হোম /খবর /ফিচার /
অগ্নিকন্যা দুকড়িবালা, বিপ্লবীদের 'মাসিমা', আজও স্তম্ভিত করে যে কাহিনি

Independence Day 2021: অগ্নিকন্যা দুকড়িবালা, বিপ্লবীদের 'মাসিমা', আজও স্তম্ভিত করে যে কাহিনি

দুকড়িবালা দেবী, আজও যাঁর নামে প্রণত বীরভূম।

দুকড়িবালা দেবী, আজও যাঁর নামে প্রণত বীরভূম।

Independence Day 2021: 'তোমরা যদি দেশের জন্য প্রাণ দিতে পারো, তোমাদের মেয়েরাও পারে'- দুকড়িবালার সেই কথাই ছিল সেদিনের অগ্নিমন্ত্র।

  • Last Updated :
  • Share this:

#মাধব দাস, বীরভূম: 'তোমরা যদি দেশের জন্য প্রাণ দিতে পারো, তোমাদের মেয়েরাও পারে'। এটাই ছিল বীরভূমের দুকড়িবালা দেবীর মন্ত্র। আর এই মন্ত্রকে পাথেয় করেই স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়া। বীরভূমের এই দুকড়িবালা দেবীই হলেন পরাধীন ভারতের প্রথম অস্ত্র আইনে দণ্ডিতা মহিলা। তৎকালীন ব্রিটিশ শাসনের পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে দেশকে স্বাধীনতা দিতে বীরভূমের এই স্বাধীনতা সংগ্রামীর অবদান ইতিহাসের স্বর্ণাক্ষরে লেখা অধ্যায়। সেই মহাজীবন কেউ ভোলে, কেউ কখনও ভোলে না।

দুকড়িবালা দেবী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কাছে 'মাসিমা' বলে পরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন বীরভূমের নলহাটির প্রত্যন্ত এক গ্রাম ঝাউপাড়ার বাসিন্দা। যে গ্রামটি ব্রাহ্মণী নদী ঘেঁষা এবং ব্রাহ্মণী নদী ও তিরপিতা নদী দিয়ে ঘেরা। দুকড়িবালা দেবীর বোনপো নিবারণ ঘটক সরাসরি স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। আর এই নিবারণ ঘটকই স্বদেশী আন্দোলনকারীদের জন্য গোপন আস্তানা হিসাবে মাসিমার বাড়ি অর্থাৎ ঝাউপাড়াকে বেছে নিয়েছিলেন। একদিন এই ঝাউপাড়াতেই এসেছিলেন বিপ্লবী বিপিনবিহারী গাঙ্গুলী। তাঁর কাছেই দুকড়িবালা দেবী বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিতা হন।

এর পরেই শুরু হয় দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে রক্ষা করার জন্য দুকড়িবালা দেবী অদম্য সংগ্রাম। একদিন গরুর গাড়িতে স্টিল ট্যাঙ্কের মধ্যে ভরে জার্মানির মাওজার পিস্তল এবং গোলাবারুদ ফোর্ট উইলিয়াম ক্যান্টমেন্টে আসছিল। এই অস্ত্র আনার জন্য বেশ কয়েকটি গরুর গাড়ির প্রয়োজন হয়েছিল ব্রিটিশদের। সেই সকল গরুর গাড়ির একটি গরুর গাড়ির গাড়োয়ান সেজে জনৈক এক বিপ্লবী অস্ত্র-গুলিকে পাচার করেন চন্দননগরের গোন্দলপাড়ার ক্ষেত্র বাবুর বাড়িতে গোপন আস্তানায়। সেখান থেকে আটটি মাওজার পিস্তল এবং দুটি বাক্স আসে নলহাটির ঝাউপাড়ার মাসিমার বাড়িতে।

পরে দলেরই কারও বিশ্বাঘাতকতায় ব্রিটিশরা সেই খবর জানতে পারে। ব্রিটিশ পুলিশরা খবর পেয়ে গোন্দলপাড়ার ক্ষেত্র বাবুর গোপন আস্তানা সম্পর্কে জানতে পারলে সেখানে হানা দেয়। সেখান থেকে উদ্ধার হয় বেশ কিছু স্বদেশি কাগজপত্র এবং একটি চিঠি। যে চিঠিতেই মাসিমা অর্থাৎ দুকড়িবালা দেবী বাড়িতে এই লুঠ করা অস্ত্রশস্ত্র রয়েছে তার আভাস দেওয়া ছিল। চিঠিতে লেখা ছিল, 'নদীর ধার ঘেঁষা গ্রাম বাঁশঝাড় ওয়ালা জঙ্গলে পূর্ণ। সেখানে মাসিমার কাছে ফুলের চারা ও বীজ রয়েছে। মাসিমা ফায়ার করতে জানেন।'

দুকড়িবালা দেবীর নাতি অশোক কুমার চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা বলেছিলাম আমরা। তিনি জানিয়েছেন, এই চিঠিতে কেবলমাত্র 'ফায়ার করতে জানেন' এই সূত্র ধরেই ব্রিটিশরা মাসিমার খোঁজ শুরু হয়। বছর ধরে খোঁজাখুঁজির পর এই দায়িত্বে থাকা তৎকালীন সিআইডি ইন্সপেক্টর সুবোধ চক্রবর্তী নন্দীগ্রামের এক বিয়েবাড়িতে যান বরযাত্রী সেজে। সেখানেই তিনি জানতে পারেন ঝাউপাড়ার মাসিমার খবর। আর এই খবর মিলতেই শুরু হয় ব্রিটিশদের তৎপরতা। ১৯১৭ সালের ৭ জানুয়ারি পুলিশ বাহিনী নিয়ে নলহাটি থানা থেকে দারোগাবাবু যান ঝাউপাড়ায়। রাতেই দলবল নিয়ে ঘিরে ফেলা হয় মাসিমার বাড়ি। আর এর পরেই শুরু হয় সেই হাড়হিম করা সেদিনের ভোররাতের অজানা কাহিনি।

রাতেই দলবল নিয়ে ব্রিটিশরা মাসিমার বাড়ি ঘেরাও করে। রাতে অবশ্য তা টের পাওয়া যায়নি। তবে ভোর হওয়ার আগেই মাসিমার কানে ফিসফিস আওয়াজ আসে। আসলে যে দিন থেকে এই ঘরে অস্ত্র এসেছিল সেদিন থেকেই মাসিমা গভীর নিদ্রা ভুলে গিয়েছিলেন। মাসিমা বাইরে ফিসফিস আওয়াজ শুনে তা পরীক্ষা করার জন্য খুব সাবধানে দরজার কাছে গিয়ে কান পাতলেন। শোনা গেল ফিসফিস আওয়াজের সাথে ভারী জুতোর খুট খাট শব্দ। তার পরেই আসন্ন বিপদের কথা স্মরণ করে মানসিক প্রস্তুতি শুরু করেন। তিনি সেই মন্ত্রী দীক্ষিতা, যেখানে বুকের রক্ত দিয়েও বিপ্লবীদের অস্ত্র রক্ষা করার জন্য প্রতিজ্ঞ হোন। এরপর গীতা স্মরণ করে বালিশের তলা থেকে হাতে তুলে নিলেন পিস্তল।

বিপর্যয় খুব ভয়ঙ্কর তা বুঝতে পেরে বাক্স খুলে আরও দুটি পিস্তল কোমরে গুঁজে নেন। পরমুহুর্তেই ছেলেকে ধীরে ধীরে ঘুম থেকে ওঠান। পুলিশের আগমনের কথা তাঁকে জানান এবং বলেন 'পুলিশ যদি কিছু জিজ্ঞাসা করে তোমরা শুধু কাঁদবে। অন্য কিছু বললেই পুলিশ তোমাদের মাকে মেরে ফেলবে'। এরপর দুকড়িবালা দেবী বাড়ির কাজের লোক পাঁচকড়ি লেটকে জাগান। তার মাথায় বাক্স দিয়ে সশস্ত্র সৈনিকের মতো পাহারা দিয়ে মাসিমা প্রতিবেশী সুরধনী মোল্লানির বাড়িতে তা লুকিয়ে রাখতে নির্দেশ দিলেন।

কিন্তু এখানেই কিছুটা গন্ডগোল বেঁধে যায়। মোল্লানি খুব একটা শিক্ষিত ছিলেন না। পাশাপাশি তার চেপে কথা বলার স্বভাব ছিল না। তিনি চেঁচিয়ে বলেন, 'ওরে পাঁচকড়ি, ওসব বাবা রাখবি না।' সেই মুহূর্তে ওকে চুপ করানোর জন্য মাসিমা এগিয়ে গেলেও ততক্ষণে বাড়ির পাশ দিয়ে প্রাতঃভ্রমণে যাওয়া গ্রামের নায়েব নিলিনী রায় সব শুনে ফেলেছেন।এদিকে পুলিশ ধৈর্য হারিয়ে দরজায় ধাক্কা দিতে শুরু করেছে। দুকড়িবালা দেবী কোন কিছু না জানার ভান করে ঘুম থেকে ওঠার মত ভাব করে জিজ্ঞাসা করেন, 'কে?' সঙ্গে সঙ্গে তারা পুলিশ পরিচয় দিয়ে বলেন, তার বাড়ি সার্চ করা হবে। তবে পুলিশের সেই হুংকারে কোনরকম ভীত না হয়ে দুকড়িবালা দেবী পাল্টা জানান, "এখনো সকাল হয়নি। পুরুষ অভিভাবকহীন এই বাড়ি। লোকজন জেগে না ওঠা পর্যন্ত বাড়ি খোলা হবে না। অপেক্ষা করতে হবে।" এরপর সকালবেলা পুলিশ ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট, জমিদারের গোমস্তা এবং গ্রামের কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তির উপস্থিতিতে বাপের বাড়ী ও স্বামীর বাড়ি সার্চ করলেও কিছু পায়নি।

দীর্ঘক্ষণ ধরে সার্চ করার পর কিছু না পাওয়ায় পুলিশ ক্ষেপে ওঠে। তান্ডব আর অত্যাচার শুরু করা হয় বাড়ির মধ্যে। বাড়ির বইপত্র, জিনিসপত্র এবং খাদ্য সামগ্রী নষ্ট করে দেওয়ার পরও দুকড়িবালা দেবী এবং তার বাড়ির সদস্যরা কেউ ঘুণাক্ষরে কিছু টের পেতে দেননি যে সেসকল অস্ত্রশস্ত্র অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর এই তল্লাশি চালানোর সময় বাড়ি থেকে বেশকিছু বিপ্লবী বই এবং কাগজপত্র বাজেয়াপ্ত করা হয়। তবে তখনও অস্ত্রের সন্ধান মেলেনি ব্রিটিশ পুলিশদের।

