর্জনায় ঢেকেছে। সেখানে অসামাজিক কাজ হচ্ছে বলেও শুনেছি। আমার মনে হয় রেল কর্তৃপক্ষের অবিলম্বে সবটা পরিচ্ছন্ন করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা উচিত।”
স্থানীয়দের আক্ষেপ, প্রায় ৩০ জন চুক্তিভিত্তিক সাফাইকর্মী থাকা সত্ত্বেও ঐতিহ্যবাহী এই কোচগুলির পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কোনও উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। রেলের অবহেলায় একফালি ইতিহাস ক্রমশ মুছে যেতে বসেছে। একসময় যে রেলগাড়ি সবুজ ধানের মাঠ চিরে এগিয়ে যেত, যার ধোঁয়া আর শব্দ গ্রামবাংলার এক আলাদা পরিচয় ছিল, আজ সেই রেলের কোচগুলিই নিশ্চুপ, অবহেলিত হয়ে পড়ে রয়েছে।
আপনার শহরের হাসপাতাল এবং চিকিৎসকদের নামের তালিকা পেতে এখানে Click করুন
একসময় ভারতীয় রেলের গর্ব ছিল স্টিম ইঞ্জিন । তাকে ঘিরে রচিত হয়েছে অসংখ্য স্মৃতি, সাহিত্য, ইতিহাস। আজ সেই স্টিম ইঞ্জিন খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে জং ধরা শরীরে সময়ের নির্মম সাক্ষ্য বহন করছে। অবহেলার ছায়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে কাটোয়ার ছোট রেলের গৌরবময় অধ্যায়।





