বর্ধমান শহরের নতুনপল্লী এলাকার বাসিন্দা স্বরূপা দাস। বর্তমানে বর্ধমান শহরের রেলওয়ে বিদ্যাপীঠের বাংলার শিক্ষিকা তিনি। তবে তার শিক্ষিকা হওয়ার পথটা ছিল না খুব একটা মসৃণ নানা চড়াই-উতরাই-এর মধ্যে দিয়ে পেরিয়েছে তার জীবন। তার জন্ম আর পাঁচটা শিশুর মতোই কিন্তু মাত্র ১০ মাস বয়সেই ঘটেছিল জীবনের প্রথম ছদ্মপতন। ধরা পড়ে,স্পাইনাল কডে টিউমার। অপারেশনের পর থেকেই কোমরের নিচের অংশ হয়ে যায় সম্পূর্ণ প্যারালাইস, শুরু হয় নতুন জীবন যুদ্ধ। নানা বাধা পেরিয়ে স্কুলে ভর্তি হলেও ৭-৮ এ পড়ার সময় সহপাঠীদের কটুক্তিতে চলে গেছিলেন ডিপ্রেশনে। সেই সময় পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন স্কুলেরই এক শিক্ষিকা, তার বলা কিছু কথাই বদলে দিয়েছিল তার জীবন। সেটাই ছিল জীবনের টার্নিং পয়েন্ট, তিনি ঠিক করেছিলেন শিক্ষিকা হবেন। উচ্চ মাধ্যমিকের জেলায় ছাত্রীদের মধ্যে প্রথম এবং রাজ্যে ২০ জনের মধ্যে একজন হন তিনি। কিন্তু লড়াই যেন পিছু ছাড়ছিল না স্বরূপার। কলেজে পড়ার সময় আবারও ঘটে জীবনে ছন্দপতন হঠাৎই ধরা পড়ে কিডনি সমস্যা। কিন্তু কোনও কিছুই আর আটকাতে পারেনি তাকে।
advertisement
স্বরূপা বলেন, “লড়াইটা ছিল খুব কঠিন, কিন্তু আমার মা বাবা সেই কঠিন লড়াইটা লড়ে ছিল। স্কুল জীবনের কিছু বন্ধুর সাহায্য পেলেও, কলেজ জীবনের কারও সাহায্য পাইনি, পাইনি ভাল বন্ধু। বাবা বা কাকা দোতলাতে ক্লাসে তুলে দিয়ে আসতেন। এভাবেই শেষ করি কলেজ। তারপর বাংলায় এম এ-ও করি। এম.এ করে SSC দিয়ে চাকরি পেলেও স্কুল কর্তৃপক্ষ প্রথমে আমাকে নিতে চাইনি। বলা হয়েছিল আমি নাকি পড়াতে পারব না। অনেক যুদ্ধের পর ঠিক হয় একমাস নজরদারি রাখা হবে আমি কেমন পড়াচ্ছি। আজ ২০ বছর শিক্ষকতা করছি সেই স্কুলেই। বর্তমানে সহকর্মী সকলে আমার বন্ধুর মতো।”
আপনার শহরের হাসপাতাল এবং চিকিৎসকদের নামের তালিকা পেতে এখানে Click করুন
শিক্ষকতার পাশাপাশি লেখালেখি করতে ও ঘুরতে ভালবাসেন স্বরূপা। হুইলচেয়ার আর ক্যাথিটারকে সঙ্গী করেই ঘুরেছেন কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী। আর তার এই যুদ্ধে তার সর্বক্ষণের সঙ্গী তার কাকা। তিনি যেন তার বেস্ট ফ্রেন্ড। স্বরূপার কাকা বারিন দাস বলেন, “স্বরূপা প্রমাণ করে দেখিয়ে দিয়েছে ইচ্ছাশক্তি থাকলে এই অবস্থাতেও কোথায় পৌঁছনো যায়। এটা আমাদের কাছে গৌরবের। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই ভাবে আমরা কিছু করতে পারছি না, হাল ছেড়ে দেয়। তাদের শেখা উচিত স্ট্রাগেল কাকে বলে।” শরীরের সীমাবদ্ধতা কোনওদিন স্বপ্নের সীমানা হতে পারে না, তা প্রমাণ করেছেন স্বরূপা। একসময় যার জন্য বন্ধ হয়েছিল স্কুলের দরজা, আজ তাঁরই হাত ধরে খুলছে আগামীর শত শত পড়ুয়ার ভবিষ্যতের দরজা।





