উমা রিভিউ: শহুরে মানুষের ব্যস্ত মনে লুকিয়ে থাকা আবেগকে খোঁচা দেবেই ‘উমা’

উমা রিভিউ: শহুরে মানুষের ব্যস্ত মনে লুকিয়ে থাকা আবেগকে খোঁচা দেবেই ‘উমা’

Film Stills

এখনও এই শহরের কিছু মানুষের মধ্যে আবেগ রয়েছে ! আমরা তাঁদের কাছে যাবও ! ’

  • Share this:

    #কলকাতা: ‘এখনও এই শহরের কিছু মানুষের মধ্যে আবেগ রয়েছে ! আমরা তাঁদের কাছে যাবও ! ’ পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের নতুন ছবি ‘উমা’কে এই একটি সংলাপেই হয়তো বেঁধে ফেলা যায় ৷ কারণ, উমা আসলে একটি ‘আবেগ’ ৷ একটি মেয়ের সঙ্গ নিয়ে তা ছবির ‘রূপক’ ৷ আর এই রূপকগুলোকেই পরপর সাজিয়ে ‘উমা’ গড়েছেন সৃজিত ৷ ঠিক যেমন চরিত্রের নাম, উমা, হিমাদ্রী, মেনকা, ব্রহ্মনন্দ, বিশ্বরূপ, অর্ক, বরুণ, মহীতোষ সূর ৷ প্রত্যেকটি চরিত্রই উমার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ৷ আর রয়েছে আমাদের শহর ৷ শহর কলকাতা !

    সৃজিত এই প্রত্যেকটি বিষয়কে একসঙ্গে করে এক গল্প বেঁধেছেন ৷ যে গল্পে উমার আগমণ ও ইচ্ছে পূরণ ৷ আর তার সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছেন ওন্তারিয়োর বাসিন্দা ইভানের গল্পকে ৷ ইভানের গল্পে যা ছিল বড়দিন ৷ ‘উমা’তে তাই দুর্গাপুজো ৷

    আরও পড়ুন 

    ‘রেইনবো জেলি’ রিভিউ : বাংলায় ‘তারে জমিন পর’ তৈরি হলে, আমির লাগবে না, লাগবে ‘ঘোতন’!

    আমাদের কাছে দুর্গাপুজো মানেই সত্যিই তো নস্ট্যালজিয়া ৷ সত্যিই তো নতুন কিছুর শুরু কিংবা ইচ্ছে পূরণের দিন মাপা ৷ তাই তো বছরের শুরুতে বাড়িতে ক্যালেন্ডার ঢুকলে, প্রায় অভ্যাসের মতো সবাই দেখে নিই, এবারের দুর্গাপূজোর তারিখগুলো ৷ এই অভ্যাসকেই যেন ছবির প্রেক্ষিতে ব্যবহার করলেন সৃজিত ৷ সুইজারল্যান্ডে বড় হওয়া উমার কাছে দুর্গাপুজোর ক্যালেন্ডার নেই, রয়েছে বাবার কাছে শোনা কলকাতার দুর্গাপুজোর গল্প ৷ আর রয়েছে মাকে সামনে থেকে দেখার ইচ্ছে ৷

    আপাত দৃষ্টিতে দেখলে এই ছবি এক বাবা ও মেয়ের ইচ্ছে পূরণের গল্প ৷ কিন্তু গল্পের তোর যত এগোয়, বাবা ও মেয়ে থেকে বেরিয়ে যেন উমা গল্প বলে সর্ব সাধারণেই ৷ গল্প বলে শহুরে মানুষের, গল্প বলে কলকাতার আবেগের ৷

    কলকাতা কী আবেগ হারিয়েছে? কিছু দৃশ্যে সে প্রশ্নও তোলেন সৃজিত ৷ আবার পরের মুর্হূর্তে তার উত্তরও দেয় ৷ আর তাই তো ছোটো ছোটো দৃশ্যে এক ‘নকল’ পুজোর আয়োজন করে শহরের আসল ছবিটাকে সামনে এনে দাঁড় করান সৃজিত ৷ ঠিক যেমন ছবিতে সিনে পরিচালক ব্রহ্মদেব (অঞ্জন দত্ত )! নিজের স্ত্রী ও সন্তানের সঙ্গে দূরত্বের মাপ পায় উমার হাত ধরে ৷ তাই তো সঠিক, সুন্দর ক্লাইম্যাক্স দিতে প্রায় পাগল হয়ে ওঠেন তিনি ৷ ঠিক যেমন টলিউড ইন্ডাস্ট্রির গোবিন্দ অবলীলায় ছিঁড়ে ফেলে চেক ! ঠিক যেমন প্রথমে ‘অসূর’ হয়ে আসা মহীতোষ সূর, প্রতিফলনে দেখে নেয়, নিজের ভিতরের ‘নোংরা’ মানুষটিকে ৷ উমার চোখে চোখ দিয়ে বদলে যায় নামকরা ‘গুন্ডা’ (বাবুল সুপ্রিয়) ! অভিনয় করতে করতে মারিয়ামের চোখ ভিজে যায় আসল চোখের জলে ৷ এমনকী, বদলে যায় হিমাদ্রী স্ত্রীয়ের ‘প্রেমিক’ ইন্দ্রনীলও (সৃজিত মুখোপাধ্যায়) ৷

    উমা ছবিতে পর পর সৃজিত এনেছেন অনেক কিছু ৷ সোশ্যাল মিডিয়ার বাড়বাড়ন্ত, ধর্ম নিয়ে রাজনীতি ৷ কিন্তু প্রত্যেকট বিষয়েই এক বদলে যাওয়ার ইচ্ছে বা বদলের সংকেত দিয়েছেন সৃজিত ৷ ‘উমা’ আসলে এক পালটা হাওয়া ৷ ঠিক যেমন অক্টোবরের অকাল-বোধন ছবিতে এল বাসন্তি পুজো রূপে ৷

    আসলে আবেগের কোনও আসল, নকল, সঠিক সময় বা বেঠিক সময় হয় না ৷ যেকোনও সময়ই উমা জাগতে পারে মনের ভিতর ৷ তাই যেন প্রতিটি ফ্রেমে বলে গিয়েছেন পরিচালক সৃজিত ৷ এখানেই এই ছবির সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ৷ তবে চিত্রনাট্য আরও কমপ্যাক্ট হতে পারত ৷ ছবির শেষে এসে শ্রাবন্তীর সংলাপে শহরের ‘ন্যারেটিভ’ বেমানান লাগে ৷ কারণ, গোটা ছবিতেই তো আবেগের শহরের কথা বলেছেন সৃজিত ৷ সংলাপের সাহায্য নিয়ে জোর করে মনে করানোর কী প্রয়োজন ছিল ! তাই শেষে রেশটুকু থাকলেই হতো ! ‘উমা’র ছবি থেকে আরেক প্রাপ্তি, অনুপমের গান ৷ সৌমিক হালদারের ক্যামেরা অসাধারণ ৷

    অভিনয়ের দিক থেকে যিশু সেনগুপ্ত, অঞ্জন দত্তের কাঁধেই ছবির গুরু দায়িত্ব ছিল ৷ হতবাক করেছেন বাবুল সুপ্রিয় ৷ ছোট্ট সারা সেনগুপ্ত-র অভিব্যক্তি নজর কাড়ে ৷ অল্প পরিসরে গার্গী বেশ ভালো৷  শ্রাবন্তী, রুদ্রনীল, অনিবার্ণ যথাযথ ৷ ছবিতে রাজ চক্রবর্তী, কমলেশ্বর, অরিন্দম শীল, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, দেব, নুসরৎ, মিমি-র উপস্থিতি টলিউড ইন্ডাস্ট্রিকে একটা পরিবারের লুক দেয় ৷ সবশেষে বলা যায়, বক্স অফিসের অঙ্ক যাই হোক না কেন, ‘উমা’ শহুরে মানুষের ব্যস্ত মনে লুকিয়ে থাকা আবেগকে খোঁচা দেবেই !

    First published: