আমাকে ক্ষমা করবেন ডানা মাঝি...

Aug 26, 2016 05:05 PM IST | Updated on: Aug 26, 2016 05:06 PM IST

ভবানীপটনার জেলা হাসপাতালে আমিও ছিলাম। আমাঙ দেয়ি যখন মারা যায় তখন আমি পেশেন্ট দেখে বেরোচ্ছিলাম। আপনার মেয়ে যখন আপনাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিল বলেছিলাম, "দরজাটা ছেড়ে দাঁড়াও তো বাপু।" কাঁদতে কাঁদতে আপনি এসে আমার পায়ের কাছে বসে পড়েছিলেন। আপনার দেখাদেখি আপনার মেয়েও। এক মিনিটও আপনার কোনও কথা শোনার প্রয়োজন বোধ করিনি। আপনার কান্না বা আপনার মেয়ের গোঙানিতে আদিবাসী বাস্প ছিল। শহুরে জুনিয়র ডাক্তার আমি। ওই বাস্প আমার চশমার কাঁচ ঝাপসা করতে পারেনি।

।।আমাকে ক্ষমা করবেন ডানা মাঝি।।

আমাকে ক্ষমা করবেন ডানা মাঝি...

আমিও ছিলাম। আমি ছিলাম কাউন্টারে। আপনি বলছিলেন, আমাঙ-এর টিবি-র পিছনেই সব টাকা শেষ। কানাকড়িও নেই। বলছিলেন, বাপ মেয়েতে কী খাবেন জানেন না। কিন্তু কী করব বলুন। আপনার জন্য তো অ্যাম্বুলান্সটাকে ষাট কিলোমিটার দৌড় করাতে পারি না। সে তেলই তো নেই। মাসের প্রথমেই সে তেলের টাকা ভাগ বাঁটোয়ারা হয়ে গেছে। সে সব কি আপনাকে বলা যায়? শুধু বলেছিলাম, "তোর গ্রামে নিয়ে যাবি না অন্য কোথায়.. কী ভাবে সে তোকেই করতে হবে। তবে তাড়াতাড়ি। হাসপাতালে টিবি রোগীর বডি ফেলে রাখা যাবে না।"

।।আমাকে ক্ষমা করবেন ডানা মাঝি।।

নিমগাছটার কিপটে ছায়ায় বসে যখন আপনার মেয়েকে বলছিলেন, তোর মা বাড়ি যাবে না, তা কি হয়? নিয়ে তো যেতেই হবে। ডুকরে কেঁদে উঠেছিলেন। তখন আমিও ছিলাম আপনার পাশে। কিছু কথা শুনতে পাচ্ছিলাম.. কিছু পাচ্ছিলাম না। না, না। আপনার গলায় কান্না জড়ানো ছিল বলে নয়। অস্পষ্ট শুনছিলাম কারণ তখন আমি দু ছিলিম শেষ করেছি সবে। কিচ্ছুটি বলিনি। কী ই বা বলতাম? বলতে তো পারতাম না, ডেডবডি নিয়ে যাওয়ার গাড়ির আমি ড্রাইভার বটে, তবে চালাতে কোনোদিনই হয়নি। কারণ, ও গাড়ি কখনও হাসপাতালে এসে পৌঁছয়নি যে। যে ট্রেকারটা নিয়ে ট্রিপ খাটি, সেটা নিয়েই যেতে পারতাম তোমার গ্রামে, তোমার আমাঙ-কে শুইয়ে। কিন্তু.. অনেক কষ্টে পয়সা আনি ঘরে। হাসপাতালের বাবুরা বলেছে, আমার ছেলেকেও হাসপাতালে কাজ দেবে। আমার ছেলেকে এরপর আর নীচুজাত বলবে না কেউ। হুট করে তোমার ভালো করতে যাওয়ার মুরোদ আমার আজ নেই। বিকেলের মরে যাওয়া আলোর দিব্যি আমি আমার বউ বাচ্চা নিয়ে শুধু একটু ভালো থাকতে চাই।

।।আমাকে ক্ষমা করবেন ডানা মাঝি।।

ছিলাম আমিও। ডাক্তারদের রাতের টহল শেষ হওয়ার পর খাটিয়াটায় শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম, আর তো কটা দিন। তারপরেই চম্পাকে নিয়ে আসব আমার কাছে। চৌকিদারের বউ হয়ে থাকবে এই হাসপাতালেই। আরও কি সব যেন ভাবছিলাম। তখনই তো দেখলাম, কেমন যত্ন করে আমাঙ-এর বডিটা কাঁধে তুলে হাসপাতালের বাউন্ডারি পেরিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছ তুমি। তোমার মেয়ের হাতে একটা ঝোলা মতো, যাতে তার মায়ের শাড়ি জামা.. মায়ের গন্ধ। একবার ভাবলাম, ডাকি তোমায়। বলি, একটু অপেক্ষা করতে। সকাল হলে আমিই না হয়ে আমার বাইকে করে নিয়ে যেতাম। এ রকম তো কতই যায় দেখেছি। বলিনি। বলতে পারিনি। কদিন পরেই বিয়ে। ছুটি মঞ্জুর হয়ে রয়েছে। এখন এ সবে জড়ানোর তো কোনও মানে হয় না। কোথা থেকে কী হয়ে যায়..

