অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে গতি আনতে আর জি কর হাসপাতালের ট্রমা কেয়ার সেন্টারে পৌঁছয় রাজ্য ফরেন্সিক দল। দলের সদস্য ভাস্কর গঙ্গোপাধ্যায় ও চিত্রাক্ষ সরকার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। একইসঙ্গে লালবাজারের হোমিসাইড শাখার দুই আধিকারিকও সেখানে পৌঁছে তদন্তে যোগ দেন।
একদিকে ফরেন্সিকের তিন সদস্য, অন্যদিকে হোমিসাইড শাখার তিন আধিকারিক—দুই সংস্থার যৌথ তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে ঘটনার প্রতিটি দিক। বিশেষভাবে নজর দেওয়া হচ্ছে প্রযুক্তিগত ত্রুটি, লিফটের কার্যপ্রণালী এবং উদ্ধার প্রক্রিয়ার সময়কাল নিয়ে।
advertisement
রাজনীতি ছাড়বেন রিঙ্কু? ‘সবার জন্য নিয়ম এক হওয়া উচিত …’ ক্ষুব্ধ দিলীপজায়া টিকিট না পেয়ে যা বললেন!
শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত ডিউটি রোস্টার খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ওই সময়কালে দায়িত্বে থাকা জুনিয়র ডাক্তার, নার্স, গ্রুপ ডি কর্মী এবং চুক্তিভিত্তিক নিরাপত্তারক্ষীদের একে একে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। কার দায়িত্বে কী ছিল, কে কোথায় উপস্থিত ছিলেন—সব তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। একইসঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। কোন সময় লিফটের গতিবিধি কী ছিল, কোথায় কী ধরনের অসংগতি দেখা গিয়েছে, তা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে উঠে এসেছে নিরাপত্তা প্রোটোকল। নিয়ম অনুযায়ী, লিফটে কোনও সমস্যা হলে প্রতিটি ফ্লোরে পিডব্লিউডি ইলেকট্রিক্যাল বিভাগ ও সুপারভাইজারের যোগাযোগের নম্বর স্টিকার আকারে লাগানো থাকার কথা। সেই নির্দেশিকা সর্বত্র মানা হয়েছিল কি না, তাও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে বেসমেন্ট ঘিরে। যেখানে লিফটটি শেষ পর্যন্ত আটকে যায়, সেই জায়গার বাইরে থাকা কোলাপসিবল গেটে তালা লাগানো ছিল। সেই তালার চাবি কার কাছে ছিল, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আদৌ ফোন করা হয়েছিল কি না—এই পুরো বিষয়টি খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে।
জানা গিয়েছে, বেসমেন্টে ক্যানসার চিকিৎসার অত্যন্ত মূল্যবান লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর (লিনাক) মেশিন থাকায় নিরাপত্তার জন্যই সেখানে তালা লাগানো ছিল। কিন্তু জরুরি পরিস্থিতিতে সেই চাবি কেন সময়মতো পাওয়া গেল না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
এমনকি, চাবি না পাওয়া সত্ত্বেও কেন তালা ভেঙে দ্রুত উদ্ধার প্রক্রিয়া শুরু করা হল না, সেটাও তদন্তের আওতায় এসেছে।
সব মিলিয়ে, এই ঘটনায় গাফিলতির একাধিক স্তর সামনে আসছে কি না, সেটাই এখন দেখার। তদন্তকারীদের নজর—একটি প্রাণহানির পেছনে ঠিক কোথায় ভাঙন ছিল ব্যবস্থার।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, ভোর ৪টা ১৫ মিনিট নাগাদ প্রথমবার অপারেশন থিয়েটারের সামনে সিসিটিভিতে দেখা যায় অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। এরপর দীর্ঘ সময় তাঁর কোনও গতিবিধি ক্যামেরায় ধরা পড়েনি।
দ্বিতীয়বার, ভোর ৫টা ১২ মিনিটে গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে ওয়ার্ডে নিয়ে যেতে দেখা যায়। এই দুই সময়ের মধ্যে প্রায় এক ঘণ্টার ফাঁক—আর সেই সময়েই ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিয়েই জোর জল্পনা তৈরি হয়েছে।
তদন্তকারীরা মনে করছেন, এই ‘ব্ল্যাঙ্ক পিরিয়ড’-ই এই মৃত্যুর রহস্য উন্মোচনের চাবিকাঠি হতে পারে। সেই সময় লিফটে কী ঘটেছিল, উদ্ধার প্রক্রিয়ায় দেরি কেন হল, এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোথায় ঘাটতি ছিল—সব দিকই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তালা থানার মামলা নং ১২, তারিখ ২০/০৩/২০২৬, ধারা ১০৫/৩(৫) ভারতীয় ন্যায় সংহিতা অনুযায়ী তদন্ত চলাকালীন নিম্নলিখিত ব্যক্তিদের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তালা থানার অফিসারদের ঘর থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে—
১) মিলন কুমার দাস (৪৯)
পিতা: প্রয়াত নারুগোপাল দাস
ঠিকানা: ২০/১/১, বেলগাছিয়া রোড, পিএস-তালা, কলকাতা-৭০০০৩৭
পেশা: লিফটম্যান
২) আশরাফুল রহমান (৩১)
পিতা: সামছুর মণ্ডল
ঠিকানা: গ্রাম-রায়পুর, পোস্ট-দক্ষিণ চাত্রা, পিএস-বাদুড়িয়া, উত্তর ২৪ পরগনা
পেশা: নিরাপত্তারক্ষী
৩) বিশ্বনাথ দাস (৪৮)
পিতা: প্রয়াত পঞ্চানন দাস
ঠিকানা: ২৬, তারক চ্যাটার্জি লেন, পিএস-বড়তলা, কলকাতা-৭০০০০৫
পেশা: লিফটম্যান
৪) মানস কুমার গুহ (৫৫)
পিতা: প্রয়াত সুরেন্দ্রনাথ গুহ
ঠিকানা: ৪/১৯৭, শেঠ বাগান রোড, পিএস-দমদম, কলকাতা-৭০০০৩০
পেশা: লিফটম্যান
৫) শুভদীপ দাস (২৪)
পিতা: প্রয়াত রাধাপদ দাস
ঠিকানা: গ্রাম-তেঘরিয়া, পোস্ট-গন্ধর্বপুর, পিএস-বাদুড়িয়া, উত্তর ২৪ পরগনা
পেশা: নিরাপত্তারক্ষী
ধৃতদের ২১ মার্চ, শনিবার শিয়ালদহের মাননীয় এসিজেএম আদালতে পেশ করা হল।
