• Home
  • »
  • News
  • »
  • kolkata
  • »
  • ‘ওঁরা একটু মানবিক হলে হয়তো ফিরিয়ে আনতে পারতাম আমাদের পেম্বাকে’’

‘ওঁরা একটু মানবিক হলে হয়তো ফিরিয়ে আনতে পারতাম আমাদের পেম্বাকে’’

পাহাড়ই ছিল তাঁর প্রথম ভালবাসা ৷

পাহাড়ই ছিল তাঁর প্রথম ভালবাসা ৷

যাচ্ছে না, কিছুতেই যাচ্ছে না নাছোড়বান্দা কষ্টটা ৷ শৃঙ্গ জয়ের একরাশ দুমড়ে ওটা যন্ত্রণাকে সঙ্গী করে ফিরে এসেছে সবাই ৷ চোখে মৃত্যুর নিঃস্তব্ধতা, অপূরণীয় গ্লানি, প্রিয় অতি প্রিয় মানুষকে ছেড়ে আসার ব্যথা, যন্ত্রণার একা গোটা ্ধ্যায়কে যেন বয়ে বেড়াচ্ছেন সকলে ৷

  • Share this:

    #কলকাতা: যাচ্ছে না, কিছুতেই যাচ্ছে না নাছোড়বান্দা কষ্টটা ৷ শৃঙ্গ জয়ের একরাশ দুমড়ে ওটা যন্ত্রণাকে সঙ্গী করে ফিরে এসেছে সবাই ৷ চোখে মৃত্যুর নিঃস্তব্ধতা, অপূরণীয় গ্লানি, প্রিয় অতি প্রিয় মানুষকে ছেড়ে আসার ব্যথা, যন্ত্রণার একটা গোটা অধ্যায়কে যেন বয়ে বেড়াচ্ছেন সকলে ৷ সাসের কাংরি শৃঙ্গ জয় করে ফিরে এসেছেন মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশন অব কৃষ্ণনগর (ম্যাক)-এর সদস্যরা ৷ কিন্তু জয়ের ছিটে ফোঁটা আনন্দও নেই কোথাও ৷ কারও মুখে টুঁ শব্দটি নেই ৷ এই চরম পরাজয়ের গ্লানি কোথায় লুকাবেন তাঁরা ? শুধু এই চিন্তাই কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে সবাইকে ৷ গত ১৩ জুলাই কারাকোরাম পর্বতের সাসের কামরি অভিযানে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছেন পেম্বা শেরপা ৷ বরফের ক্রিভাসের তলায় অজানা কোনও এক দেশে হারিয়ে গিয়েছেন সেই মানুষটা, যাঁকে ছাড়া কোনও দিন সাবলকত্বের তকমা পেত না বাংলার পর্বতারোহন ৷ এই পেম্বা শুধুমাত্র শেরপা নন, শুধুমাত্র অভিযাত্রীদের সাহায্য করতে অর্থের বিনিময়ে শ্রম দান করা একজন মানুষ নন, এই পেম্বা ক্লাবটার প্রাণ, সদস্যদের পাঁজরের একটা আস্ত হাড় যেন ৷ ম্যাক-কে প্রতিষ্ঠিত করার কারিগর, স্বপ্ন দেখানোর ফেরেস্তা, ভয়ঙ্করতম বিপদের মুখ থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসা জীবনদাতা ৷ ৮ বারের এভারেস্টজয়ী, কাঞ্চনজঙ্ঘা, অন্নপূর্ণাজয়ী পেম্বার এমন পরিণতি.... যেন কল্পনা করতে পারছেন না কেউ ৷

    আরও পড়ুন: ‘পেম্বা ভুল করেনি, ওঁর ভুল হতেই পারে না’