এরপরই শুরু হয় আরও এক বিশ্বাসঘাতকের কর্মকাণ্ড। ভোরবেলায় প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে নলিনী রায় জানতে পেরেছিলেন কোথায় গোপন বাক্স সরিয়ে রাখা হয়েছে। পুলিশ যখন ব্যর্থ হয়ে ফিরতে চলেছে ঠিক সেইসময় ওই নলিনী রায় এবং গ্রামের জমিদারের তৎকালীন নায়েব কিছু উৎকোচের লোভে সুরধনী মোল্লানির বাড়ি ইশারা করে দেখিয়ে দেন। তারপরেই সিআইডি ইন্সপেক্টর সুবোধ চক্রবর্তী এবং সাব ডিভিশনাল পুলিশ ইন্সপেক্টর অন্নদাবাবু সদলবলে ওই বাড়ি সার্চ করতে শুরু করেন। এর পরেই সেই গোপন বাক্সের সন্ধান মেলে। গ্রেপ্তার করা হয় দুকড়িবালা দেবী এবং সুরধনী মোল্লানিকে। তারপর তাদের রাখা হয় নলহাটি থানায়। ৯ জানুয়ারি তাদের রামপুরহাট এসডিও আদালতে তোলা হয়। সেখানে সুরধনী মোল্লানি জামিন পেলেও দুকড়িবালা দেবী জামিন পাননি।বিচারের প্রস্তুতির নামে দুকড়িবালা দেবীর উপর অকথ্য অত্যাচার শুরু করে পুলিশ। তবে এমন অত্যাচারের পরেও তার মুখ থেকে একটাও শব্দ বের করতে পারেনি ব্রিটিশ পুলিশরা। পরের স্পেশাল ট্রাইবুনাল কেসে সিউড়িতে বিচার শুরু হলে অস্ত্র আইনের ধারায় ৮ মার্চ ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে তার কারাদণ্ড হয়। বিচারক তাকে দু'বছর ছয় মাসের জন্য কারাদণ্ডের সাজা দেন। তাকে পাঠানো হয় প্রেসিডেন্সি জেলে। তিনিই পরাধীন ভারতের প্রথম মহিলা যিনি অস্ত্র আইনে দণ্ডিত হয়েছিলেন। প্রেসিডেন্সি জেলেও অন্যান্য খবরের জন্য তার ওপর অকথ্য অত্যাচার চলে, তবে তাঁর মুখ থেকে একটিও সূত্র পায়নি পুলিশ। পরবর্তীতে জেল থেকে বেরিয়ে তিনি সমাজসেবামূলক কাজে নিযুক্ত হন।

বীরভূম তথা ভারতের এই মহীয়সী মহিলা ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দের ২১ জুলাই বীরভূমের নলহাটি থানার ঝাউপাড়া গ্রামের নীলমণি চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পরে বিয়ে হয় গ্রামেরই ফণীভূষণ চক্রবর্তীর সাথে। তাঁর তিন সন্তান। প্রথম সন্তান সুধীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, দ্বিতীয় সন্তান সৌরেন্দ্র কুমার চক্রবর্তী এবং তৃতীয় সন্তান সমরেন্দ্র কুমার চক্রবর্তী। এই মহীয়সী মহিলা পরে ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের ২৮ এপ্রিল বার্ধক্যজনিত কারণে অমরত্ব লাভ করেন।

তবে এই দুকড়িবালা দেবীর উত্তরসূরী অশোক কুমার চক্রবর্তী (নাতি) এবং সৌরভ কুমার চক্রবর্তী (দুকড়িবালা দেবীর আরেক নাতি সুভাষ চক্রবর্তীর ছেলে) আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন, দুকড়িবালা দেবীর নামে তেমন কোনো স্মৃতির নিদর্শন নেই জেলায়। গ্রামের রয়েছে কেবল মাত্র একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, যা তাঁর নামে নামাঙ্কিত। অশোক কুমার চক্রবর্তী চান, রামপুরহাট অথবা নলহাটি এলাকায় তাঁর নামে একটি আবক্ষ মূর্তি অথবা কিছু একটা তৈরি করা হোক প্রশাসনিক উদ্যোগে। পাশাপাশি তিনি জানিয়েছেন, এরাঙ্গি থেকে ঝাউপাড়া যাওয়ার মাঝে তিরপিতা নদীর (ছোট নদী) উপর চামার ঘাঁটির ঘাটে একটি সেতু তৈরি করা হোক। এই সেতুর নামকরণ করা হোক দুকড়িবালা দেবীর নামে।

Published by:Arka Deb
First published:

Tags: Birbhum, Independence day 2021