রাতে চক্ষুদান করায় অদৃশ্য হাত এসে ধরে চুলের মুঠি, মানকরের বড়মা কালীর নেপথ্য গল্প

বর্ধমান জেলার বর্ধিষ্ণু গ্রাম মানকর । এই গ্রামে আজ থেকে প্রায় সাতশো বছর আগে কালী পূজা শুরু করেন রামানন্দ গোস্বামী ।

বর্ধমান জেলার বর্ধিষ্ণু গ্রাম মানকর । এই গ্রামে আজ থেকে প্রায় সাতশো বছর আগে কালী পূজা শুরু করেন রামানন্দ গোস্বামী ।

  • Pradesh18
  • Last Updated :
  • Share this:

    #বর্ধমান: বর্ধমান জেলার বর্ধিষ্ণু গ্রাম মানকর ।  এই গ্রামে আজ থেকে প্রায় সাতশো বছর আগে কালী পূজা শুরু করেন রামানন্দ গোস্বামী । তিনি ছোটবেলা থেকে কালী মায়ের একনিষ্ঠ সাধক ছিলেন । কাব্যতীর্থ পাশ করার পর বেশীর ভাগ সময়ে শ্মশানে পড়ে থাকতেন । তাঁর বাবা দেবভক্ত হলেও কৃষ্ণমন্ত্রে দীক্ষিত হওয়ার জন্য পুত্রের কালী-মা ভক্তি মোটেই পছন্দ করতেন না ।

    কথিত আছে, কঠোর সাধনা করে মায়ের দর্শন পেয়ে ছিলেন রামানন্দ গোস্বামী । মায়ের সঙ্গে কথাও বলেছিলেন ঠাকুর রামানন্দ । তাঁর সাধনার স্থান ছিল কাশ আর বেতবনে ঘেরা শ্মশান । বর্তমানে যা মানকর ভট্টাচার্য পাড়া  নামে খ্যাত।

    বলা হয়, বড় মা কালী নাকি তিন বোন । মেজ বোন মানকর ডাঙাপাড়ায় ক্ষ্যাপা কালী, আর এক বোন পাল পাড়ায় পঞ্চানন কালী । একবার এক ঘটনা ঘটেছিল সাধক রামানন্দ শ্মশানে ধ্যানে মগ্ন । পাড়ার কেউ তাঁর বাবাকে এই  খবর দিয়েছেন । তাঁর কৃষ্ণভক্ত বাবা শ্মশানে এসে শুধু কৃষ্ণ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাননি । ওই শ্মশানের মধ্যে পঞ্চমুন্ডীর আসন প্রতিষ্ঠা করে মায়ের মন্দির তৈরী করেছিল ।

    পরবর্তীকালে মায়ের সেবার দায়িত্ব সঁপেছিলেন ঠাকুর বাণীকণ্ঠ ভট্টাচার্যের হাতে । তিনি ছিলেন মানকরের তৎকালীন জমিদার সদাশিব ভট্টাচার্যের বংশধর । প্রচলিত গল্পানুযায়ী, সাধক রামানন্দ তপস্যার দ্বারা সাতঘড়া জল এনেছিলেন এবং ওই জলেই বড় মা কালির মন্দিরে জীবন্ত সমাধি দেওয়া হয়েছিল তাকে ।

    পরবর্তীকালে সাধক রামানন্দের রীতি অনুযায়ী ঠাকুর বাণীকণ্ঠ পূজা অর্চনা করতেন । পুজোর জন্য আট রকমের ডাল যা আটটি উনুনে সেদ্ধ হত । কুড়ি সের এক পোয়া চালের অন্নভোগ ইচ্ছাপুরনের জন্য । শাক থেকে শুক্তো, মায়ের নতুন পুকুরের মাছ, গোবিন্দ ভোগ চালের পায়েস, ন'শলি চালের নৈবিদ্য, পাঁচ সের করে দশ সের ওজনের দুটি কদমা ।  এছাড়াও পাঁঠাবলি দেওয়া হত ।

    শ্যামাপদবাবু জানান, " একদিন এক শাঁখারী মায়ের পুকুর পাড় দিয়ে যাচ্ছেন । এমন সময় একটি কালো বরণ বাচ্চা মেয়ে তাঁর কাছে শাঁখা পরতে চায় । শাঁখারী দু-হাতে শাঁখা পরাতেই আরও দুটি হাত বাড়িয়ে দেয় ওই মেয়েটি । শাঁখারী হতবাক হলেও আবারও দুটি শাঁখা পরিয়ে টাকা চায় । মেয়েটি তখন উত্তরে জানায়,' মন্দিরের কুলুঙ্গিতে বেলপাতা ঢাকা দু-টাকা রাখা আছে ছেলেকে দিতে বলবি ।'

    শাঁখারী তাঁর কথা মতো বাণীকণ্ঠ ঠাকুরের কাছে সমস্ত কথা বলেন । ঠাকুর অবাক হলেও দু-টাকা সেখান থেকে দিয়ে শাঁখারীকে বলেন, আমার কোন মেয়ে নেই । যে মেয়েটি তোমার শাঁখা পরেছে তাঁর কাছে নিয়ে চল । শাঁখারী বাণীকণ্ঠকে নিয়ে গেলেও মেয়েটিকে আর দেখতে পায়নি । তখন ঠাকুর বুঝতে পেরে পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়েই মাকে শাঁখা দেখানোর অনুরোধ করেন । সন্তানের অনুরোধে মা কালী স্বয়ং পুকুরের মাঝে চার হাত তুলে শাঁখা দেখায় । সেই থেকে ওই শাঁখারীর বংশধরেরা এখনও মায়ের পুজোয় শাঁখা দিয়ে যায় । এছাড়াও রাত্রে মায়ের প্রতিমা তৈরীর কাজ নিষিদ্ধ ।

    দুর্গাপুজোর পর ত্রয়োদশীর দিন মায়ের কাঠামোয় মাটি পড়ে । কথিত আছে  বহু বছর আগে একবার এক প্রতিমাশিল্পী  রাত্রে মায়ের চক্ষুদান করছেন ।  ওই সময় এক অদৃশ্য হাত তার চুলের মুঠি ধরে বাইরে বের করে দিয়েছিল । পরে মন্দিরের পাশে তাল গাছে তার মুখ ঘষে ফেলে দিয়েছিল । পরের দিন সকালে স্থানীয় বাসিন্দারা আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে ।

    অন্যদিকে, মায়ের মুর্তিতে ছিন্নভিন্ন রক্তের দাগ দেখতে পায় । তখন থেকে আজও মায়ের প্রতিমা দিনেই তৈরী করা হয় । বাণীকণ্ঠ ঠাকুরের বর্তমান বংশধর মুক্তিপদ ভট্টাচার্য ও সুশান্ত ভট্টাচার্য জানান, " অতীতের রীতি মেনে এখনও পুজো হয় । পুজোর দিন রাতভর এখনও নরনারায়ন সেবা চলে" ।  তবে চলতি বছর ঠাকুরের বংশধর সুদীপ ভট্টাচার্য্য ও সুশান্ত ভট্টাচার্য্যের উদ্যোগে নতুন মন্দির তৈরী করা হয়েছে ।

    First published: