সত্তর-আশির দশকে শালপাতার থালা ছাড়া বিয়েবাড়ির কথা কল্পনাই করা যেত না। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চেনা ছবিটা আজ প্রায় মুছে যেতে বসেছে। আধুনিকতার স্রোতে, থার্মোকল আর কাগজের প্লেটের দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে জঙ্গলমহলের আদিবাসীদের চিরচেনা জীবিকা। এক সময় জঙ্গল থেকে শালপাতা কুড়িয়েই যাঁদের সংসার চলত, সন্তানরা মানুষ হত, আজ তাঁদের হাতে আর কাজ নেই। পূর্ব বর্ধমান জেলার আউশগ্রাম ব্লকে বনদফতরের উদ্যোগে গড়ে ওঠা সরকারি শালপাতার প্লেট তৈরির কারখানাগুলিও আজ তালাবন্ধ।
advertisement
আরও পড়ুনঃ গরু চড়াতে গিয়ে যমের মুখোমুখি! বৃদ্ধকে শুঁড়ে তুলে আছড়ে আছড়ে মারল বুনো হাতি, বাঘমুন্ডিতে তুমুল আতঙ্ক
ভাল্কি অঞ্চলের ডোমবাঁধি এবং অমরপুর অঞ্চলের আমজুরুলিয়া এই দুই এলাকায় আদিবাসীদের স্বনির্ভর করে তোলার লক্ষ্যে কারখানা গড়ে তুলেছিল বনদফতর। বন সুরক্ষা কমিটির সদস্যদের কাজ দেওয়া হয়েছিল সেখানে। ২০১৯-২০ অর্থবর্ষে ডোমবাঁধিতে গড়ে ওঠা কারখানায় সেলাই মেশিন থেকে শুরু করে প্লেট তৈরির আধুনিক মেশিন বসানো হয়েছিল। বহু আদিবাসী পরিবার সেখান থেকেই রুজি রোজগারের পথ খুঁজে পেয়েছিলেন। আজ সেই কারখানাগুলিতে ঝাঁপ পড়ে রয়েছে। ঘরের ভিতরে পড়ে পড়ে নষ্ট হচ্ছে লক্ষাধিক টাকার মেশিন। কেউ পেশা বদল করে দিনমজুর হয়েছেন, কেউ অন্যের দোকানে খেটে সংসারের হাল ধরছেন। অনেক মহিলা আবার বাধ্য হয়ে কৃষিকাজেই ফিরে গিয়েছেন।
কারখানায় কাজ করা শ্রমিকদের কথায়, শালপাতার প্লেট তৈরি করে আর সংসার চলছে না। জঙ্গল থেকে দু’হাজার পিস শালপাতা সংগ্রহ করতে মজুরি লাগে প্রায় ৮০০ টাকা। সেলাই বাবদ খরচ ১৩০ টাকা, মেশিনে প্লেট বানাতে আরও ১০০ টাকা। তার সঙ্গে যোগ হয় টোটো ভাড়া ও বিদ্যুৎ বিল, সব মিলিয়ে খরচ দাঁড়ায় প্রায় ১,১৩০ টাকা। অথচ বাজারে সেই দু’হাজার পিস শালপাতার প্লেট বিক্রি করে আদিবাসীরা পান মাত্র ৭৫০ থেকে বড়জোর ৯৫০ টাকা। লোকসানের এই অঙ্ক কাঁধে নিয়ে আর কেউ কারখানা চালাতে রাজি নন।
আপনার শহরের হাসপাতাল এবং চিকিৎসকদের নামের তালিকা পেতে এখানে Click করুন
ডোমবাঁধি গ্রামের বাসিন্দা বৈদ্যনাথ টুডু আক্ষেপের সুরে বলেন, “লোকসান করে কতদিন আর চলবে? বনদফতর যদি আমাদের কলকাতার বাজারে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করত, তাহলে হয়তো আবার এই পেশাটা বাঁচানো যেত।” সুজাতা কোঁড়া ও রবিনা কিস্কুদের চোখেও আজ শুধুই হতাশা। তাঁদের কথায়, “এক সময় জঙ্গল থেকে পাতা কুড়িয়েই ছেলে-মেয়েদের মানুষ করেছি। আজ বাজারে ৪৫০ থেকে ৬০০ টাকায় থার্মোকল আর কাগজের প্লেট মিলছে। শালপাতার সেই আবেগ আর কদর সবই অতীত।”
পূর্ব বর্ধমান জেলার ডিএফও সঞ্চিতা শর্মা জানান, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। তিনি বলেন, “আমি সংশ্লিষ্ট রেঞ্জারদের সঙ্গে কথা বলে উদ্যোগ নেব।” এক সময় যে শালপাতা ছিল জঙ্গলমহলের আদিবাসীদের জীবনের অবলম্বন, আজ সেই শালপাতাই হারিয়ে যেতে বসেছে আধুনিকতার ভিড়ে। বনদফতরের উদ্দেশ্য ছিল উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে শালপাতার প্লেটে নতুন রূপ দেওয়া, সৌন্দর্যায়ন করা। কিন্তু সেই আধুনিকতার ঢেউতেই আজ অস্তিত্বের সংকটে আদিবাসীদের চিরাচরিত জীবিকা। প্রশাসনের সক্রিয় হস্তক্ষেপ ছাড়া হয়তো আর ফিরবে না শালপাতার সেই সবুজ দিন, হারিয়ে যাবে জঙ্গলমহলের এক টুকরো ঐতিহ্য, এক টুকরো আবেগ।