    ভোলা যাবে না সেই অনাবিল হাসি ৷ ভোলা যাবে না সেই অনাবিল হাসি ৷

    কিন্তু হয়তো তাঁকে বাঁচানো যেত ৷ হয়তো বা... ৷ সম্ভাবনাটা তো অন্তত থাকত ! কিন্তু বিতর্কের কালো মেঘটা সমস্ত ‘যদি, কিন্তু, হয়তো, তবু’-কে ঢেকে দিল ৷ গত ১৯ জুলাই কলকাতা পৌঁছেছে সাসের কাংরি দল ৷ অচেনা দেশে পেম্বাকে রেখেই ফিরে এসেছেন ম্যাকের বসন্ত সিংহ রায়, বিশ্বনাথ সাহা, প্রশান্ত সিংহ, রুম্পা দাস, সিদ্ধার্থ শঙ্কর সরকাররা ৷ সঙ্গে ফিরেছেন পেম্বার নিজের দাদা পাসাং শেরপা আর ভাগ্নে পাসাং ছিরিং শেরপা ও লাকপা শেরপা ৷ এ বছর পুণের একটি দলও ম্যাকের সঙ্গে গিয়েছিল এই অভিযানে ৷ ১২ জুলাই সাসের কাংরি সামিট করেছিলেন ম্যাকের বিশ্বনাথ আর পুণের অনিল ৷ সঙ্গে ছিলেন পেম্বা, পাসাং, ছিরিং ও লাকপা ৷ তবে এই প্রথমবার শেরপা হিসাবে নয়, ম্যাকের সদস্য হিসাবেই এই অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন পেম্বা ৷ সম্প্রতি ম্যাকের সদস্যপদ গ্রহণ করেছিলেন তিনি ৷ ১৩ জুলাই সামিট করে ফিরে আসছিলেন সকলে ৷ ক্যাম্প ১-এ পোঁছানোর একটু আগেই ঘটে দুর্ঘটনা ৷ দলের সদস্য প্রশান্তবাবু জানালেন, ‘‘আর মেরেকেটে বাকি ৪০০-৫০০ মিটার বরফের পথ বাকি ছিল ৷ ওই রাস্তা দিয়ে মালপত্র ফেরি করার সময় অন্তত বার দশেক যাতায়াত করেছি আমরা ৷ যে কারও সঙ্গেই এমনটা হতে পারত ৷ কিন্তু পেম্বাজির লসটা আর কখনও পূরণ করা যাবে না ৷’’

    pemba8 পেম্বা যখন ক্রিভাসে পড়ে যান তখন ঠিক তাঁর পিছনেই ছিলেন ছিরিং ৷ মাত্র কয়েক হাতের দূরত্বে ঘটে যায় দুর্ঘটনা ৷ কিন্তু বিষয়টা এতটাই আকস্মিক ছিল যে ঘটনাটা বুঝে উঠতেই কয়েক সেকেন্ড কেটে যায় ৷ সঙ্গে সঙ্গেই নিজেদের চেষ্টায় উদ্ধারকাজ শুরু করেন অন্য শেরপারা ৷ কিন্তু সরঞ্জাম ছাড়া ফাঁকা হাতে ক্রিভাসের ভিতর বেশিদূর নামা সম্ভব হয়নি ৷ গত শুক্রবার দলের অন্যতম বর্ষীযান ও অভিজ্ঞ পর্বতারোহী বসন্ত সিংহ রায় সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, ‘‘ক্রিভাসটির চরিত্র ছিল আঁকাবাঁকা ৷ যা ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক ৷ তার উপর টর্চ, রোপ, হ্যামার, আইস অ্যাক্স, জুমার-সহ যাবতীয় সরঞ্জাম সঙ্গে নিয়ে নীচে পড়ে গিয়েছিল পেম্বা ৷ আবহাওয়া অত্যন্ত ভাল থাকায় রোদে প্রতি মুহূর্তে গলে যাচ্ছিল গ্লেসিয়ার্স ৷ ফাটল ধরছিল বরফের চাদরে ৷ সম্ভবত দলের বাকি মেম্বারদের সুরক্ষিত রাখতে গিয়ে রাস্তা পরীক্ষা করছিল সে ৷ পেম্বা নিজেও বুঝতে পারেনি পরের পদক্ষেপটা যেখানে রাখতে চলেছে সেটা আসলে একটা হিডেন ক্রভাস (লুকানো বরফের ফাটল) ৷ ফলে পা দিতেই দেহ আর সরঞ্জামের বিপুল চাপে হুড়মুড়িয়ে অতল গভীরে তলিয়ে যায় সে ৷’’

    কিন্তু কষ্টটা অন্য জায়গায় ৷ তবু কি আর একটু তৎপরতা, উদ্যোগ, প্রচেষ্টা আশা করতে পারে না দেশের এই বীর সন্তান ? যাঁর হাত ধরে নিজের পায়ের তলার মাটিটা শক্ত করেছে বাঙালির পর্বতারোহন, যাঁর হাত ধরে নাম তৈরি করেছে এই বসন্ত সিংহ রায়, দেবাশীষ বিশ্বাসরা, তার কি এটাই প্রাপ্য ছিল ? অনুশোচনা বারবার ঝরে পড়ল বসন্তবাবুর গলায় ৷

    এভারেস্টের মাথায় বসন্ত, দেবাশীষ, পেম্বা আর পাসাং ৷ এভারেস্টের মাথায় বসন্ত, দেবাশীষ, পেম্বা আর পাসাং ৷

    রোপ, সরঞ্জাম ছাড়াই নিজেদের উদ্যোগে পেম্বাকে খুঁজতে কালো অন্ধকার ক্রিভাসে নেমে গিয়েছিলেন দলের সদস্যরা ৷ তাতে ব্যর্থ হয়ে নীচে ক্যাম্পে নেমে এসে আবার সমস্ত সরঞ্জাম নিয়ে চলেছিল উদ্ধারের চেষ্টা ৷ কিন্তু আর একটু মানবিকতা হয়তো বাঁচিয়ে দিতে পারত পেম্বাকে ৷ পাশেই ছিল আইটিবিপি (ইন্দো টিবেটিয়ান বর্ডার পুলিশ)-র একটি দল ৷ প্লাটো নামে একটি শৃঙ্গ অভিযানে এসেছিলেন তাঁরা ৷ ওই দলে ছিলেন ৪-৫ জন বাঘা বাঘা শেরপা ৷ ওঁরা সকলেই নেপালের মাকালু অঞ্চলের। পেম্বারাও জন্মসূত্রে মাকালুরই বাসিন্দা ৷ ওই শেরপাদের কেউ নাঙ্গা পর্বত আরোহণ করেছেন, তো কেউ কে-টু। ওঁরা সকলেই সদ্য এসে পৌঁছেছিলেন। ফলে ওঁদের শারীরিক সক্ষমতা ও দক্ষতা অনেক গুণ বেশি ছিল, পাসাংদের থেকে। উদ্ধারকাজে সাহায্য করার জন্য একটা সময় হাতে-পায়ে ধরা হয়েছিল তাঁদের ৷ কিন্তু উপর মহল থেকে অর্ডার আসেনি, এই ‘যুক্তি’ দেখিয়ে আড়াই দিন কার্যত হাত গুটি বসে থাকল অত্যাধুনিক রেসকিউ সরঞ্জামে সজ্জিত আইটিবিপি ৷

    এভারেস্টের খুম্বু গ্লেসিয়ার্সে ক্লাইম্ব করছেন পেম্বা ৷ এভারেস্টের খুম্বু গ্লেসিয়ার্সে ক্লাইম্ব করছেন পেম্বা ৷

    শেষ পর্যন্ত ১৫ জুলাই সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ আইটিবিপি-র তরফে জানানো হয় অর্ডার পেয়েছে তাঁরা ৷ তার মধ্যে দু’বার পুরদমে উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া হৃদয়টা নিয়ে ফিরে আসছেন ম্যাকের সদস্য ও শেরপারা ৷ ফিরতিপথে পাসাং-লুকমাদের মুখে সেই কথা শুনে আর উদ্ধারকাজে হাত লাগানোর প্রয়োয়নই বোধ করেনি আইটিবিপি ৷ পেম্বার নামের পাশে আজ একাধিক অতীত কালের ব্যবহার ৷ সাংবাদিক সম্মেলনের শেষে কেঁদেই ফেললেন বসন্তবাবু ৷ বলেন, ‘‘আমরা পেম্বাকে হারালাম ৷ যা গেল তা আমাদেরই গেল ৷ তবু ওঁর পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে যাব ৷ আমাদের সামর্থ্য কম ৷  নিজেদের তরফ থেকে এককালীন ১০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ভাবছি ৷ যদিও এই ক্ষতির পূরণ হয় না ৷ উপর মহলের নির্দেশের শ্রদ্ধা করি আমরাও ৷ তবু কি মানবিকতা শব্দটা থাকবে না অভিধানে ?’’ এই অভিযানের একমাত্র মহিলা সদস্য রুম্পা কেঁদে উঠলেন ডুকরে ৷ বললেন, ‘‘সামিটে বেরনোর আগে একটা ছবি তুলতে চেয়েছিলাম একসঙ্গে ৷ বলেছিল, খিচ লো, কৌন জানে ফির কভি মওকা মিলে না মিলে ৷’’

    দেশ তোমার জন্য গর্বিত ৷ দেশ তোমার জন্য গর্বিত ৷ (ছবি: পেম্বা শেরপার ফেসবুক প্রোফাইলের সৌজন্যে )
    First published: