ছবি পরিচালনার সঙ্গে অভিনয়েও নজরুল, তাঁকে একবার বিপদ থেকে বাঁচান রবীন্দ্রনাথ

ফাইল চিত্র

সংখ্যায় মাত্র একটি হলেও নজরুল বাংলা ছবি পরিচালনা করেছিলেন ৷ সঙ্গীত পরিচালনার পাশাপাশি তাঁকে দেখা গিয়েছিল অভিনয়ও ৷ তিনের দশকে ফিল্ম কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল নজরুলের ৷ প্রতি মাসে তাঁর পারিশ্রমিক ছিল ৫০০ টাকা ৷

  • Share this:

    তিনি বিদ্রোহী কবি ৷ তিনি টর্পেডো ৷ তিনি মহাপ্রলয়ের নটরাজ ৷ এই অভিধাগুলোর আড়ালে চাপা পড়ে গিয়েছে তাঁর বহুমুখী প্রতিভার অনেক দিক ৷ জীবনের কষ্টিপাথরে যাচাই করে নেওয়া ব্যক্তিগত শোক যেমন অনুচ্চরিত থাকে দুখু মিঞার জীবনচর্চায়, ঠিক তেমনই অনালোচিত থেকে যায় সিনেমার পর্দায় কাজী নজরুল ইসলামের কাজ ৷

    সংখ্যায় মাত্র একটি হলেও নজরুল বাংলা ছবি পরিচালনা করেছিলেন ৷ সঙ্গীত পরিচালনার পাশাপাশি তাঁকে দেখা গিয়েছিল অভিনয়েও ৷ তিনের দশকে ফিল্ম কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল নজরুলের ৷ প্রতি মাসে তাঁর পারিশ্রমিক ছিল ৫০০ টাকা ৷ ১৯৩৪ সালের ১ জানুয়ারি মুক্তি পেয়েছিল নজরুল পরিচালিত একমাত্র ছবি ‘ধ্রুব’ ৷ নাট্যাচার্য গিরিশচন্দ্র ঘোষের লেখা ‘ভক্ত ধ্রুব’ অনুসারে তৈরি এই ছবিতে সহ-পরিচালক ছিলেন নজরুল ৷ আর একজন পরিচালক ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ দে৷

    নজরুলের সঙ্গীত পরিচালনায় সেকালে যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়েছিল ‘ধ্রুব’-র গানগুলি ৷ ছবিতে ব্যবহৃত ১৮ টি গানের মধ্যে ১৭ টিরই সুর দিয়েছিলেন তিনি ৷ চারটে গানে প্লেব্যাকও করেছিলেন ৷ পাশাপাশি, ফিল্ম কোম্পানির কথায় ছবিতে নারদের ভূমিকায় অভিনয়ও করেছিলেন অগ্নিবীণার স্রষ্টা ৷ বাকি কুশীলবদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন তুলসী চক্রবর্তী, আঙুরবালা, পারুলবালা, নিত্যানন্দ ঘটক, কুঞ্জলাল চক্রবর্তী, কার্তিক দে এবং যুগ্ম পরিচালক সত্যেন্দ্রনাথ দে ৷ তবে এই ছবির পর সেই ফিল্ম কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন নজরুল ৷ শোনা যায়, পারিশ্রমিক নিয়ে দু পক্ষের মতান্তরই এর কারণ ৷

    এর পরেও রুপোলি দুনিয়ার সঙ্গে কিন্তু সম্পর্ক অটুট ছিল তাঁর ৷ ১৯৩৭ সালে মুক্তি পায় ‘বিদ্যাপতি’ ৷ দেবকী বসুর সঙ্গে এই ছবির গল্প, চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছিলেন নজরুল ৷ পাহাড়ি স্যান্যাল, কানন দেবী, ছায়া দেবী অভিনীত ‘বিদ্যাপতি’ জনপ্রিয়তার নিরিখে ছিল সফল ছবি ৷ পরের বছর ১৯৩৮-এ পরিচালক নরেশ মিত্র ঠিক করলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস ‘গোরা’ নিয়ে ছবি করবেন ৷ সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব পেলেন কাজী নজরুল ইসলাম ৷

    রবি ঠাকুরের উপন্যাস থেকে হওয়া ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা করছেন কাজী নজরুল ৷ এই মাহেন্দ্রক্ষণের সাক্ষী হয়েছিল পরাধীন বাংলার সাংস্কৃতিক আবহ ৷ বিশ্বভারতীর থেকে অনুমতি না নিয়েই গান রেকর্ড করালেন নজরুল ৷ ভেবেছিলেন, দায়িত্বে যখন তিনি, প্রতিষ্ঠান কোনও আপত্তি করবে না ৷ কিন্তু তাঁর বিশ্বাস টাল খেয়ে গিয়েছিল ছবি মুক্তির দুদিন আগে ৷ বিশ্বভারতীর তরফে আপত্তি তোলা হল গনের বিশুদ্ধতা নিয়ে ৷ তাদের বক্তব্য ছিল, নজরুলের পরিচালনায় রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ডিংয়ে ত্রুটি আছে ৷ ফলে, তারা অনুমতি দিতে পারবে না ৷ এদিকে প্রযোজকের মাথায় হাত!

    dhruva

    ‘ধ্রুব’ ছবির পুস্তিকা, উত্তরপাড়া জীবনস্মৃতি ডিজিটাল আর্কাইভের সৌজন্যে প্রাপ্ত

    মরিয়া নজরুল ঠিক করলেন হাল ছাড়লে হবে না ৷ একবার শেষ চেষ্টা করতেই হবে ৷ তিনি জানতেন কে তাঁকে রক্ষা করতে পারেন ৷ ছবির কপি, প্রোজেকশনের যন্ত্র নিয়ে তিনি ছুটলেন শান্তিনিকেতন ৷ হাজির হলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের কাছে ৷ তাঁর অনুরোধ, কবি যেন একবার ছবিটি দেখেন, গানগুলি শোনেন, যদি মনে হয় ঠিক আছে, তিনি যেন তাঁর লিখিত অনুমতি দেন ৷ ছবি মুক্তি না পেলে প্রযোজকের অনেক টাকা ক্ষতি হয়ে যাবে ৷ ছবিটি দেখার জন্য অপেক্ষা করেননি রবীন্দ্রনাথ ৷ নজরুলের কথাতেই তিনি তাঁর লিখিত অনুমতি দিয়ে দিয়েছিলেন ৷ নজরুলের উপর তাঁর পূর্ণ আস্থা ছিল৷

    ১৯৩৮-এর ৩০ জুলাই মুক্তি পেয়েছিল ‘গোরা’ ৷ নামভূমিকায় ছিলেন নরেশ মিত্র, প্রতিমা দাশগুপ্ত, জীবন গঙ্গোপাধ্যায়, সুহাসিনী দেবী এবং রাজলক্ষ্মী দেবী ৷

    ছবির পাশাপাশি নজরুল কাজ করেছেন থিয়েটারে মঞ্চেও৷ ‘সিরাজউদদৌলা’, ‘জাহাঙ্গীর’, ‘অন্নপূর্ণা’ নাটকের জন্য তিনি গান লিখেছেন এবং সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন ৷

    কিন্তু তাঁর এই কাজগুলির রক্ষণাবেক্ষণ ঠিক ভাবে হয়নি ৷ ‘ধ্রব’-র দুর্লভ নেগেটিভ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যাপকভাবে ৷ গত বছর লকডাউনে দক্ষ টেকনিশিয়ান পাওয়া যায়নি স্পুল পরিষ্কার করার, ফলে ক্ষতি আরও গভীর হয়েছে ৷

    নজরুলকে নিয়ে চর্চায় আমাদের যত্নের অভাব স্পষ্ট, মনে করেন অরিন্দম সাহা সরদার ৷ উত্তরপাড়া জীবনস্মৃতি  ডিজিটাল আর্কাইভের কর্ণধার অরিন্দম জানিয়েছেন তাঁদের সংগ্রহে ‘ধ্রুব’ ছবির একটি ডিজিটাল প্রিন্ট আছে ৷  সম্পূর্ণ ছবিটি সেখানে না থাকলেও নজরুল-গবেষকদের কাজে সুবিধে হবে ৷ অন্তত বাজারচলতি ইউটিউব ক্লিপের উপর নির্ভর করে থাকতে হবে না ৷ অরিন্দমের কথায়, ‘‘আমার মনে হয় এপার বাংলায় আমরা নজরুলের সৃষ্টির বিশুদ্ধতা রক্ষা করতে পারিনি ৷ বরং ওপার বাংলায় নজরুলচর্চা আমাদের থেকে অনেক এগিয়ে৷ কারণ সেখানে ব্রহ্মমোহন ঠাকুরকে অনুসরণ করা হয়েছে৷ কিন্তু আমরা এই নজরুলসাধককে গুরুত্ব দিইনি৷’’

    এ বছরও ১১ জ্যৈষ্ঠ নজরুলের জন্মদিনে উত্তরপাড়া জীবনস্মৃতি ডিজিটাল আর্কাইভের তরফে ক্যালেন্ডার প্রকাশ করা হবে ৷ প্রকাশিত হবে পিডিএফ পুস্তিকাও ৷ সেখানে আলোচ্য বিষয় ‘গায়ক কি ইচ্ছেমতো নজরুলগীতি গাইবেন?’

    অরিন্দম-সহ বহু গবেষকের ধারণা, এই ইচ্ছেমতো চলতে গিয়েই ছায়ানট নজরুলকে আমরা এখন হারায়ে খুঁজি ৷

    Published by:Arpita Roy Chowdhury
    First published: