বয়স সত্তরের কোঠা পেরোলেও, কাজের প্রতি তাঁদের নিষ্ঠা ও হার না মানা উদ্যম যেকোনও যুবককেও হার মানাতে বাধ্য। প্রতিদিন বিকেল হলেই মতিলালবাবু আগুনের আঁচে গরম তেলের সামনে বসে নিপুণ হাতে চপ-বেগুনি ভাজতে শুরু করেন। আর তাঁর স্ত্রী সেই মুচমুচে গরম তেলেভাজা কাগজের ঠোঙায় মুড়ে হাসিমুখে তুলে দেন দোকানে আসা অগণিত ক্রেতাদের হাতে।
advertisement
বয়সের ভারে শরীরে ক্লান্তি আসে ঠিকই, কিন্তু একে অপরের যোগ্য পরিপূরক হয়ে এই কাজ তাঁরা করে চলেছেন পরম মমতায় ও অভ্যাসবশে। তবে এই দোকানের সবচেয়ে বড় চমক বা আকর্ষণ হল এর দাম। বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির বাজারে যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আকাশছোঁয়া, কাঁচামাল থেকে শুরু করে ভোজ্য তেলের দাম অগ্নিমূল্য এবং অন্যান্য দোকানে তেলেভাজার দাম যখন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, তখন এই বৃদ্ধ দম্পতি অবাক করে দিয়ে সমস্ত তেলেভাজা বিক্রি করছেন মাত্র পাঁচ টাকায়! হ্যাঁ, মাত্র ৫ টাকাতেই এখানে মেলে গরম গরম চপ বা বেগুনি।
লাভের অঙ্ক খুব সামান্য, কোনওমতে হয়ত দিন গুজরান হয়। কিন্তু ক্রেতাদের তৃপ্তি, ভালবাসা আর প্রতিদিনের চেনা মুখগুলোতেই তাঁরা নিজেদের আসল প্রাপ্তি খুঁজে নেন। বেশি মুনাফার লোভ তাঁদের কখনও গ্রাস করতে পারেনি।এই নামমাত্র দাম এবং অসাধারণ ঘরোয়া স্বাদের কারণে প্রতিদিন বিকেল থেকেই দোকানে উপচে পড়ে ভিড়। জাতীয় সড়ক দিয়ে যাতায়াত করা বহু লরি চালক, গাড়ির যাত্রী থেকে শুরু করে স্থানীয় গ্রামের মানুষজন—সবাই তাঁদের এই দোকানের বাঁধা খদ্দের। গরম চপের সঙ্গে সঙ্গে সেখানে জমে ওঠে সান্ধ্যকালীন আড্ডাও।
কারও কাছে হাত না পেতে, বয়সের কাছে হার না মেনে, কোনও সাহায্যের আশায় বসে না থেকে এই বৃদ্ধ দম্পতি যেভাবে সৎ পথে কঠোর পরিশ্রম করে চলেছেন, তা আজ সমগ্র এলাকার মানুষের কাছে এক বিরাট দৃষ্টান্ত। সায়াপাড়ার এই ভাঙাচোরা দোকানটি আজ শুধু মুখরোচক তেলেভাজার জন্যই বিখ্যাত নয়, বরং এক অদম্য জীবনসংগ্রাম এবং পারস্পরিক নির্ভরতার প্রতীক হিসেবেই পরিচিত হয়ে উঠেছে। তাঁদের এই প্রতিদিনের দিনযাপনের লড়াই এবং অল্পতে খুশি থাকার মানসিকতা আজ সমাজের কাছে এক বড় অনুপ্রেরণা।
রঞ্জন চন্দ