।।আমাকে ক্ষমা করবেন ডানা মাঝি।।

আমি খবরটা সাতসকালেই পেয়েছিলাম। রাস্তায় পৌঁছে দেখি, আরও অনেকেই পৌঁছে গেছে ক্যামেরা নিয়ে। আমি মোবাইলেই তুললাম। তিরিশ সেকেণ্ডের ক্লিপ তুলেই পাঠিয়ে দিলাম সিটি অফিসে। অনেক দিন পর আজ সকালটা সত্যিই ভালো। জানি, আজ এই স্টোরি হেডলাইন হবেই। সিটি অফিস জানিয়ে দিল, ফোনো দিতে হবে। দিলাম। ব্যুরো চিফ ফোন করে খোঁজ নিলেন। বুঝলাম, এখানেই শেষ নয়। বড় কিছু হবেই। মন্ত্রী আমলা পর্যন্ত যাবে। অবশ্য তাতে একটা সুবিধা হবে। আরও পঞ্চাশ কিলোমিটার পথ বাকি। খবরটা জানাজানি হলে যদি একটা অ্যাম্বুলান্স টান্স পাওয়া যায়.. অন্তত কিছুটা সুরাহা হবে। আমি যখন এ সব ভাবছি, তখনও হেঁটে চলেছেন ডানা মাঝি। কাঁধে তাঁর আমাঙ-এর দেহ। পাশে পাশে মেয়ে। আমি তাঁকে থামতে বলিনি। রাস্তার পাশে বসে দু দন্ড জিরিয়ে নিতেও বলিনি। বলিনি, একটু জল খেয়ে নাও। বলিনি, অপেক্ষা করো। ভরসা রাখো। বলিনি, তুমি নও। এবার আমরা.. যারা খবর করছি, আমরাই তোমার আমাঙ-এর দেহ বাকি পথটুকু নিয়ে যাবো। বলিনি। বলতে পারিনি। কী করে বলব? আমি যে তখন তোমায় দেখতেই পাচ্ছিলাম না ডানা মাঝি। আমি খবর দেখছিলাম। দশ কিলোমিটার হাঁটা হয়ে গেছে। বাকি আরও পঞ্চাশ। কখন নড়েচড়ে বসবে প্রশাসন? সেটাই তখন খবর। আমি তো তোমাকে দেখতেই পাচ্ছিলাম না।

।।আমাকে ক্ষমা করবেন ডানা মাঝি।।

আমি মাস খানেক হল অনসাইট থেকে ফিরেছি। এখনও এ বাড়ি ও বাড়ি দেওয়ার জন্য আনা পারফিউম আর সিঙ্গল মল্ট লাগেজে বন্দী। ড্রয়িংরুমের চল্লিশ ইঞ্চি জুড়ে হাঁটছে ডানা মাঝি। পাশে ইনসেটে বিধায়কের ছবি। সঙ্গে আশ্বাস বাণী। আর এক চ্যানেলে ছোট্ট একটা খোপে হাঁটছে ডানা মাঝি আর বাকি খোপগুলোতে অনেক চেনা মুখ। তিন পেগ শেষ হতেই মনে হল, এই জন্য এ দেশের কিস্যু হয় না। এরা অলিম্পিকস থেকে সোনাও আনতে পারে না। দেশের মানুষকে নূন্যতম সুবিধাও দিতে পারে না। খালি রাজনীতি আর গলাবাজি। বিরক্তিটা সরাতেই দরকার পড়ল সিগারেট আর ব্যালকনি। নরম ধোঁয়ায় ভাসতে ভাসতে হারিয়ে গেল ডানা মাঝি আর মনে পড়ল কাল দেবীকার সঙ্গে হবে দেখা। অনেক দিন পর।

।।আমাকে ক্ষমা করবেন ডানা মাঝি।।

রাত গভীর হলে একশ কুড়ি কোটি আঙুলের ছাপওয়ালা ইভিএম কাঁধে নিয়ে হেঁটে যায় ডানা মাঝি। আমাঙ দেই-এর মেয়ে মায়ের গায়ের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে ঘুমিয়ে পড়ে। পাশ ফিরে শুলে কানে আসে ডানা মাঝি আর আমাঙ দেই-এর খুনসুটি-ভালবাসা মেশা দেহাতি সুর। সকালে উঠে আর কিচ্ছু মনে পড়ে না আমার। জানালার বাইরের আকাশ-কাগজের বিজ্ঞাপণ-চ্যানেলের প্রোমো মনে করিয়ে দেয় পুজো আসছে।

।।আমাকে ক্ষমা করবেন ডানা মাঝি।।

RELATED STORIES