এক খিলি পান মুখে অমলের গান থেকে মরুভূমিতে জটায়ুর কবিতা, সত্যজিতের কাজে বার বার পড়েছে রবিছায়া

ছবি সৌজন্যেঃ ফেসবুক।

বালক সত্যজিতের সই সংগ্রহের খাতাতেই বৃদ্ধ কবি লিখে দিয়েছিলেন, বহু দিন ধরে ভ্রমণের পরেও একটি ধানের শিষের উপর একটি শিশিরবিন্দুকে দেখা না হয়ে ওঠার পদ্য৷

  • Share this:

    #কলকাতাঃ  ছোট্ট দু’টি হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল অটোগ্রাফের খাতা৷ সইয়ের সঙ্গে এসেছিল কবিতাও৷ বালক সত্যজিতের সই সংগ্রহের খাতাতেই বৃদ্ধ কবি লিখে দিয়েছিলেন, বহু দিন ধরে ভ্রমণের পরেও একটি ধানের শিষের উপর একটি শিশিরবিন্দুকে দেখা না হয়ে ওঠার পদ্য৷ বহুপঠিত সেই পদ্যের জন্মবৃত্তান্তও এখন বহুচর্চিত৷ কালক্রমে রবীন্দ্রনাথ এবং সত্যজিৎ, এই দুই বৈশাখজাতকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে বাঙালির মনন৷

    মায়ের ইচ্ছাতেই শান্তিনিকেতনে পড়তে গিয়েছিলেন সত্যজিৎ৷ আশ্রমিক জীবন থেকে যা পেয়েছেন, এবং সেই জীবনের প্রতি বৈরাগ্য, দু’টি দিক নিয়েই অকপট ছিলেন তিনি৷ তাঁর কাজের মধ্যেও বার বার ঘুরেফিরে এসেছেন রবীন্দ্রনাথ৷ ‘চারুলতা’, ‘ঘরে বাইরে’ এবং ‘তিন কন্যা’ ছবিতে সত্যজিতের চোখ দিয়ে দর্শক দেখেছেন রবীন্দ্রসাহিত্যের নারীচরিত্রদের৷ সত্যজিতের ছবিতে রবীন্দ্রসাহিত্য নিয়ে ইতিমধ্যেই বহু আলোচনা হয়েছে৷ আসুন, এক বার চোখ রাখি ফেলু কাহিনিতে৷ ফেলুদার অভিযান কোনও দিনই নিছক এক প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটরের গল্প নয়৷ বরং, এই গল্প পাঠকের কাছে খুলে দেয় বর্ণময় ক্যালাইডোস্কোপ৷ বুদ্ধিদীপ্ত বাঙালি মধ্যবিত্তের প্রতীক প্রদোষচন্দ্র মিত্র৷ তার পারিপার্শ্বিকে রবীন্দ্রনাথ এসেছেন, যেমন তিনি আসেন বাঙলির দিনযাপনেও৷

    ফেলুদার স্মরণশক্তির পরিচয় ঠিক করতে সত্যতিৎ বেছে নিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের ‘দেবতার গ্রাস’৷ খুব অল্প সময়ে সামান্য আয়াসে এই কবিতা মুখস্থ করেছে ফেলু৷ ‘বাদশাহী আংটি’-তে এই কবিতার উল্লেখ আমরা পাই৷ নবাবি শহরে অওরঙ্গজেবের আংটি ঘিরে বনবিহারীর মতো ঠান্ডা মাথার অপরাধীর সঙ্গে ফেলুর মোকাবিলার পটভূমিতে একাধিকবার এসেছেন রবীন্দ্রনাথ৷ অবাঙালি চিকিৎসক শ্রীবাস্তবের ‘গীতাঞ্জলি’ পাঠ থেকে ফেলুর মুখে ‘কতকাল রবে বল ভারত হে’, বার বার এসেছে রবীন্দ্রপ্রসঙ্গ তথা ঠাকুরবাড়ির স্পর্শ৷

