Bangla News: পাঁচটি সভ্যতার ছোঁয়া, 'রাজা পোঁতার ডাঙা' নিয়ে এবার আন্দোলন রাজ্যের বাইরেও!

বাঁচবে 'রাজা পোঁতার ডাঙা'?

Bangla News: 'রাজা পোঁতার ডাঙা' নিয়ে ফের আউশগ্রামের রামনগরে আন্দোলনে নেমেছে একটি গবেষকদল।

  • Share this:
#বর্ধমান: পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রামে "রাজা" পোঁতা আছে ডাঙায়!  লোকমুখে চর্চিত ইতিহাসের এই ঢিবির নাম "রাজা পোঁতার ডাঙা"। সেই ডাঙায় হাজার বছরের ইতিহাস মাটি চাপা পরে ছিল। স্থানীয়সুত্রে জানা গেছে, ঢিবি থেকে অনতিদূরে মল্লিকপুর-গোস্বামীখণ্ড গ্রামের বাসিন্দা চন্ডীকা প্রসাদ মুখোপাধ্যায় তখন ছিলেন হুগলির মহসিন কলেজের অধ্যক্ষ। তিনি অজয়ের ১৯৫৮ সালের বন্যায় রাজা পোঁতার ঢিবি একটি অংশ খয়ে গিয়ে, কিছু ইতিহাস সামগ্রী সামনে আসায় কেন্দ্রীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগে চিঠি দেন। তারপরই নড়েচড়ে বসে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগ। মল্লিকপুর-গোস্বামীখণ্ডের পাশে নতুন ছোড়া থানার কাছে, ডিভিসি ক্যানেল পাড়ে রয়েছে বারাসাতের ডাঙা ইতিহাসক্ষেত্রটি। এটি রাজা পাণ্ডুর ধর্মালয় ছিল। জমাট ল্যাটারাইটের মৃত্তিকা দিয়ে বন্ধ করা হয়েছে, প্রত্ন ষড়ঙ্গের দ্বার। তার থেকে ১ কিমি দূরে পাণ্ডুরাজা ঢিবি পুরাতত্ত্ব বিভাগের সংরক্ষিত এলাকা নিয়ে ফের আউশগ্রামের রামনগরে আন্দোলনে নেমেছে একটি গবেষকদল। তাদের এই আন্দোলনের মূল হোতা তরুণ লেখক, লোকগবেষক রাধামাধব মণ্ডল। পাণ্ডুরাজার ঢিবিতে সংরক্ষণ শালা তৈরির দাবিতে পুরোনো আন্দোলনকে হাতিয়ার করে ফের শুরু করেছে আন্দোলন। তবে ২০০৮ সালের পর থেকে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে লেখক রাধামাধব মণ্ডল নিজের উদ্যোগে কয়েকজন গবেষককে নিয়ে গড়ে তোলেন "পাণ্ডুরাজা প্রত্ন গবেষণা কেন্দ্র "। সংগঠনের তরফ থেকে পুরাতাত্ত্বিক  বিভাগসহ দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং পাণ্ডুরাজার ঢিবির দায়িত্বে থাকা কালনা অফিসের আধিকারিক, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, এমনকি জেলা প্রশাসনের কাছেও অভিযোগ করেছেন। সংগঠনের সম্পাদক, লেখক রাধামাধব মণ্ডল বলেন," বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসকে চাপা দেওয়ার চক্রান্ত চলছে, ভারত সরকারের পুরাতত্ত্ব বিভাগের ষড়যন্ত্রে। আমরা পথে আছি, দীর্ঘ লড়াই হবে প্রাগৈতিহাসিক এই সভ্যতার ঢিবির ইতিহাসকে সামনে আনতে আগামীতে। সংরক্ষিত এই ইতিহাসক্ষেত্রটির উৎখননের তথ্য সামনে আনলে ভারতবর্ষের ইতিহাস বদলে যাবে, সে কারণেই বাঙালির ইতিহাসকে চাপা দিতে সমস্ত তথ্য সামনে আনছে না পুরাতত্ত্ব বিভাগ। দীর্ঘ দিন পুরাতত্ত্ব বিভাগের বিরুদ্ধে এই লড়াই চলছে, চলবে।" শুধুতাই নয় গোটা দেশে এই আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিতে, সোশাল মিডিয়াতে সাহায্যের জন্য আবেদনও করেছে সংগঠনের সম্পাদক গবেষক রাধামাধব মণ্ডল। সারাও মিলছে। ইতিমধ্যেই নানা মাধ্যমে আওয়াজ তোলা শুরু হয়েছে। তবে আন্দোলনের নানা রূপরেখা তৈরিতে যখন ব্যস্ত রাধামাধববাবুরা, ঠিক তখনই  নড়েচড়ে বসছে পুরাতত্ত্ব বিভাগ। সিন্ধু সভ্যতার প্রাচীন এই ইতিহাসক্ষেত্রটিকে বাঁচানোই সংগঠনের লক্ষ্য। সঠিক তথ্য প্রকাশ করা হলে ভারতবর্ষের ইতিহাস বদলে যাবে, বলে জানান বহু গবেষক। বর্ধমানের পুরাতত্ত্ব বিভাগের কর্মী আব্দুল মালেককে পাঠিয়েছে কালনা পুরাতত্ত্ব বিভাগ, যাতে পাণ্ডুরাজার ঢিবির সংরক্ষিত এলাকাতে আগাছা নিধনসহ এলাকা পরীক্ষা করে আসা হয়। সেই সঙ্গে আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি নিয়েও খোঁজখবর রাখতে শুরু করে পুরাতত্ত্ব বিভাগ। সংরক্ষিত "পাণ্ডুরাজার ঢিবির" দায়িত্বে থাকা একাধিক ব্যক্তিও মানছেন এই ইতিহাসক্ষেত্রের এই ভগ্ন অবস্থার কথা। হারাতে বসেছে বাঙলা ও বাঙালির ইতিহাসের প্রাচীনত্বের গৌরবগাথা। লেখক রাধামাধব মণ্ডলের মতো বহু দেশ-বিদেশের গবেষকরাও পাণ্ডুরাজা প্রত্ন গবেষণা কেন্দ্রের লড়াইএর পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের অনেকে বলছেন, এই লড়াই এবার দিল্লিতেও হবে। পুরাতত্ত্ব বিভাগের কাছে বেশকিছু দাবী নিয়ে বার বার ছোট ছোট আন্দোলন সংগঠিত করেছে।তবে এবার বড় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ইতিমধ্যেই নানা কর্মসূচি ঘোষনা করেছে সংগঠনের সম্পাদক। পাণ্ডুরাজা প্রত্ন গবেষণা কেন্দ্রের দীর্ঘ দিনের দাবি," ঢিবিতে সংরক্ষণশালা করতে হবে। আর এখান থেকে উদ্ধার হওয়া সমস্ত প্রত্নবস্তু এখানকার সংরক্ষণশালাতে রাখতে হবে। এবার বৃহত্তর লড়াই শুরুর আগেই, খবর পেয়ে দায়সারা পরিষ্কার করতে শুরু করলো ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগ, এটা লড়াইএর গতিপথকে বিভ্রান্ত করা! এই কর্মসূচি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন গবেষকরা। যদিও গবেষণা কেন্দ্রের সম্পাদক রাধামাধববাবু এবিষয়ে বলেন, "ঘাস কেটে কী হবে? কেন এই দায়সারা কাজ!? আমাদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা?  জবাব চাইছি। চলবে লড়াইও। এবার আমরা বৃহত্তর লড়াইএর পথে হাঁটবো। দেখি আর কতদিন, নীরব থাকে ভারত সরকারের পুরাতত্ত্ব বিভাগ। বাংলা ও বাঙালির এই বৃহৎ ইতিহাসক্ষেত্রের সমস্ত তথ্য সামনে আনতে হবে।"