আগামী মাসে ভারতে অনুষ্ঠিত হতে চলা টি২০ বিশ্বকাপ ২০২৬-এ খেলা নিয়ে তৈরি হওয়া জটিল পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন করে সংকট ঘনীভূত হয়েছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) তাদের সরকারের সম্মতিতে ভারতে বিশ্বকাপ ম্যাচগুলো না খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে একাধিক কঠোর সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হবে বলে ধরা হচ্ছে।
এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আইসিসি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা দিয়েছিল। সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার পর বিসিবি জানায়, ভারতে খেলতে তারা দল পাঠাবে না।
advertisement
বুধবারই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে একটি বৈঠক ডাকে, যেখানে ১২টি পূর্ণ সদস্য (টেস্ট মর্যাদাপ্রাপ্ত) দেশের পাশাপাশি চারটি সহযোগী দেশ অংশ নেয়। এই বৈঠকে আইসিসির দুর্নীতি দমন ইউনিটের চেয়ারম্যানও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে ভোটাভুটির পর ১৪–২ ব্যবধানে সিদ্ধান্ত হয় যে বিশ্বকাপ নির্ধারিত সূচি অনুযায়ীই অনুষ্ঠিত হবে।
এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আইসিসি কার্যত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের বিশ্বকাপের ম্যাচ অন্য কোনও দেশে আয়োজনের দাবিও প্রত্যাখ্যান করে। সব মিলিয়ে টি২০ বিশ্বকাপ ২০২৬-এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও গভীর হয়েছে। সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছেও বিষয়টি এখন অত্যন্ত কৌতূহলের।
চলুন জেনে নেওয়া যাক, আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী এর ফলে বাংলাদেশকে কী কী শাস্তি বা পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে- আইসিসির যে কোনো টুর্নামেন্টের আগে সব পূর্ণ সদস্য (টেস্ট মর্যাদাপ্রাপ্ত) দেশকে অংশগ্রহণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে হয়। যদি আইসিসির নিরাপত্তা দল আয়োজক দেশে কোনও নির্দিষ্ট দলের জন্য নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি দেখতে না পায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে মূল সংস্থার পক্ষ থেকে অনুমোদিত (সবুজ সংকেতপ্রাপ্ত) ভেন্যুতেই খেলতে হয়। বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী, আইসিসির কাছে ভারতে নিরাপত্তা নিয়ে কোনও আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে না।
এই অবস্থায় যদি বাংলাদেশ নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকে, তা হলে তাদের একাধিক শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। সম্ভাব্য শাস্তিগুলো একবার দেখে নেওয়া যাক।
বাংলাদেশকে মেগা ইভেন্টের প্রথম দিন, অর্থাৎ ৭ ফেব্রুয়ারিতেই তাদের প্রথম ম্যাচ খেলতে হত। যদি বাংলাদেশ শুধুমাত্র ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ না খেলার সিদ্ধান্ত নেয়, তা হলে সেই ম্যাচগুলোর পয়েন্ট বাজেয়াপ্ত করা হবে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ পাবে ০ পয়েন্ট, আর প্রতিপক্ষ দল পাবে পূর্ণ পয়েন্ট।
পয়েন্ট বাজেয়াপ্ত হওয়া ম্যাচ পুনরায় খেলা হবে না। যতক্ষণ না আইসিসি তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে, ততক্ষণ নিরপেক্ষ ভেন্যুতে ম্যাচ হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। এখন দেখার বিষয়, এই পরিস্থিতিতে আইসিসি কী সিদ্ধান্ত নেয়, কারণ বিসিবি তাদের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় আয়োজন করার অনুরোধ জানিয়েছে।
এদিকে, বিশ্বকাপে না খেলার সিদ্ধান্তের কারণে ‘ব্রিচ অব এগ্রিমেন্ট’ (চুক্তিভঙ্গ) ইস্যুতে আইসিসির পক্ষ থেকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি আর্থিক জরিমানা হিসেবে অপারেশনাল খরচ (যেমন ভ্রমণ, সম্প্রচার ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি) বাবদ যে ক্ষতি হয়েছে, তার দায়ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে বহন করতে হতে পারে।
২০০৩ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড জিম্বাবোয়ের বিপক্ষে এবং নিউজিল্যান্ড কেনিয়ার বিপক্ষে বিভিন্ন কারণে ম্যাচ না খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেই সময় উভয় দলেরই পয়েন্ট বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। আইসিসির কাছে এখনও এই বিকল্পটি খোলা রয়েছে।
আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী, এটি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। এর আওতায় টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের ফি থেকে বঞ্চিত হতে হবে এবং আইসিসির মোট আয়ের অংশীদারিত্বও পাওয়া যাবে না।
আরও পড়ুন- IND vs NZ: ‘বোলিংয়ের জাদুকর’! বরুণ চক্রবর্তীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ সুনীল গাভাস্কর
বাংলাদেশের জায়গায় আইসিসি একটি বিকল্প দলকে টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অন্তর্ভুক্ত করবে। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, স্কটল্যান্ড সুযোগ পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছে। কারণ তারা ইউরোপীয় বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছিল। এছাড়া আইসিসির কাছে আরেকটি বিকল্প রয়েছে। গ্রুপের প্রতিপক্ষ দলগুলোকে ওয়াকওভার দেওয়া। এই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি সময় ও লজিস্টিকসের ওপর নির্ভর করবে।
যদি আইসিসি মনে করে যে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক কারণে নেওয়া হয়েছে—যা কার্যত সত্যি বলেই ধরা হচ্ছে, কারণ শুরু থেকেই ভারতে বিশ্বকাপে খেলার বিষয়ে বাংলাদেশের সরকার জড়িত ছিল—তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তাতে আইসিসি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ভোটাধিকারও প্রভাবিত হতে পারে এবং আইসিসির কাছ থেকে পাওয়া অন্যান্য বিশেষ সুবিধা থেকেও বিসিবিকে বঞ্চিত করা হতে পারে।
