লেখক বিশ্বজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, লবণ উৎপাদন ছিল বসিরহাটের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এক প্রথা। বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করে। ব্রিটিশ আমলে লবণ আইনের কড়াকড়ি, স্বাধীনতার পর সরকারি নিয়ন্ত্রণ, শিল্পজাত লবণের সহজলভ্যতা, নদীর নাব্যতা হ্রাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় এই ঐতিহ্যবাহী লবণ শিল্প। জীবিকার সন্ধানে মানুষকে বাধ্য হয় বিকল্প পথ খুঁজতে। এই পরিবর্তনের পথ ধরেই বসিরহাটে ধীরে ধীরে মাথাচাড়া দেয় ইটভাটা শিল্প।
advertisement
একসময়ের লবণ মাঠের সমতল জমি ও নদীর পাড়ের কাদামাটি ইট তৈরির জন্য উপযোগী হয়ে ওঠে। পাশাপাশি নদীপথে ইট পরিবহণের সুবিধা থাকায় এই অঞ্চলে ইটভাটা গড়ে তোলা সহজ হয়। ফলে লবণ চাষের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষই পরবর্তীকালে ইটভাটার শ্রমিক বা সংশ্লিষ্ট কাজে যুক্ত হয়ে পড়েন। স্বাধীনতার পর জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও নির্মাণ শিল্পের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বসিরহাটে ইটের চাহিদা দ্রুত বেড়েছে। বর্তমানে বসিরহাটের আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ইটভাটা শিল্প বসিরহাটের অর্থনীতির একটি বড় অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শত শত শ্রমিক এই শিল্পের উপর নির্ভরশীল। তবে এই শিল্পের উত্থানের পাশাপাশি সামনে এসেছে নতুন চ্যালেঞ্জও। পরিবেশ দূষণ, কৃষিজমি হ্রাস, শ্রমিক নিরাপত্তার অভাব এবং কখনও কখনও ইটভাটার চিমনি ভেঙে দুর্ঘটনার মতো ঘটনাও সংবাদ শিরোনামে এসেছে। আবার কখনও বাজার মন্দা বা জ্বালানির দাম বৃদ্ধির জেরে ইটভাটা বন্ধের আশঙ্কায় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন শ্রমিকেরা। লবণের সাদা মাঠ থেকে ইটভাটার লাল ইট—বসিরহাটের এই দীর্ঘ যাত্রাপথ আসলে সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া জীবিকা ও সমাজের প্রতিচ্ছবি। ইতিহাসের এক অধ্যায় হারিয়ে গেলেও তার স্মৃতির উপর দাঁড়িয়েই গড়ে উঠেছে নতুন শিল্প।