পাণ্ডুরাজা প্রত্ন গবেষণা কেন্দ্রের দাবি," সংরক্ষিত স্থানটিতেই সংরক্ষণ শালা করতে হবে দ্রুত। আগের মতো সর্বক্ষণের রক্ষী রাখতে হবে, তা না হলে চুরি হচ্ছে ইতিহাস বস্তু। ইতিহাসক্ষেত্রটির সঠিক সংরক্ষণ জরুরি এবং পুনরায় খনন করতে হবে। ৮৫% স্থানে খনন হয়নি, পূর্বের খনন রিপোর্ট অনুযায়ী। পুরাতত্ত্ববিদ পরেশচন্দ্র দাশগুপ্তের খনন রিপোর্ট অনুযায়ী সমস্ত উদ্ধার হওয়া প্রত্নবস্তু একত্রে এনে "পাণ্ডুরাজা সংরক্ষণ শালা" নির্মাণ করে রাখতে হবে, ইতিহাসক্ষেত্রটির কাছেই। রক্ষী ঘর, বাথরুম, গেস্ট হাউস করতে হবে। বেড়া, দেওয়াল, তার কাঁটা, পুরোনো বোর্ড সবই ভেঙ্গেছে। মেরামত নেই দীর্ঘ দিন। সংরক্ষিত ক্ষেত্রের উপরে এবং চারদিকে লাইট পোস্ট করতে হবে। এখন সংরক্ষিত ইতিহাসক্ষেত্র চড়ছে গরু। কেউ কেউ কাটছে ঘাস।" এই সব দাবি গুলো লিখেই অভিযোগ করা হয়েছে বিভিন্ন দপ্তরে। সংগঠনের পক্ষ থেকে "পাণ্ডুরাজা উৎসব " করা হয় প্রতি বছর। সেই সঙ্গে দেশের দুই কৃতি মানুষকে প্রতি বছর এই উৎসবে দেওয়া হয়, পাণ্ডুরাজা স্মৃতি পুরস্কার। যদিও দীর্ঘ করোনাকালে দু'বছর বন্ধ রয়েছে এই উৎসব বলে জানা যায়। পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রামের রামনগর গ্রাম পঞ্চায়েতের পাণ্ডুকের রসফাল্লা পুকুরপাড়ের এই রাজা পোঁতার ডাঙায়, ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগ ১৯৬২, ১৯৬৩,১৯৬৪,১৯৬৫ এবং শেষ ১৯৮৫ তে খননকার্য চালায়। সেই খননকাজে বিশিষ্ট পুরাতত্ত্ববিদ পরেশচন্দ্র দাশগুপ্ত, ড দেবকুমার চক্রবর্তী, শ্যামচাঁদ মুখার্জী রা ছাড়াও সে সময়ের এশিয়ার বিশিষ্ট পুরাতত্ত্ববিদ ওয়াই ডি শর্মা, হংসলাল ধীরাজলাল শঙ্খলিয়া,  ড. বি বি লাল- রা উপস্থিত ছিলেন। প্রায় সাড়ে চার হাজার প্রত্ন বস্তু উদ্ধার হয়েছে এখান থেকে। ইতিহাস ও গুরুত্বে তা বেশ মূল্যবান বলে উল্লেখ করেছেন পুরাতত্ত্ববিদরা। একই স্থানে পাঁচটি সভ্যতা আবিষ্কৃত হয়েছে এই ঢিবিতে। শুধু তাই নয়, এই প্রত্নক্ষেত্রে ধাতব শিলালেখ, হাতির দাঁতের বিভিন্ন বস্তুসহ ১১ টি করোটি বিহীন মানব সমাধি, এশিয়ার প্রথম পাত্র সমাধি, কলস সমাধি, শৃঙ্খ বিহীন কার্তেকীয় মূর্তি, প্রাগৈতিহাসিক পর্বের কিছু নমুনাও বিজ্ঞানীদের অবাক করে। যা ভূমধ্যসাগরের ক্রিস দ্বীপদেশের সঙ্গে মিল পান। স্থানীয় মানুষ উল্লাসপুরের ভক্তিপদ মেটে বলেন, "আমরা দীর্ঘদিন পুরাতত্ত্ব বিভাগের, পরেশবাবুর নেতৃত্বে খনন শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছি। প্রচুর প্রত্নমূর্তি, শিলালিপি, পাথর ও হাড়ের অস্ত্র এবং মহিলাদের নানান ব্যবহার্য সামগ্রী পাওয়া যায়। নানান ধাতব, মৃৎপাত্র, মৃৎশিল্প পাত্র, পাথরের নানা জিনিসপত্র পাওয়া যায়। যা রেডিও কার্বন পদ্ধতিতে পরীক্ষিত। আমরা সে সব অবাক হয়ে শ্যামচাঁদ বাবুদের পরীক্ষা নিরীক্ষা। সে সব উদ্ধার হওয়া সামগ্রী এখানে রাখা হলে, বহুমানুষ যারা ঢিবি দেখতে আসেন তারা দেখতে পাবেন। পড়ুয়ারা আসে, তাদের কাজে লাগবে। এলাকাটিতে একটি বাণিজ্যিক পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা হলে, মানুষের কর্মসংস্থান হবে। সরকার ভাবুক। "
Published by:Suman Biswas
First published: