এই কাহিনীর প্রধান চরিত্র নোয়েল ফ্রেডারিক বারওয়েল, কলকাতা হাইকোর্টের শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে মিলিটারি ডিউটিতে তিনি কলকাতায় আসেন এবং যথাসময়ে হাইকোর্টে আইনব্যবসা শুরু করেন। এই উপন্যাস আবর্তিত হয় মূলত ওই সময়ের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই।
এই প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে, সংসার পরিক্রমার পথে কত বিচিত্র সঞ্চয়ই যে দিনে দিনে পর্যাপ্ত হয়ে ওঠে তার বুঝি আর ইয়ত্তা নেই। যা একদিন অচেনা থাকে, অজানা থাকে তাকেই আবার একদিন চিনে ফেলা যায়, জেনে ফেলা যায়।
advertisement
ধীরে ধীরে অপরিচিতের অবগুণ্ঠন খুলে কখন সে-ই আবার ধরা দেয় মনের কাছে। এই এমনি করেই সঞ্চয়ের পুঁজি একদিন ভারি হয়ে ওঠে, আর স্মৃতির আকাশে রং ধরে তখনই।
ঘটনাচক্রে ওল্ড পোস্ট অফিস স্ট্রীটের আদলতি কর্মক্ষেত্রও শংকরকে এমনি অসংখ্য অপরিচিত চরিত্রের সাক্ষাৎ সংস্পর্শে আসতে হয়েছিল। সেদিন অচেনাকে চেনা আর অজানাকে জানাই ছিল তাঁর জীবিকার অপরিহার্য অঙ্গ। তারপর এতদিন পরে হঠাৎ করে একদিন তিনি টের পেয়েছিলেন কখন যেন তাঁর আকাশও বর্ণাঢ্য হয়ে উঠেছে তাদের রঙে। শুধু ওল্ড পোস্ট অফিস স্ট্রিটের আদলতি কর্মক্ষেত্র নয়। তাঁর লেখায় ধরা পড়েছে কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলের নানান পরত। তাঁর এই উপন্যাস নিয়ে নাটক বানাতে চেয়েছিলেন ঋত্বিক ঘটক। কিন্তু, এই নাটকটি অসমাপ্ত রয়ে যায়।
আরও পড়ুন: প্রয়াত সাহিত্যিক শংকর! ‘জন অরণ্যে’ আজ বিষাদের ছায়া, বাংলার সাহিত্যের এক যুগের অবসান
এরপরেই তিনি আরও এক উপন্যাস লেখেন, ১৯৬২ সালে প্রকাশ পায় ‘চৌরঙ্গী’। স্বাধীনতা পরবর্তী যুগে সাহেব পাড়াকে ভিন্ন ভাবে চেনাতে, দেখাতে শিখিয়ে ছিলেন তিনি। তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুড়ি ভাগ করে নিয়েছিলেন পাঠকদের সঙ্গে আর সেই উপন্যাসও জায়গা করে নেয় চলচ্চিত্রতে।
তাঁর আরও একটি অনবদ্য উপন্যাস হল ‘দ্য মিডলম্যান’ যা নিয়ে চলচ্চিত্র তৈরি করেন স্বয়ং সত্যজিত রায়। ‘জন-অরণ্য’ নামে প্রকাশ পায় এই চলচ্চিত্র। এই কাহিনীতেই ফুটে ওঠে কীভাবে বেকারত্ব, নৈতিক অবক্ষয়ে আর দুর্নীতিতে বিপথে চালিত হয় এক শিক্ষিত যুবক। ব্যবসা করতে গিয়ে কীভাবে দুর্নীতির নাগপাশ জড়িয়ে ধরে এই উপন্যাস তথা চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্রকে। ব্যবসা করার বদলে তিনি হয়ে যান ‘দালাল’। তাঁর এই উপন্যাসের মাধ্যমেই ফুটে ওঠে সেই সময় কলকাতার দুর্নীতি, অনৈতিকতা আর ঠিক-ভুলের হিসেব গুলিয়ে দেওয়া কঠোর বাস্তব।
আরও পড়ুন: সাহিত্য জগতের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন!’- শংকরের মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ মুখ্যমন্ত্রীর
একইভাবে ‘সীমাবদ্ধ’-তেও ফুটে ওঠে সেই সময় মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত হয়ে ওঠার অসীম লোভ। অন্যদিকে, চৌরঙ্গিতে তাঁর লেখায় ফুটে ওঠে অন্য কলকাতার গল্প। তাঁর সেই চোখেই ধরা পড়েছিল সাহেবপাড়ার টানাপড়েনের নানা গল্প। এই কথক হিসাবেই ২০২০ সালে তিনি সাহিত্য আকাডেমি পুরস্কার পান। ‘একা একা একাশি’- উপন্যাসের হাত ধরে আসে এই পুরস্কার। ২০১৯ সালে তাঁর প্রিয় শহর কলকাতার ‘শেরিফ’ পদও পান তিনি। ২০১৮ সালে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি লিট সম্মান পেয়েছিলেন তিনি। ৯২ বছর বয়সে থামল কলকাতার কথকের গল্প বলা।
