আমপুরের হাট না রামপুরের হাট থেকে রামপুরহাটের নামকরণ হয়েছে সেটি সম্পর্কে নিশ্চিত না হলেও একটি হাটের নাম থেকেই শহরটির নামকরণ হয়েছে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। একটি ক্ষুদ্র পল্লী কত দ্রুত শহরে পরিণত হতে পারে আজকের রামপুরহাট তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। ১৭৬৭ সালে লিখিত জার্নাল অফ মেজর জেমস রেনেলে বীরভূমের বিশেষ বিশেষ গ্রামের কথা লিখিত আছে।
advertisement
তাঁর দেওয়া ম্যাপেও দেখানো আছে গ্রামগুলির অবস্থান। সেখানে আমরা রামপুরহাটের পাশের গ্রাম বেলে- নারায়ণপুর, মাড়গ্রাম, তারাপুর এমনকি বোনহাটের নাম পাই কিন্তু রামপুরহাট পাই না। যদি গ্রামটি বড় হত তাহলে রেনেলে সাহেবের মতো মানুষের দৃষ্টি এড়ানোর কথা নয়। যেমন পরবর্তীতে দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি ম্যালি সাহেবের।
১৯১০ সালে সরকারি উদ্যোগে লুইস সিডনি স্টুয়ার্ট ও’ম্যালি রচিত বীরভূমের প্রথম গেজেটিয়ার প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি হাটের কথা লিখছেন-” The hat or market from which the place takes it name was situated about half a mile South of the town on the main road…” তাহলে একটি গঞ্জ এত দ্রুত একটি ব্যস্ত শহরে কীভাবে পরিণত হয়েছে এই প্রশ্ন এসেই যায়।
আরও পড়ুন: কোন ‘ফলে’ সবচেয়ে বেশি ‘ক্যালসিয়াম’ থাকে বলুন তো…? সিওর, শুনলেই চমকাবেন ‘নামে’!
জানা যাচ্ছে, এর প্রধান কারণ রেলপথ। রেলপথের সঙ্গে সঙ্গে এখানে লোকোমোটিব ডিপো প্রতিষ্ঠা হয়। আজ থেকে একশো বছর আগে সাহিত্যরত্ন হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় তাঁর বীরভূম বিবরণ গ্রন্থে যথার্থই বলেছেন-“রেলপথ নির্মিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নানা শ্রেণীর লোক আসিয়া রামপুরহাটে বাস করিতে লাগিল, যেখানে গ্রাম ছিল, তাহার দক্ষিণ দিকের মাঠে লোকের বসতি হইল, ক্রমে রামপুরহাট শহর হইয়া গেল। এখন রামপুরহাটের লোকসংখ্যা প্রায় পাঁচহাজার”।
রামপুরহাটের রেলপথ আর লোকোমেটিভ ডিপোকে কেন্দ্র করে প্রথমে এ্যাংলো ইন্ডিয়ান রেলকর্মচারীদের নিয়ে গড়ে ওঠে একটি কলোনি। রেলস্টেশন গড়ার পিছনে একজন দানশীল ব্যক্তির ভূমিকাও রয়েছে বলে জানা যায়। তিনি হলেন জমিদার বদ্রদোজ্জা সাহেব। রামপুরহাটের মানুষেরা তাঁকে বদর মিয়া নামে জানে। তিনি একরকম রামপুরহাটের স্টেশনের সমস্ত জমি রেল কোম্পানিকে দান করেন। রেলের সাহেব কর্মচারীদের খেলার জন্য একটি গ্রাউন্ড সূরা ব্যবসায়ী বি এন সাহা দান করেছিলেন। রেলপথের কাজ যখন সবে শুরু হচ্ছে সেই সময় রামপুরহাটে এলেন চার্লস হ্যামটন নামক এক সাহেব ঠিকাদার। তিনি যখন রামপুরহাটে বসবাস করছেন সেইসময় বীরভূমে শুরু হয়ে গেছে সাঁওতাল বিদ্রোহ। সাঁওতালদের লক্ষ্য ছিল রেল কোম্পানির তাঁবু গুলোর দিকে। সাঁওতালদের প্রতিরোধ করার জন্য একটি ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ করেন। বীরভূম বিবরণে এটাকে গোলঘর বলা হয়েছে। এই টাওয়ার থেকে সাঁওতালদের গোলাবারুদ নিয়ে আক্রমণের ব্যবস্থা ছিল কিন্তু বিদ্রোহীরা নারায়ণপুরের দিকে চলে যায়। নারায়ণপুর লুট করার পর বিদ্রোহীরা মলুটি মাসড়া হয়ে গনপুরের দিকে চলে যায়। ফলে রামপুরহাট সুরক্ষিত থেকে যায়। হ্যামটন সাহেবকে আধুনিক রামপুরহাটের রূপকার বললে হয়তোবা ভুল বলা হবে না।
১৮৫৯ সালের ১লা সেপ্টেম্বর রামপুরহাটে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। এতদিন ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করছিলেন নদীপথের উপর ভরসা করে। রামপুরহাটের পাশেই নারায়নপুর আর মাড়গ্রাম-বিষ্ণুপুর তখন এই এলাকার অন্যতম ব্যবসাকেন্দ্র। রামপুরহাট যখন নিতান্তই একটি গ্রাম মাত্র তখন নারায়ণপুর এই অঞ্চলের ঘনজনপূর্ণ গ্রাম। গ্রামের উত্তরে ব্রম্ভাণী নদী প্রবাহিত। সেই নদীপথে ব্যবসায়ীরা নারায়ণপুরে পন্যসামগ্রি আমদানি করতো আর এখানকার লোহা ও লোহার বিভিন্ন জিনিস চালান যেত। আর দ্বারকার তীরে মাড়গ্রাম- বিষ্ণুপুর- বসোয়ার রেশম শিল্প তখন বিখ্যাত। এখানকার রেশমের থান গোটা বাংলায় কদর। এমনকি মুঘল দরবারেও এর কদর ছিল। ব্যবসার কাজ চলতো সেই নদীপথে। রামপুরহাটে রেলপথ হওয়ার পর ব্যবসায়ীরা রেলপথে ব্যবসা শুরু করলেন। ধীরে ধীরে রামপুরহাট শহরে পরিণত হয়। আজ প্রায় কয়েকহাজার মানুষের বসবাস রামপুরহাট শহরে। রামপুরহাট পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে মোট ১৮ টি ওয়ার্ড। রয়েছি রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজ এবং হাসপাতাল, পাশাপাশি একাধিক প্রশাসনিক দফতর, রয়েছে বিভিন্ন স্কুল ও কলেজ।
সৌভিক রায়





