তমলুকের বাসিন্দা তিনকড়ি মিত্র। বর্তমান বয়স ৮৪ বছর। তিনকড়িবাবুর দুই পুত্র ও দুই কন্যা। দুই পুত্রের মধ্যে এক পুত্রের মৃত্যু হয়েছে, অন্য পুত্র নিখোঁজ। দুই কন্যা বিবাহিত। বিয়ের পর থেকে দুই কন্যা শিপ্রা সাউ ও শম্পা দত্ত তিনকড়িবাবুর বাড়িতে বসবাস করেন। তিনকড়িবাবুর স্ত্রীও মারা গিয়েছেন। স্ত্রীর মৃত্যুর পর থেকেই তিনি কন্যাদের সঙ্গে থাকতেন।
advertisement
আরও পড়ুন: বিশ্বভারতী নিয়ে রিপোর্ট তলব কলকাতা হাইকোর্টের, মঙ্গলবার ফের শুনানি
২০১৮ সালে তিনকড়িবাবু দুই কন্যার নামে বাড়িটি গিফট ডিড করে দেন।তিনকড়িবাবুর আইনজীবী শমীক গঙ্গোপাধ্যায় আদালতে জানান, তিনকড়িবাবুর মেয়েরা জোর করে তাঁর কাছ থেকে বাড়িটি গিফট ডিড করিয়ে নিয়েছেন। এই বিষয়ে তিনি তমলুক আদালতে মামলাও দায়ের করেছেন। সেই মামলা এখনও বিচারাধীন রয়েছে।
আইনজীবী গঙ্গোপাধ্যায় হাইকোর্টে সওয়াল পর্বে আরও জানান, গিফট ডিড করার পর থেকে দুই কন্যা তিনকড়িবাবুর উপরে অত্যাচার শুরু করেন। ২০২১ সালের ৩ জানুয়ারি দুই কন্যা তিনকড়িবাবুকে বাড়ি থেকে বার করে দেন। ৮৪ বছরের তিনকড়িবাবুকে আশ্রয় দেন তাঁর বন্ধু দিলীপ বারিক। ফলে পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দকুমারে বন্ধুর বাড়িতেই থাকতে শুরু করেন তিনকড়িবাবু।
আরও পড়ুন: মাধ্যমিকের সময় ইন্টারনেট বন্ধে জনস্বার্থ মামলা, রাজ্যের হাতিয়ার 'গোয়েন্দা রিপোর্ট'!
নিজের বাড়িতে ফিরতে চেয়ে তমলুক থানায় তিনি আবেদন জানান। রাজ্যের সরকারি আইনজীবী অনির্বাণ রায় আদালতে জানান, পুলিশ বারংবার প্রচেষ্টা করেও বিফল হয়েছে। সব শুনে বিচারপতি রাজাশেখর মান্থা দুই কন্যার আইনজীবীর উদ্দেশে বলেন, 'আদালতের কর্তব্য একজন প্রবীণ নাগরিককে তার বাসস্থানে ফিরিয়ে দেওয়া। পাশাপাশি আদালতের কর্তব্য ওই প্রবীণ নাগরিক যাতে তাঁর শেষ বয়সে শান্তিপূর্ণ ভাবে কাটাতে পারেন তা সুনিশ্চিত করা।আদালতের নির্দেশ অবিলম্বে তিনকড়িবাবুকে তাঁর তমলুকের বাসস্থানে ফিরিয়ে দিতে হবে। এই বিষয়ে তমলুক থানার পুলিশ আদালতের নির্দেশকে বাস্তবায়িত করবে।'
আদালতের নির্দেশের পরই দুই কন্যার আইনজীবী আদালতে বলেন, তিনকড়িবাবু তাঁর বাড়িতে ফিরলে তাঁর দৈনন্দিন খাবারের সংস্থান তাঁকেই করে নিতে হবে। দুই মেয়ে কোনও রকম ভাবে তাঁর বাবাকে খাবারের দিতে পারবেন না।
পাশাপাশি আইনজীবী আরও দাবি করেন, তিনকড়িবাবু ছাড়া তাঁর ওই বন্ধু ও বন্ধু পরিবারের কেউ ওই বাড়িতে প্রবেশ করতে পারবেন না।
আইনজীবীর এই সওয়ালে হতচকিত হয়ে পড়ে কলকাতা হাইকোর্টের ১৩ নম্বর এজলাসে উপস্থিত প্রত্যেকেই। বিচারপতি মান্থা তিনকড়িবাবুর দুই মেয়ে আইনজীবীর উদ্দেশে বলেন, 'আপনি কী বলছেন! একজন বাবাকে তাঁর সন্তানরা খেতে দেবে না। যে বাবা তিল তিল করে এই সন্তানদের বড় করে তুলেছেন। সমাজের এ কী হাল হলো! বিচারপতির আসনে বসে আজ এটাও শুনতে হলো যে একজন বাবাকে খাবারের জন্য সন্তানদের কাছে ভিক্ষা করতে হবে।'
আইনজীবীর উদ্দেশে বিচারপতির পরামর্শ, 'বাবাকে ভালো করে রাখুন দেখবেন বাবার সঙ্গে সঠিক আচরণ করলে আপনাদেরও ভালো হবে।' তমলুক থানাকে বিচারপতির নির্দেশ দেন, ওই বাড়িতে যাতে তিনকড়িবাবু শান্তিপূর্ণ ভাবে বসবাস করতে পারেন, সে বিষয়ে অবশ্যই পুলিশ লক্ষ্য রাখবে।
