এই জলার অন্তর্ভুক্ত প্রায় কুড়িটি মৌজা। কাজলা, চকসদরজা, মকরামপুর, সাহাপুর, চক শ্যামসুন্দরপুর প্রভৃতি এলাকা এর মধ্যে পড়ে। মোট আয়তন প্রায় ৪৫ বর্গকিলোমিটার। পূর্বদিকে পানিয়া-মথুরা-বাল্যগোবিন্দপুরের বাঁধ ভাঙলে একদিকে স্বস্তি মিললেও অন্যদিকে নতুন করে বন্যা নামে।
advertisement
তবে বারচৌকা বরাবর এমন ছিল না। আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক মন্মথ দাস তার পটাশপুরের সেকাল একাল গ্রন্থে বলেছেন, উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এটি ছিল উর্বর নিম্নভূমি। পর্যাপ্ত ধান উৎপন্ন হত। জল অবাধে বেরিয়ে যেত বিভিন্ন খালপথে। বাগদানদী, গঙ্গাঘাটা, ফুলতলা, পদকাটা, চণ্ডীতলা, হাসুলীতলা, ঘাইঘাটা, মনসাতলা, পাটুকতলা ও জংরাকালার খাল দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ত। পূর্বাঞ্চলের নোনা পতিত মাঠের উপর দিয়েও জল নিষ্কাশন হত। কিন্তু পরিস্থিতি বদলায় আনুমানিক ১৮৭০ সালে। মাজনামুঠা ও জলামুঠা জমিদারি খাসমহল হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়।
আয় বাড়াতে নতুন আবাদি জমি রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কেলেঘাই নদীতে বাঁধ দেওয়া হয়। একই সময়ে পুরোনো জলপ্রবাহগুলির মুখ বন্ধ করা হয়। ১৮৬৯ সালে চাঁদমণি পাকা পুল নির্মিত হয়। সেটিও দক্ষিণের প্রতাপদীঘি খালের প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। পরে ১৯০৭ সালে আড়গোয়াল সার্কিট বাঁধ তৈরি হয়। একের পর এক বাঁধ ও প্রতিবন্ধকতায় স্বাভাবিক জলনিকাশ বন্ধ হয়ে যায়।
এর ফল ভয়াবহ হয়। সোনার শস্যক্ষেত্র ধীরে ধীরে বন্যাপ্রবণ জলাভূমিতে পরিণত হয়। বর্ষাকালে জল নামতে চায় না। জমিতে জল দাঁড়িয়ে থাকে মাসের পর মাস। কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়েন। এই সংকট কাটাতে স্বাধীনতার পরে নেওয়া হয় বারচৌকা জলনিকাশী প্রকল্প। আপার ও লোয়ার বারচৌকাকে আলাদা করার পরিকল্পনা হয়। সিংদা থেকে প্রতাপদীঘি পর্যন্ত প্রায় নয় কিলোমিটার সিংদা ডাইভারসান খাল খননের প্রস্তাব আসে। এজন্য অতিরিক্ত ১৫৯ একর জমি চিহ্নিত করা হয়।
আরও পড়ুন: বাঘের জিভে ‘কাঁটা’ থাকে কেন বলুন তো…? গ্যারান্টি, শুনলেই চমকাবে ‘উত্তর’!
উদ্দেশ্য ছিল আপার বারচৌকার জল সিংদা খাল হয়ে প্রতাপদীঘি-পাহাড়পুর খাল পথে বরোজের কাছে রসুলপুর নদীতে ফেলা। অন্যদিকে লোয়ার অংশের জল মথুরা হয়ে আড়গোয়াল ক্যানেল পথে পাঁউশী বা ইটাবেড়িয়া খালে নামানোর কথা ছিল। কিন্তু শুরু থেকেই এই প্রকল্পে প্রবল আপত্তি ওঠে। পূর্ব ও পশ্চিমাংশের মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আংশিক কাজ হলেও তীব্র প্রতিরোধে প্রকল্প থেমে যায়। আজও বর্ষায় বৃদ্ধদের কণ্ঠে শোনা যায় সেই ছড়া— হাতি ঝুলু ঝুলু আইল বান, হাজিয়া গেল জলার ধান। সোনার শস্য ক্ষেত আজও জলাভূমি হয়ে পড়ে আছে।
মদন মাইতি





