দুর্গাপুরের আমরাই গ্রামে রয়েছে কল্যাণী কালীর মন্দির। এখানে দেবী পূজিতা হন তন্ত্রমতে। নিত্য পূজা হয় দেবীর ব্রহ্ম কলসের। দীপান্বিতা অমাবস্যায় জাঁকজমক সহকারে হয় পুজো। কল্যাণী কালী মন্দির প্রতিষ্ঠার পিছনে রয়েছে এক সুদীর্ঘ ইতিহাস।
পরিবারের সদস্যরা বলেন, কাটোয়ার ব্যানার্জি পরিবারের মাতুলালয় ছিল আমরাই গ্রামে। পরবর্তীকালে ব্যানার্জীর পরিবার এখানে বসবাস শুরু করেন। পরিবারের এক মেয়ে কল্যাণী, নিত্য দিনের মতো গ্রামের উত্তর পশ্চিম প্রান্তে তামলা পুকুরে স্নান করতে যান। দুই সহযোগীকে নিয়ে স্নান করতে যান তিনি। কিন্তু জলে নেমে হঠাৎই তলিয়ে যান কল্যাণী। খবর যায় পরিবারের কাছে। পুকুরের পাড় কেটে বের করে দেওয়া হয় জল। কিন্তু সন্ধ্যে নেমে আসায় বন্ধ হয়ে যায় কাজ। সে সময় কল্যাণী তার বাবাকে জানান তিনি যেন দুশ্চিন্তা না করেন. কল্যাণী ব্রহ্ম মুহুর্তে বাড়ি ফিরে আসবেন।
advertisement
নিখোঁজ হওয়ার পরে তৃতীয় দিনের সূর্যোদয়ের সময় জল থেকে উঠে আসেন কল্যাণী। সঙ্গে নিয়ে আসেন ব্রহ্ম কলস। আশ্চর্যজনকভাবে সেসময়ই স্বপ্নাদেশ পেয়ে গ্রামের এক ঢাকি পুকুর ঘাটে হাজির হন। তারপর কল্যাণী বাড়ির ঈশান কোনে এক জায়গায় গিয়ে দাঁড়ান। সেখানে বরণ করা হয় তাকে। অস্থায়ীভাবে তৈরি করা হয় একটি মন্দির। প্রতিস্থাপন করা হয় ব্রহ্ম কলস। তারপর থেকে আজও চলে আসছে সেই একই নিয়ম। দীপান্বিতা অমাবস্যায় মূর্তিপুজো হলেও, বছরভর এখানে ব্রহ্ম কলসের নিত্য পুজো হয়। পরিবারের সদস্যদের দাবি চলতি বছরে ৩২০ তম বর্ষে পদার্পণ করেছে এই পুজো।
আমরাইয়ের কল্যাণী কালীর মূর্তি তৈরিতে খরচ হয় মাত্র এক টাকা। এর পিছনে রয়েছে এক ইতিহাস। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, বংশপরম্পরায় এই মূর্তি তৈরি করে আসছেন এক সূত্রধর পরিবার। সে সময় মৃৎশিল্পীরা কোনও উত্তরাধিকার ছিলনা। দেবীর কৃপায় তিনি সন্তান লাভ করেন। তারপর থেকে বিনামূল্যে তৈরি করতেন এই মূর্তি। এখনো পর্যন্ত চলে আসছে সেই নিয়ম। দেবী মূর্তি তৈরি করতে কোন টাকা নেন না সূত্রধর পরিবারের সদস্যরা। এমনকি মাটিও আসে বিনামূল্যে। পরিবারের সদস্যরা প্রতিকী রূপে ষোলআনা দেন মৃৎশিল্পীকে। যদিও সেই টাকা মৃৎশিল্পী বেদীতে রেখে যান। তিন শতাব্দীপ্রাচীন এই পুজোয় এখনো চলছে একই নিয়ম।
এখানে তন্ত্রচারে পুজো হয়। সারারাত চলে পুজোপর্ব। গ্রামের মানুষদের কাছে আজও মা সাক্ষাৎ আপন ব্রহ্মময়ী দেবী। গ্রামের মানুষদের মুখে মুখে ছড়ায় কল্যাণী কালীবাড়ির এই মায়ের কথা। পুজোর সময় তামলা পুকুর থেকে ঢন্ডি কেটে ভক্তরা আসেন এই কালী মন্দিরে। সারা বছর নিত্য পূজো হলেও, কার্তিক মাসের দীপান্বিতা অমাবস্যায় বাৎসরিক এই মহোৎসবে দেবী মূর্তি নির্মিত হয়। ভাইফোঁটার দিন মৃন্ময়ী মূর্তির বিসর্জন করা হয়। কল্যাণী দেবীর নাম অনুসারে এই মৃন্ময়ী মা কল্যাণী কালী মাতা নামেই পরিচিত বহুল পরিচিত।
Nayan Ghosh