    ‘সমাদ্দারের চাবি’ গল্পে বাদ্যযন্ত্র পেয়ে ফেলুদা বাজিয়েছিল ‘জনগণমন’ সুর৷ আর রয়েল বেঙ্গল রহস্যে লুকিয়ে রাখা নারায়ণী মুদ্রার খোঁজার নিশানা তো রবীন্দ্রনাথের ‘গুপ্তধন’ ছোটগল্পের ‘ধারাগোল’ সঙ্কেতরই ছায়া৷ তবে বাঙালি যাপনে প্রাণের কবির প্রভাব তুলে ধরতে ফেলুদার থেকে জটায়ুকেই বেশি বার বেছে নিয়েছেন সত্যজিৎ৷

    ‘ছিন্নমস্তার অভিশাপ’-এ ‘ফাগুনের নবীন আনন্দে’, ‘ধানের ক্ষেতে রৌদ্র ছায়ায়’ থেকে ‘নেপোলিয়নের চিঠি’-তে ‘জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে’, রহস্যরোমাঞ্চ ঔপন্যাসিক লালমোহন গাঙ্গুলীর কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত এসেছে বার বার৷ ‘জাঙাঙ্গীরের স্বর্ণমুদ্রা’-য় জটায়ুর মুখে রবীন্দ্রসৃষ্টির ভুল উদ্ধৃতির মধ্যে ধরা দিয়েছে আমবাঙালিই৷ কথায় কথায় রবীন্দ্রনাথের উদ্ধৃতি দিতে আমরা জুড়িহীন৷

    রবীন্দ্রসঙ্গীত এতটাই মজ্জাগত, যে মগনলাল মেঘরাজের মুখোমুখি হয়েও জটায়ু গেয়ে ওঠেন ‘আলোকের এই ঝর্নাধারায়’৷ অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় চিররোমান্টিক বাঙালি যে ঘোর বিপদেও রবীন্দ্রনাথকে ভুলতে পারেন না, তারও প্রতীক লালমোহন গাঙ্গুলিই৷ ফেলুভক্তদের মনে গেঁথে রয়েছে ‘সোনার কেল্লা’-র সেই সিকোয়েন্স৷ গাড়ি বিকল, রামদেওরা অবধি যেতে হলে উট ছাড়া গতি নেই৷ বহুলালিত স্বপ্ন সত্যি হওয়ার ক্ষণে জটায়ুর মুখে ‘ইহার চেয়ে হতেম যদি আরব বেদুইন’ ছাড়া আর অন্য অভিব্যক্তি আসতে পারে কি?

    পাশাপাশি ভাবুন ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ অভিযানও৷ বেঙ্গলি ক্লাব যদি ‘কাবুলিওয়ালা’ নাটক মঞ্চস্থ না করত, কাশীতে বসে ফেলুদা কোথায় পেত মছলিবাবার ছদ্মবেশ? ওই নাটকের মেকআপ ম্যান না থাকলে কে সাজিয়ে দিত তাকে? আদ্যন্ত ফেলুভক্তরা সোনার গণেশ উদ্ধারে এই রবীন্দ্রসংযোগ ভুলতে পারবেন না৷ আপাদমস্তক বাঙালি ফেলু একবার শান্তিনিকেতন যাবে না? স্রষ্টাকে ভাবিয়েছিল সেই প্রশ্নও৷ অভিযান পর্বের শেষ দিকে থ্রি মাস্কেটিয়ার্সকে সত্যজিৎ নিয়ে গেলেন সেখানেই, ‘রবার্টসনের রুবি’ গল্পে৷ এর পরেও সন্দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে ‘ইন্দ্রজাল রহস্য’৷ কিন্তু শারদীয়া সংখ্যায় প্রকাশিত ফেলুদার শেষ সম্পূর্ণ উপন্যাস ‘রবার্টসনের রুবি’-ই৷ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯২ সালে সত্যজিতের প্রয়াণের কয়েক মাস পরে৷ শুরু থেকে শেষ কোথায় যেন ফেলুদার অভিযানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে থেকে যান বাঙালুর প্রাণের ঠাকুর৷

    আসলে তিনি তো বাঙালির জীবনে সেই স্পর্শ, যাতে ওঠাপড়ার অভিঘাত মনকে সহজে আহত করতে না পারে৷ তাই তিনিই মিলিয়ে দেন এক খিলি পান মুখে অমলের গান, গ্রামাফোনের ভিতরে মৃন্ময়ীর নূপুর লুকিয়ে রাখা থেকে ফেলুদাদের তিন মূর্তির বাঙালিয়ানাকেও৷

    Arpita Roy Chowdhury

    Published by:Shubhagata Dey
    First published: