কাটোয়ায় একের পর এক গাঙ্গেয় ডলফিনের মৃত্যুকে ঘিরে গুরুতর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। অভিযোগ, কখনও শিশু ডলফিনের মুখ কেটে চর্বি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে গাছে ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে, আবার কখনও পূর্ণবয়স্ক ডলফিনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে। জাতীয় জলজ প্রাণীর এমন ধারাবাহিক মৃত্যুর ঘটনায় বনদফতরের নজরদারি ও সচেতনতা কর্মসূচি নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন পরিবেশ কর্মীরা। কাটোয়া বনদফতরের রেঞ্জার শিবপ্রসাদ সিনহা জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া স্ত্রী ডলফিনটির ময়নাতদন্ত করা হচ্ছে। রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে স্পষ্ট করে বলা যাবে।
advertisement
আরও পড়ুন: ব্যাগ খুলতেই চোখ ধাঁধিয়ে গেল গোয়েন্দাদের, সীমান্তে ১০ কেজি রুপো পাচারের ছক! জালে নেপালি মহিলা
উল্লেখযোগ্য, গত ২২ জানুয়ারি কাটোয়া-২ ব্লকের অগ্রদ্বীপ পঞ্চায়েতের বাবলাডাঙা গ্রামের চৌধুরীপাড়ায় একটি ডলফিন শাবকের মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছিল। সেই দৃশ্য ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। একটি বাবলা গাছে দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল ডলফিন শাবকটিকে। তার মুখ কেটে টিনের পাত্রে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়। বনদফতরের প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসে, পাচারকারীরা চর্বি থেকে তেল সংগ্রহের উদ্দেশ্যেই এমন নৃশংস কাজ করেছে। ওই ঘটনার এক সপ্তাহ না কাটতেই ফের একই পঞ্চায়েত এলাকায় স্ত্রী ডলফিনের মৃতদেহ উদ্ধারে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, চর বিষ্ণুপুর গ্রামের ঘাটে প্রথমে ডলফিনের দেহটি নজরে আসে গ্রামবাসীদের। তাঁরাই বন দফতরকে খবর দেন।
দেহ পরীক্ষা করে দেখা যায়, শরীরের মধ্যে গেঁথে রয়েছে মাছ ধরার টেটা। অনুমান করা হচ্ছে, দু’-তিন দিন আগেই ডলফিনটির মৃত্যু হয়েছে এবং তারও কয়েক দিন আগে টেটা বিদ্ধ করা হয়েছিল। বনদফতরের প্রাথমিক ধারণা, ডলফিনটি অন্তঃসত্ত্বা ছিল। পরিবেশকর্মী গনেশ চৌধুরীর মতে, একের পর এক গাঙ্গেয় ডলফিনের মৃত্যু অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশেষ করে যদি অন্তঃসত্ত্বা ডলফিনকে হত্যা করা হয়ে থাকে, তবে বিষয়টি আরও গুরুতর। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। গাঙ্গেয় ডলফিন সংরক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত কাটোয়াতেই এই ধরনের ঘটনা ঘটায় চিন্তায় পড়েছেন পরিবেশবিদরাও।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে কেন্দ্রীয় সরকার গাঙ্গেয় ডলফিনকে জাতীয় জলজ প্রাণীর মর্যাদা দেয়। গঙ্গা নদীর বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় এই প্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পরিবেশ কর্মীদের আশঙ্কা, ডলফিনের ধারাবাহিক মৃত্যু নদীর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।এছাড়াও প্রশ্ন উঠছে, মুর্শিদাবাদ বা মালদহ নয়, কেন বারবার কাটোয়া এলাকাতেই ডলফিনের চর্বি থেকে তেল নিষ্কাশনের চক্র সক্রিয় হচ্ছে। সূত্রের দাবি, ডলফিনের চর্বি থেকে প্রাপ্ত এক ধরনের তেল মাছ ধরার টোপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আবার সেই তেলকে ‘শঙ্কর মাছের তেল’ নামে গাঁটের ব্যথার উপশমের ভুয়ো দাবিতে বিক্রি করা হচ্ছে।
আপনার শহরের হাসপাতাল এবং চিকিৎসকদের নামের তালিকা পেতে এখানে Click করুন
যদিও চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডলফিনের তেল ব্যথানাশক হিসেবে কার্যকর, এর কোনও প্রমাণ নেই। বন দফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরে কাটোয়া এলাকায় ৩ থেকে ৪টি মৃত ডলফিন উদ্ধার হয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, কাটোয়া ও নদীয়া জলসীমায় গত এক বছরে অন্তত ১১টি ডলফিনের মৃতদেহ ভেসে যেতে দেখা গিয়েছে। কাটোয়ার ভাগীরথী নদীর কল্যাণপুর থেকে পাটুলি পর্যন্ত প্রায় ৩২ কিলোমিটার এলাকা গাঙ্গেয় ডলফিনের বিচরণ ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। কয়েক বছর আগে রাজ্যের বন দফতর কাটোয়ার শাঁখাই ঘাটে গাঙ্গেয় ডলফিন সংরক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলে এবং ডলফিন নিয়ে গবেষণাও চালানো হচ্ছে। তবুও একের পর এক ডলফিনের মৃত্যু ঠেকানো যাচ্ছে না। বর্তমানে এই এলাকায় আনুমানিক ৩২ থেকে ৩৫টি গাঙ্গেয় ডলফিন রয়েছে বলে জানা যায়। সচেতনতা প্রচার সত্ত্বেও কেন এই মৃত্যুমিছিল থামানো যাচ্ছে না, সে প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।






