নাতনিকে শিক্ষিকা করবেন, কথা রাখতে অটোকেই ঘরবাড়ি বানিয়ে নিয়েছেন এই বৃদ্ধ

দেশরাজ সিং৷

দেশরাজের বড় ছেলে ২০১৬ সালে ৪০ বছর বয়সে পথ দুর্ঘটনায় মারা যান৷ সাত দিন ছেলের মৃতদেহের খোঁজ পাননি তিনি৷

  • Share this:

    #মুম্বাই: বয়স ৭৫৷ অকালেই হারিয়েছেন দুই ছেলেকে৷ বুকের পাথরের মতো জমে আছে শোক, তার পরেও ভেঙে পড়েননি তিনি৷ বরং নিজের নাতনিকে উচ্চশিক্ষা দিতে বিক্রি করে বাড়ি বিক্রি করে দিয়ে নিজের অটোকেই ঘরবাড়ি বানিয়ে নিয়েছেন দেশরাজ সিং৷ মুম্বাইয়ের ৭৫ বছর বয়সি এই অটোচালকের কাহিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় জানতে পেরে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে চেয়েছেন অনেকেই৷

    দেশরাজের বড় ছেলে ২০১৬ সালে ৪০ বছর বয়সে পথ দুর্ঘটনায় মারা যান৷ সাত দিন ছেলের মৃতদেহের খোঁজ পাননি তিনি৷ এর পর ছেলের মৃত্যু সংবাদ পেয়েও শোকপালনের সময় পাননি৷ কারণ গোটা পরিবারই যে তার উপরে নির্ভরশীল৷ পরের দিনই অটো নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি৷ দেশরাজের কথায়, 'আমার ছেলের সঙ্গেই যেন আমার অর্ধেক অস্তিত্ব ফুরিয়ে গিয়েছিল৷ কিন্তু কী করব, সংসারের হাল ধরতে ছেলের মৃত্যুর পরদিনই আমাকে অটো নিয়ে বেরোতে হয়েছিল৷'

    বড় ছেলের মৃত্যুর শোক কিছুটা যখন সামলে উঠেছেন দেশরাজ, ২০১৮ সালে তখনই তাঁর ছোট ছেলেও আত্মহত্যা করেন৷ এক বুক যন্ত্রণা নিয়ে দেশরাজ বলেন, 'দুই ছেলের চিতায় আগুন দেওয়া যে একজন বাবার কাছে কতটা কষ্টের, তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়৷'

    দুই ছেলেকে হারানোর পর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল দেশরাজের৷ বাড়িতে ৭ থেকে ৮ জনের দু' বেলা খাবারের সংস্থান করার দায়িত্ব তাঁর৷ তার উপর নিজের নাতি নাতনিদের তিনি কথা দেন, তাদের পড়াশোনা বন্ধ হবে না৷ ভোর ৬টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অটো চালিয়ে মাসে ১০ হাজার টাকা রোজগার করতেন দেশরাজ৷ তার মধ্যে ৬ হাজার টাকা খরচ হত নাতি নাতনিদের পড়াশোনায়৷ বাকি ৪ হাজার টাকায় পরিবারের জন্য খাবারের সংস্থান করতেন৷ তাতেও বেশিরভাগ দিনই আধপেটা খেয়ে থাকতে হত সবাইকে৷

    দেশরাজের নাতনি দ্বাদশ শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষায় যেদিন ৮০ শতাংশ নম্বর পেয়ে পাস করে, সেদিনই যেন নিজের যাবতীয় যন্ত্রণার খানিকটা উপশম হয়েছিল বৃদ্ধের৷ আনন্দে সারাদিন অটোর যাত্রীদের থেকে কোনও ভাড়া নেননি তিনি৷ কিন্তু এর পরেই এল নতুন সমস্যা৷ দেশরাজের নাতনি যখন জানায় সে দিল্লি গিয়ে বিএড পড়তে চায়, নিজের বাড়ি বিক্রি করা ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না তাঁর৷ পরিবারের বাকি সদস্যদের গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে বাড়ি বিক্রির টাকায় নাতনিকে দিল্লিতে পড়তে পাঠান দেশরাজ৷ তিনি বলেন, 'আমি কথা দিয়েছিলাম যে ওর স্বপ্নপূরণ করব৷ তাই নিজের বাড়ি বিক্রি করেই আমি ওর পড়ার খরচ দিয়েছি৷'

    এখন নিজের অটোতেই রাতে ঘুমোন দেশরাজ৷ খাওয়াদাওয়াও করেন অটোর মধ্যে৷ তিন চাকার প্রিয় যানটাই এখন তাঁর ঘরবাড়ি৷ দেশরাজ বলেন, 'যতটা ভেবেছিলাম ততটাও সমস্যা হচ্ছে না৷ দিনগুলো ভালই কাটছে৷ সারাদিন যাত্রীদের নিয়ে ভাড়া খাটি আর রাতে অটোর ভিতরেই ঘুমোই৷' তবে যখনই দিল্লি থেকে নাতনি ফোন করে জানায় যে পরীক্ষায় সে ভাল ফল করেছে তখনই গর্বে বুক ফুলে যায় দাদুর৷ তিনি বলেন, 'আমি অপেক্ষায় আছি কবে ও শিক্ষিকা হবে আর আমি ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলব, তুমি আমাকে গর্বিত করেছো৷'

    Published by:Debamoy Ghosh
    First published: