বর্ধমানের সুপরিচিত এলাকা বিজয়রাম, এই এলাকা কার না জানা। কিন্তু অনেকেই জানেন না এই এলাকার নামকরণের ইতিহাস। এই এলাকার নামকরণের ইতিহাস বেশ আলাদা এবং রোমাঞ্চকর। কোন একজন ব্যক্তির নামে নয় বরং এই এলাকার নাম রাজ আমলের দুই লেঠেল বিজয় ও রামের নামে।
আরও পড়ুন: LPG সিলিন্ডার নেওয়ার আগে এই একটি জিনিস ‘চেক’ করে নিয়েছেন তো? নাহলেই কিন্তু সর্বনাশ হয়ে যাবে
advertisement
বর্ধমান শহর থেকে রেল ওভারব্রিজ পেরিয়ে কাটোয়া রোড ধরে এগোলেই দেওয়ানদিঘি,বিজয়রাম, বাজেপ্রতাপপুর সহ বেশ কয়েকটি এলাকার নামকরনের সঙ্গে জড়িত রয়েছে কোন না কোন ব্যক্তির নাম। বর্ধমানের রাজ আমলের কয়েক জনের ব্যক্তির নামের থেকে নামকরণ করা হয় এই এলাকাগুলির । কিন্তু তারা কেউই ছিলেন না রাজা বা রাজার বংশধর। তারা ছিলেন রাজ কর্মচারী।রাজার রাজত্ব না থাকলেও রাজ কর্মচারীদের নাম যা আজও প্রত্যেকের মুখে মুখে প্রচলিত।
বর্ধমানের রাজা তেজচাঁদের আট রানী ছিলেন কিন্ত একমাত্র পুত্র সন্তান ছিলেন প্রতাপচাঁদ । ১৮১৬ সালে পিতার বর্তমানেই বর্ধমানে রাজ সিংহাসনে বসেন রাজা প্রতাপ চাঁদ। ১৮২০ নাগাদ হঠাৎ একদিন তার পিতা রাজা তেজচাঁদের কাছে খবর আসে প্রতাপ চাঁদের মৃত্যু হয়েছে এবং তার দাহ করা হয়েছে,কিন্তু কোন দেহ দেখানো হয়নি তেজচাঁদকে।
এই খবর তিনি পেয়েছিলেন দেওয়ান বাবু পরান চাঁদ কাপুরের কাছে। প্রতাপের মৃত্যুর পর ফের সিংহাসনে বসেন রাজা তেজচাঁদ। এরপর প্রায় ১২ বছর অর্থাৎ ১৮৩২ সাল পর্যন্ত রাজা তেজচাঁদ রাজত্ব করেন। কিন্তু তেজচাঁদের অবর্তমানে কে সিংহাসনে বসবে এটাই ছিল চিন্তার বিষয়। দেওয়ান তাঁর পুত্র মহাতাব চাঁদকে দত্তক নিতে বলেন রাজাকে। দত্তক নেওয়ার কিছুদিন পরে রাজ বংশের উত্তরাধিকার হয়ে সিংহাসনে বসেন মহাতাব চাঁদ।
ইতিহাসবিদ সর্বজিৎ যশ বলেন, ১৮৩৪ সালে হঠাৎ গোলাপবাগ এলাকায় এক সাধু এসে দাবি করেন তিনিই প্রতাপ চাঁদ, তপস্যার জন্য তিনি হিমালয়ে চলে গিয়েছিলেন, তিনি ফিরে এসেছেন এবং তার সিংহাসন তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে।খবর পেয়ে দেওয়ান পরান চাঁদ কাপুর ওই সন্ন্যাসীকে ধরে আনতে নির্দেশ দিলে সেখান থেকে সে পালিয়ে বর্তমান বাজেপ্রতাপপুর এলাকায় একটি শিব মন্দিরে আস্তানা নেন তিনি। খবর পেয়ে সেখান থেকে তাকে হটিয়ে দিতে একজন দেওয়ানকে নিয়োগ করা হয়েছিল। সেই দেওয়ান যেখানে অফিস করেন তার পাশেই ছিল একটি পুকুর, বর্তমানে সেই পুকুরের নাম দেওয়ানদিঘি। দেওয়ান দু’জন লেঠেলকে নিয়ে আসেন এবং তাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রতাপ চাঁদকে বাজেপ্রতাপপুর এলাকা থেকে সরানোর জন্য। পরবর্তীতে সেই সন্ন্যাসীকে তাড়ানোর জন্য লোকজন জড়ো হতে শুরু করে । তখন তিনি চলে যান কালনার পথে।
পরবর্তীতে এই মামলা করার আদালত পর্যন্ত এবং আদালতে সন্ন্যাসী রাজা ছিলেন এই তথ্য দিতে ব্যর্থ হলে কেস হেরে যান। এবং যেহেতু তিনি নকল প্রতাপ বলে প্রমাণিত হন তাই তিনি যেখানে আস্তানা নেন সেই জায়গায় নামকরন হয় বাজেপ্রতাপপুর। যে লেঠেলরা এসেছিলেন তাদের নাম ছিল বিজয় আর রাম, এই লেঠেলরা যেখানে আস্তানা করেছিলেন তাদের নাম অনুসারে পরবর্তীতে সেই জায়গায় নাম হয় বিজয় রাম।
আজ রাজাও নেই, রাজত্বও নেই। কিন্তু বর্ধমান শহরের অলিগলিতে আজও মিশে আছে এমন সব রোমাঞ্চকর ইতিহাস। সময়ের নিয়মে হয়তো অনেক কিছুই বদলেছে, কিন্তু এই নামগুলোর মধ্য দিয়েই আজও বেঁচে আছে বর্ধমান রাজ আমলের সেই অমলিন স্মৃতি।





