বাঙালি পাঁচপদ খাবে বলে বাজারে ভিড় করেনি!‌ ভিড় করেছে অভুক্ত থাকার আতঙ্কে

বাঙালি পাঁচপদ খাবে বলে বাজারে ভিড় করেনি!‌ ভিড় করেছে অভুক্ত থাকার আতঙ্কে

Representational Image

‘‌মানিকতলা বাজারে এক একদিন করে করে লোকের ভিড় কমেছে, কারণ কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না। বাগুইহাটির বিশাল বাজারে অনেককিছু নেই।’

  • Share this:

আতঙ্ক!‌ বাজারে ভিড় শুধু আতঙ্কেরই লক্ষণ। যে বাঙালির পাতে কম বেশি তেতো, মাছ, সবজি, ডাল, নিশ্চিত ‘‌পদাধিকারী’ ছিল, সেই বাঙালি এখন এক তরকারি ভাতেই কোনওমতে মানিয়ে গুছিয়ে নিচ্ছে। হ্যাঁ, নিচ্ছে!‌ দু’‌একটা ব্যতিক্রম ছবি প্রথম দিকে ছিল, এখন তাও নেই। সব একেবারে বন্ধ। কিন্তু এই সব জেনেও বাঙালির বাজারমুখী হওয়ার কারণ কী?‌ মাছ, উপাদেয়তম নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার। এতে অসুবিধার কী আছে?‌ বাজারে ইয়াহ বড় পাত্রে যাকে নৃত্যরত অবস্থায় চোখে পরখ করে বাঙালি এতদিন ব্যাগে পুরেছে, সেই মাছ ফ্রিজারে রেখে সাতদিন পর খেতে হবে, তা অনেকেই প্রথমটায় বিশ্বাস করতে পারেননি।

‘‌‌সবজি থাক, নিদেনপক্ষে মাছটুকু যদি টাটকা পাওয়া যায়, তাহলে আফশোস থাকে না’, রাতে ঘুমোতে যাওয়ার সময় বাজারের কথা মনে করতে করতে প্রৌঢ় তাঁর স্ত্রীকে এই স্তুতিবাক্য শুনিয়েছেন লকডাউনের প্রথম কয়েকটা দিন। অন্ধ্রের কাতলা না এলেও, স্থানীয় রুই মাছ, নিদেন পক্ষে ট্যাংরা, পুঁটি, কিছু না কিছু তো জুটবেই। কিন্তু পরিস্থিতি ধীরে ধীরে পাল্টে গিয়েছে। বাজার থেকে একে একে উধাও হয়ে গিয়েছে মাছ।

‘‌মানিকতলা বাজারে এক একদিন করে করে লোকের ভিড় কমেছে, কারণ কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না। বাগুইহাটির বিশাল বাজারে অনেককিছু নেই।’ ক্রমে ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়েছে শহর আর শহরতলিতে। আর প্রতিদিন উধাও হয়ে গিয়েছে একের পর এক জিনিস। যিনি রোজ বাজার করতেন, তিনি যাচ্ছেন চারদিন অন্তর, কেউ সাতদিন। যা পাচ্ছেন, দু’‌টি কুড়িয়ে নিয়ে বাড়িতে এসে তাই দিয়ে এক তরকারি পদে রান্না সারছেন।

বাজাররসিক, লেখক রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায় বলছেন এক অভুক্ত ভারতের কথাও। বলছেন, ‘‌রোজ দেখতে পাচ্ছি কত লোক খেতে পাচ্ছেন না। এরপর পাঁচপদ রান্না করে খাওয়ার মতো কেউ অবস্থায় আছেন বলে তো আমার মনে হয় না। আর বাজারে আমি তো নিয়মিত যাতায়াত করি। কই, কিছুই তো আগের মতো নেই। সাপ্লাই না থাকলে বাজারে মাল বিক্রি হবে কী করে?‌ তাই ওই রুই, কাতলা যা পাওয়া যাচ্ছে তাই দিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে। খেতে হবে এখন এসব। কিছু তো করার নেই। বাজারে রোজকার খাবার, দুধ, পাউরুটি, মুড়ি, ছাতু, বাতাসা, কখনও কখনও খাবার তেলও পাওয়া যাচ্ছে না।

আমার মনে হয় মানুষ আতঙ্কে বাজারে ভিড় করেছেন। কেউ এলাহি করে রান্না করবেন, তারপর জমিয়ে খাবেন, তার জন্য ভিড় করেননি। তাঁরা ভয় পেয়েছেন যদি এরপর এই সামান্য খাবারটুকুও না পাওয়া যায়, তাহলে কী হবে?‌ তাই তাঁরা এসে ভিড় করে কিছু কিনে নিতে চেয়েছেন। আপনি ভাবুন না, আমাদের মতো কয়েকজন হয়ত যা খুশি খেয়ে কাটিয়ে দিতে পারব, কিন্তু বাড়ির বয়ষ্করা, বাচ্চারা, তাঁরা কী খাবে?‌ একেবারে বাচ্চারা যদি দুধ না পায়, পুষ্টিকর খাবার না পায়, তাহলে তো তারা অসুস্থ হয়ে পড়বে!‌’‌

ঠিকই!‌ দয়া করে বাঙালিকে বাজারমুখী হ্যাংলা ভাববেন না। এমন আতঙ্ক বাঙালি দেখেনি। এবং একটা বড় অংশের মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত মানুষের সেই বৃত্তটিও নেই যেখানে তাঁরা খুব সহজে এই রোগের বিস্তারিত জেনে নিতে পারবেন। ফলে প্রথাগত সংবাদমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া অসংখ্য ‘‌ফেক নিউজ’‌–এর চাপে তাঁদের চিন্তায় মাথা ঘুরে গিয়েছে। আতঙ্কে তাঁরা বাজারে ভিড় করেছেন। সামান্য সরকারি কর্মচারী থেকে মফঃস্বলের দোকানদার, তাঁরা সত্যিই হোয়াটস অ্যাপের খবরকেই মাথায় নিয়ে ঘুমোতে গিয়েছেন কতদিন ধরে। তাই সকালে ছুটেছেন বাজারে, বাড়ির লোক যাতে অভুক্ত না মরে।

এই প্রজন্ম বিশ্বযুদ্ধ দেখেনি, আকাল, মন্বন্তর দেখেনি। দেশভাগের সময়ে যাঁর বয়স ১০ ছিল, সে এখনও ৬০। সব মিলিয়ে এমন আকালের সাঁড়াশি চাপে অনেকেই পড়েননি। কাশ্মীরকে এতদিন দূর থেকে দেখেছে সবাই। বাড়ি থেকে বাইরে আড্ডা মারতে বেরোলে পুলিশ মারবে, এটা ভাবতেই পারেননি হয়ত বাগবাজার, কুমোরটুলি বা গড়িয়াহাটের ব্রিজের তলায় বসে দাবা খেলায় অভ্যস্ত সেই মানুষগুলো। এরপর অবান্তর ভয় দেখানো হয়েছে তাঁদের।

এতদিন ধরে বাঙালির অভ্যাস দরাদরি করে বাজার থেকে জ্যান্ত মাছ, সেরা বাঁধাকপি, ফুলকপি, আর পালং শাক কেনার। সেই অভ্যাস হঠাৎ করে বদল করে দেওয়া যায় নাকি!‌ অভ্যাস তো দোষের হতে পারে না। বদভ্যাস বলা চলে না একে। পরিস্থিতির চাপে সবটা বদলাতে হবে, সেটা বুঝতে সময় লেগে গিয়েছে মাত্র। যাঁর ট্যাঁকের জোর আছে, তিনি আগে ভাগে বেশি করে সেরা মালটা কিনে নিয়ে বাড়িতে নিরাপদ থাকতে চেয়েছে। আর যাঁর নেই, তিনি মুখ হাঁড়ি করে ফেলে রাখা সবজি নিয়ে কোনওমতে বাড়ি ফিরেছেন। এ তো পুঁজির মানসিকতার দোষ, বাঙালির নয়!‌

দোষ তাঁদের, যাঁদের জন্য আজ দোকানে মুড়ি, বাতাসা কিম্বা দুধ, পাউরুটির মতো জিনিস পাননি অনেকে। দোষ ছাপোষা বাঙালির নয়।

Published by:Uddalak Bhattacharya
First published:

লেটেস্ট খবর