শুধু মুড়ি খাওয়াকে কেন্দ্র করেই বাঁকুড়ায় আস্ত মুড়ি মেলা হয়। এই মেলার বয়স প্রায় ২০০ বছর। বাঁকুড়ার প্রাচীন জনপদ কেঞ্জাকুড়ায় দ্বারকেশ্বর নদীর চরে সঞ্জীবনী মাতার মন্দিরে মাঘ মাসের ১ তারিখ থেকে ৪ তারিখ পর্যন্ত চার দিন ধরে এই মেলা চলে।
advertisement
শোনা যায়, ভান্ডারবেড় গ্রামের জমিদার রায়কিশোর চট্টোপাধ্যায় ছিলেন সন্ন্যাসী। তবে জমিদার বাড়ির ছেলে হয়েও তিনি সন্ন্যাস নিয়ে তীর্থক্ষেত্রে চলে যান। পরে জমিজমা সংক্রান্ত বিবাদ হওয়ায় তাঁকে কয়েকদিনের জন্য ফিরিয়ে আনা হয়। তখন তিনি শর্ত দিয়েছিলেন, ফিরে এলেও কারও বাড়িতে থাকবেন না। তাই তাঁর জন্য দ্বারকেশ্বর নদীর তীরে বাড়ি বানিয়ে দেওয়া হয়। সেই বাড়িই এখন মন্দির।
আগে এই মন্দিরে চারদিন ধরে হরিনাম সংকীর্তনের আয়োজন করা হত। দূরদুরান্তের বিভিন্ন গ্রাম থেকে লোকজন এই হরিনাম শুনতে আসতেন। কিন্তু মন্দিরের চারিদিকে তখন ঘন জঙ্গল থাকায় সন্ধ্যেবেলায় তাঁরা আর বাড়ি ফিরতে পারতেন না। তখন তাঁদের একমাত্র ভরসা ছিল নিজেদের সঙ্গে গামছায় বেঁধে আনা মুড়ি। দ্বারকেশ্বর নদী থেকে চুয়াকেটে জল নিয়ে ওই গামছায় মুড়ি মেখে খেয়ে তাঁরা রাতটুকু কাটিয়ে পরের দিন নিজেদের বাড়িতে ফিরে যেতেন। সেই থেকে এই মুড়িমেলা শুরু।
এই মুড়িমেলায় আশেপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে প্রচুর লোকজন আসেন। শুধু গ্রাম নয়, শহর থেকেও লোকজন এসে অংশ নেন। সব মিলিয়ে, দ্বারকেশ্বরের পাড়ে উপচে পড়া ভিড়। বাঁকুড়ার লালমাটির পথ বেয়ে সাদা সাদা ফুলকো মুড়ির সুগন্ধে আকাশ বাতাস মুখরিত। সেই আওয়াজ সরিয়ে কান পাতলেই শোনা যায় মুড়িতে জল ঢালার সোঁ সোঁ শব্দ।
মুড়ি মেলাকে কেন্দ্র করে বাঁকুড়ার মানুষের উন্মাদনা চোখে পড়ার মতো। শুধু স্থানীয় মানুষ নন, গ্রামের যাদের দূরে কোথাও বিয়ে হয়েছে তাঁরাও এই মেলায় ছুটে আসেন। কর্মসূত্রে যারা বাইরে থাকেন, তাঁরাও কেউ কেউ এই সময়টা চলে আসেন। মাঘ মাসের ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে নদীর ধারে সবাই মিলে চলে মুড়ির পিকনিক। আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব মিলে এক জায়গায় জড়ো হয়ে চলে মুড়ি খাওয়া।
মুড়ি মেলায় যাওয়ার কয়েকদিন আগে থাকতেই জোরকদমে প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। কারও ভাগে মুড়ি নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব পড়ে, কেউ আবার পান চপের দায়িত্ব। কেউ পেঁয়াজ, শসা, কাঁচালঙ্কা, টমেটো, মটরশুঁটি নিয়ে যান। ভোর হতে না হতেই দলে দলে লোকজন সেজেগুজে নদীর পাড়ে ভিড় জমাতে শুরু করেন। নদীর পাড়েই অনেক অস্থায়ী দোকান বসে। সেখানে মুড়ি খাবার যাবতীয় সরঞ্জাম- চপ, তেলেভাজা, বেগুনি থেকে শুরু করে চা-টা সবই পাওয়া যায়।
ছুঁয়ো খুঁড়ে জল খাওয়া এই মুড়ি মেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। এই জল একই সঙ্গে সুস্বাদু, সুমিষ্ট। মুড়ি মেলাকে কেন্দ্র করে আরও অন্যান্য জিনিসেরও পসরা বসে। সেখান থেকে অনেকে কেনাকাটা করেন। এছাড়া সঞ্জীবনী মায়ের মন্দিরে চারদিন ধরে খিচুড়ি খাওয়ানো চলে। সব মিলিয়ে, মুড়ি মেলা ঘিরে এলাকায় বিরাজ করে উৎসবের আবহ।
