ছবিতে অমিতাভ বচ্চন অভিনয় করেছিলেন খেজুরের গুড় ব্যবসায়ী ‘মতি’-র চরিত্রে। ছ’ফুট দুই ইঞ্চি লম্বা সেই টল অ্যাংরি ইয়ং ম্যানকে খেজুর গাছে উঠে রস সংগ্রহ করতে, কাঁধে রসের ঠিলের বাক নিয়ে গ্রামের কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটতে- এই দৃশ্য আজও বহু মানুষের মনে গেঁথে রয়েছে। ছবির সেই গ্রামটি ছিল কামদুনি- সারি দিয়ে থাকা খেজুর ও তাল গাছ, চারপাশে জলাশয়ে ঘেরা এক সবুজ গ্রাম। এখন কেমন আছে সেই কামদুনি গ্রাম! সেই শ্যুটিং লোকেশনের এখন ছবি ঠিক কেমন!
advertisement
পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গেও কথা বলে জানা গেল, প্রায় ছয় দশক আগের সেই সময়ের অনেক প্রত্যক্ষ সাক্ষী আজ আর বেঁচে নেই। তবুও তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম, যাঁরা তখন ছোট ছিলেন, আজও স্মৃতিচারণে ভোলেননি অমিতাভ বচ্চনের গ্রামে কাটানোর দিনগুলোর কথা। গ্রামের বাসিন্দারা জানান, বর্তমান প্রজন্ম কামদুনিকে কোনও এক ঘটনার সূত্রে চিনলেও, কামদুনিবাসীর কাছে এই গ্রাম আজও গর্বের- কারণ দুই মহানায়ক অমিতাভ বচ্চন ও উত্তম কুমার এই গ্রামের মাটিতে পা রেখেছিলেন। জনপ্রিয় সিনেমার নানা দৃশ্যের শুটিং হয়েছিল কামদুনিতে। ছবিতে মূল চরিত্রগুলির পাশাপাশি গ্রামের বহু মানুষও পর্দায় ধরা পড়েছিলেন। আজ তাঁদের অনেকেই আর নেই, কিন্তু রিলের পর্দায় তাঁরা আজও জীবন্ত।
গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা সুকমল মণ্ডল স্মৃতিচারণায় জানান, ছোটবেলায় বড়দের সঙ্গে শ্যুটিং দেখতে গিয়েছিলেন তিনিও। গ্রামে সারি সারি গাড়ি, বড় বড় লাইট, আর সামনে থেকে অমিতাভ বচ্চনকে দেখা- আজও চোখে ভাসছে তার। কামদুনিবাসী হিসাবে যেন তাই গর্ব হয়। কামদুনির প্রতিবাদী মুখ মৌসুমি কয়াল জানান, বিয়ের পর এই গ্রামে এসে স্বামীর মুখে শ্যুটিংয়ের নানা গল্প শুনেছেন তিনিও। আজও মাঝে মাঝে তিনি সেই শ্যুটিং স্পটে যান। তাঁর কথায়, একসময় কামদুনি বড়বিল এলাকা ছিল সবুজে ঘেরা। চারদিকে জলাশয়, নানা পাখি-প্রাণীর বাস। যে বাড়িতে অমিতাভ বচ্চন-সহ ‘সওদাগর’ ছবির টিম থাকত, সেই বাড়িটি আজও রয়েছে। একসময় ভেঙে দেওয়ার পরিকল্পনা হলেও গ্রামের মানুষ তা হতে দেয়নি। সময়ের সঙ্গে বদলেছে গ্রামও। খেজুর গাছের সংখ্যা কমেছে। আগে যেখানে মাটির কলসিতে রস সংগ্রহ করা হত, এখন সেখানে ঝোলে তেলের টিন। তবুও শীত পড়লেই বহু মানুষ এখানে পিকনিক করতে আসেন।
শুধু অমিতাভ নন, পরবর্তী সময়ে উত্তম কুমারও কামদুনিতে এসেছিলেন তাঁর ‘গৃহদাহ’ ছবির শ্যুটিংয়ে। সেই দৃশ্যও বহু মানুষ আজও চাক্ষুষ দেখার কথা স্মরণ করেন। বর্তমানে মেদিনীপুরের বাসিন্দা পুষ্পেন্দু মণ্ডল গত দু’বছর ধরে কামদুনি এলাকায় খেজুর গুড়ের ব্যবসা করছেন। তিনিও খেজুর গাছে উঠে রস সংগ্রহ করেন- ঠিক যেমনটা করেছিলেন অমিতাভ বচ্চন ছবির দৃশ্যে। পুষ্পেন্দুর কথায়, ’সওদাগর’ ছবি আমি একাধিকবার দেখেছি। এমন ঐতিহাসিক জায়গায় এসে এই ব্যবসা করতে পেরে ভাল লাগে। একাধিক গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে উঠে আসে একই কথা- অমিতাভ বচ্চন প্রায় এক সপ্তাহের বেশি সময় শ্যুটিংয়ের জন্য কাটিয়েছিলেন কামদুনিতে। হতে পারে কামদুনির পরিচয় আজ কোনও নৃশংস ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে। কিন্তু এই গ্রামের আরেক পরিচয়ও আছে- সিনেমার ইতিহাসে জায়গা করে নেওয়া এক গ্রাম হিসাবে। শীতের সময় কামদুনিতে এলে আজও মিলবে টাটকা খেজুরের গুড়। ‘সওদাগর’-এর সেই গুড়ের স্বাদ পেতে কলকাতার খুব কাছেই একবার ঘুরে আসাই যায় কামদুনি গ্রামে।





