কিন্তু জীবনের টানাপড়েন বড় সাঙ্ঘাতিক৷ লুচির আকর্ষণকে টেক্কা দিয়ে যাচ্ছে দাদার মেধা৷ ভাল রেজাল্ট করে দাদা জয়েন্ট এন্ট্রান্সের দরজা পেরিয়ে ইঞ্জিনিয়ার৷ তাই নিজেই নিজের জন্য লক্ষ্য তৈরি করে ফেললেন৷ এবং ডুবলেন৷ মাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগে ভাল নম্বর পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিকে বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি৷ পরবর্তীতে বঝতে পেরেছিলেন তিনি বিজ্ঞানের ভুল দিকে আছেন৷ কিন্তু তত দিনে উচ্চ মাধ্যমিকে গণিতে বিপর্যয়৷ এর পর আশুতোষ কলেজ থেকে বিসিএ উত্তীর্ণ হন৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত মস্তিষ্ককে হারিয়ে দিল হৃদয়৷ রাহুল অরুণোদয়ের হিসেবের লাল জাবেদা হালখাতা লেখা হল কুশীলবের কলমেই৷
advertisement
নয়ের দশকের গোড়ায় কলকাতা দূরদর্শনে ‘প্রবাল রঙের আলো’-তে অভিনয় করেছিলেন শিশুশিল্পী হিসেবে৷ ২০০০ সালে ‘চাকা’ সিনেমায় মিঠুন চক্রবর্তীর সঙ্গে অভিনয় করে ফের নজর কাড়লেন রাহুল৷ এর পর রবি ওঝার ‘আবার আসব ফিরে’ ছবিতে প্রশংসিত হল রাহুল অরুণোদয়ের অভিনয়৷ ছবি বক্সঅফিসে সাফল্য না পেলেও রাহুলের চলার পথ কিছুটা হলেও সুগম হল৷ এর পরই ব্লক বাস্টার৷ ইন্ডাস্ট্রিতে মাইলফলক হয়ে এল ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’৷ বাঁধভাঙা সাফল্যে ভেসে গেলেন রাহুল৷ পর্দার ভালবাসা অনুরণিত হল বাস্তবেও৷ আগেই ধারাবাহিকের শ্যুটিঙে আলাপ হওয়া প্রিয়াঙ্কা সরকার শুধু ছবিতেই নয়৷ অপ্রতিরোধ্য প্রেমে নায়িকা হয়ে এলেন জীবনেও৷ বাড়ি থেকে পালিয়ে প্রথমে লিভ টুগেদার, তার পর বিয়ে৷
এগোতে থাকল সংসার, অভিনয়-দুই-ই৷ ‘জ্যাকপট’, ‘পরান যায় জ্বলিয়া রে’, ‘হ্যাংওভার’, ‘জিয়ো কাকা’, ‘কাগজের বউ’, ‘হইচই’, ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘বেডরুম’, ‘রূপকথা নয়’, ‘অভিশপ্ত নাইটি’, ‘জাতিস্মর’, ‘চতুষ্কোণ’, ‘ব্যোমকেশ ফিরে এল’, ‘এবার শবর’, ‘জুলিফকার’, ‘যখের ধন’, ‘বিদায় ব্যোমকেশ’, ‘ব্যোমকেশ গোত্র’, ‘আবার কাঞ্চনজঙ্ঘা’, ‘রাপ্পা রায় অ্যান্ড ফুল স্টপ ডট কম’-যে সিনেমায় যেমন সুযোগ পেয়েছেন, নিজের প্রতিভার ছাপ রেখেছেন রাহুল অরুণোদয়৷ ছবির পাশাপাশি ‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি’, ‘ইন্দুবালা ভাতের হোটেল’, ‘পুরোপুরি একেন’, ‘ঠাকুমার ঝুলি’-ওয়েব সিরিজেও নানা ভূমিকায় ধরা দিয়েছেন তিনি৷ বড় পর্দা, ওটিটি ছাপিয়ে টিভি ধারাবাহিকেও রাহুল অনন্য৷ ‘অর্ধাঙ্গিনী’, ‘দেশের মাটি’, ‘লালকুঠী’, ‘হরগৌরী পাইস হোটেল’, ‘গীতা এলএলবি’-ধারাবাহিকের দর্শকদের মনে দাগ কেটে গিয়েছে রাহুলের কাজ৷ বেশ কিছু দিন পর ফিরেছিলেন ‘ভোলেবাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের মুখ্য চরিত্র হয়ে৷ সেই ধারাবাহিকের শ্যুটিঙেই চলে গেলেন রাহুল৷ তালসারির সমুদ্র কেড়ে নিল এই প্রতিভাবান অভিনেতাকে৷ প্রিয় সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘ঘুণপোকা’-র শ্যামের চরিত্রে অভিনয় করার তারুণ্যে স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল।
উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না৷ চেয়েছিলেন শুধু যেন ইএমআই, বই কেনার খরচটুকুর সংস্থান থাকে৷ চাহিদা স্বল্প হলেও জীবনের চলার পথ এত মসৃণ ছিল না সব সময়৷ কেরিয়ারের শুরুতেই এসেছে মাদকের নেশার ছোবল৷ রিহ্যাবে যেতে হয়নি৷ কিন্তু হারিয়েছেন দুই বছর৷ কঠিন সংযমে, পেশাদারদের সাহায্যে, মায়ের সাহচর্যে, স্ত্রীর সহমর্মিতায় ফিরে এসেছেন জীবনের মূলস্রোতে৷ দাম্পত্যে ভাঙন এসেছে৷ পরকীয়ার গুঞ্জনে আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন রাহুল-প্রিয়াঙ্কা৷ আবার ফিরে এসেছেন কাছাকাছি, পাশাপাশি৷ তাঁদের সন্তান সহজের টানে৷ ছেলে সহজকে আগলে রেখে, ভালবেসে বড় করছিলেন দু’জনে৷ কিন্তু থমকে গেল সেই ছন্দ৷ থেমে গেল মূলস্রোত৷ অভিনয়, লেখালেখি, বইমেলায় বইপ্রকাশ, পডকাস্ট ফেলে রাহুল অরুণোদয় পাড়ি দিলেন অচিন ঠিকানায়৷ পড়ে থাকা শূন্যতায় অবগাহনের দায় অগণিত ভক্ত ও অনুরাগীর৷
