হিথরো বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এই অভিযানের জন্য ৩৮ জন সফল লন্ডনবাসীকে নির্বাচিত করে, যাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন সৈয়দ উসমান শাহ। উসমান লন্ডনের একটি বাজারে ‘দ্য ডেট সুলতান’ নামে একটি খেজুরের দোকান চালান। হিথ্রো বিমানবন্দরে তাঁর পোস্টারটি লাগানো হয়েছিল। পোস্টারটিতে, উসমানকে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে, খেজুরের ঝুড়ি হাতে নিয়ে হাসিমুখে হাত নাড়তে দেখা যায়। উসমানের কাছে, সেখানে নিজের পোস্টার দেখাটা ছিল যেন স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো। যখন তাঁর বাবা-মা পোস্টারটি দেখলেন, তাঁর বাবা উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠেছিলেন, ‘‘আমি তোমার জন্য খুবই গর্বিত।’’
advertisement
সেই ভোর ৪টের ফোনকল
উসমানের আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। একদিন ভোর ৪টেয়, তিনি হঠাৎ ফোনকল এবং মেসেজ পেতে শুরু করলেন: “উসমান, আপনি কি দেখেছেন? আপনি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হচ্ছেন, কিন্তু ভুল কারণে।” কেউ একজন উসমানের পোস্টারের একটি ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছিল। যেহেতু উসমান ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরেছিলেন, তাই জাতিগত ও ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক মন্তব্যের বন্যা বয়ে যায়।
সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু তিক্ত মন্তব্য:
হিথরো বিমানবন্দরে একজন বাদামী বর্ণের মানুষের ছবি কী করছে?
তৃতীয় বিশ্বের দেশে আপনাকে স্বাগতম।
শ্বেতাঙ্গ হওয়া এখন প্রায় একটি অপরাধে পরিণত হয়েছে।
লন্ডন মুসলিমদের দ্বারা বিজিত “লন্ডনিস্তান” হয়ে উঠছে।
উসমান কান্নায় ভেঙে পড়েন
এই ছবিটি, যা লাখ লাখ বার দেখা হয়েছিল এবং হাজার হাজার বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য পেয়েছিল, তাঁকে একেবারে ভেতর থেকে ভেঙে দিয়েছিল। তিনি বলেন, জীবনে তিনি এত ঘৃণার মুখোমুখি কখনও হননি। তিনি বলেন, ‘‘আমার মনে হচ্ছিল যেন আমার হৃদয়টা ডুবে যাচ্ছে। লোকেরা আমার চেহারা, আমার ধর্ম এবং খেজুর বিক্রির কাজ নিয়ে জঘন্য মন্তব্য করছিল।’’ আমি রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ছিলাম, এমন সময় আমার স্ত্রী এসে বলল, ‘তোমাকে আগে কখনও এমন দেখিনি, আর আমি হাউহাউ করে কেঁদে ফেললাম।’’
ঘৃণার কাছে মাথা নত
এই প্রচারাভিযানের আটজন অংশগ্রহণকারী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ব্যক্তি ছিলেন। উসমানের পাশাপাশি, একজন মুসলিম নারী ক্রীড়াবিদও এত বেশি কটূক্তির শিকার হয়েছিলেন যে তিনি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে তাঁর পোস্টারগুলো সরিয়ে ফেলার অনুরোধ করেন। হিথরো কর্তৃপক্ষ উসমানকে পোস্টারগুলো সরিয়ে ফেলার প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু তিনি সরাসরি তা প্রত্যাখ্যান করেন। উসমান সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি এই ঘৃণার কাছে মাথা নত করবেন না।
‘‘আমি তোমাদের বিনামূল্যে খেজুর খাওয়াব’’
নিজের ইসলামিক এবং পারিবারিক মূল্যবোধের উপর ভর করে তিনি ট্রোলারদের জবাব দেন, ‘‘আমি তোমাদের ঘৃণা করি না, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছি।’’ তিনি এদের তাঁর স্টলে আমন্ত্রণ জানান এবং বলেন যে তারা তার সঙ্গে দেখা করতে এলে তিনি তাদের বিনামূল্যে খেজুর দেবেন। এই ভালবাসার নিদর্শনের ফলে অনেকেই ক্ষমা চাইতে আসেন। একজন নারী এমনকি ফুল নিয়ে আসেন এবং নিজের কৃতকর্মের জন্য লজ্জা প্রকাশ করেন।
ব্রিটিশ হিসেবে এখনও গর্বিত
হিথরো বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষও এই বর্ণবাদী আক্রমণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং উসমানসহ সকল অংশগ্রহণকারীর প্রতি তাদের সংহতির আশ্বাস দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা সংস্থার সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত বছরের তুলনায় ব্রিটেনে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক অপরাধ ১৯% বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও ব্রিটেনের প্রতি উসমানের কোনও বিদ্বেষ নেই। তিনি বলেন, ‘‘এই দেশই আমাকে তৈরি করেছে। আমি এখানে সবকিছু শিখেছি। আমি এখানেই খেয়েছি ও পড়াশোনা করেছি, এবং এই মহান দেশ আমাকে সুযোগ দিয়েছে। আমি পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত একজন ব্রিটিশ মুসলিম হিসেবে গর্বিত।’’
