হাঁড়িকুড়ি, হাতা-খুন্তি নিয়ে পরিবার, পরিজন সহ গ্রামের উত্তর দিকের খোলা মাঠে হাজির হন বাসিন্দারা। ছোট ছোট তাঁবু খাটিয়ে জমিয়ে রান্না চলে। কোথাও খিচুড়ি-বেগুন ভাজা, কোথাও নিরামিষ ভাত-ডাল। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা বিষয়টিকে বনভোজনের আনন্দে উপভোগ করলেও গ্রামের প্রবীণদের কাছে এটি এক গভীর বিশ্বাস ও ইতিহাসের স্মারক।
advertisement
স্থানীয়দের কথায়, বহু বছর আগে কোশিগ্রামে ভয়াবহ কলেরার প্রকোপ দেখা দিয়েছিল। একের পর এক মানুষের মৃত্যুতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে গ্রামে। সেই সময় নদিয়া জেলার বল্লভপাড়া থেকে এক ফকির বাবা আসেন। তাঁর কাছে আশ্রয় নেন গ্রামবাসীরা। তখন তিনি নিদান দেন, পৌষ সংক্রান্তির আগের দিন বাড়িতে রান্না নয়, গ্রামের উত্তরদিকের মাঠে সবাই একসঙ্গে রান্না করে খাবে। সেই বিশ্বাসের উপর ভর করেই আজও এই রীতি পালন করে চলেছেন কোশিগ্রামের মানুষ।
গ্রামবাসী তপন মণ্ডল বলেন, “বহু বছর ধরে এই রীতি পালিত হয়ে আসছে। এভাবেই প্রতিবছর আমরা এইদিনটা কাটাই।” তবে খাওয়া শুরু করার আগে একটি কলাপাতায় খাবার নিয়ে মাঠের এক কোণে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে উৎসর্গ করা হয়। তারপর ফকির বাবার পুজো দিয়ে শুরু হয় উৎসব। সারি সারি পাত পেড়ে একসঙ্গে বসে খাওয়া, মহাআনন্দে ভরে ওঠে গোটা মাঠ। কোশিগ্রাম বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় জমজমাট মেলাও বসে। বাউল গানের তালে তালে মাতেন গ্রামবাসীরা। পাশের যতীনপুর গ্রামের মানুষজনও এই উৎসবে শামিল হন। ধীরে ধীরে এই প্রথার জৌলুস ও পরিসর বাড়ছে বলেই মত স্থানীয়দের।
আপনার শহরের হাসপাতাল এবং চিকিৎসকদের নামের তালিকা পেতে এখানে Click করুন
গ্রামবাসী স্বপ্না পালের কথায়, “বিয়ের পর থেকেই দেখে আসছি। এদিন অনেক কিছু রান্না হয়। আত্মীয় স্বজন আসে, আবার পাশের গ্রামের পরিচিতদেরও ডাকা হয়। এইদিন আমাদের বাড়িতে রান্না করতে নেই।” যদিও যুক্তিবাদীদের একাংশ এই রীতিকে কুসংস্কার বলেই মনে করেন। তাঁদের মতে, খোলা মাঠে রান্না করলে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে, এটাকে বড়জোর পিকনিক বলা যেতে পারে। তবে কোশিগ্রামের বাসিন্দারা স্পষ্ট জানিয়েছেন এটা বিশ্বাস, ধর্মীয় আবেগ ও গ্রাম সংস্কৃতির অংশ। এর সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনা চলে না। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলালেও, কোশিগ্রামে আজও অটুট সেই বিশ্বাস- ঘর ছেড়ে মাঠে হেঁশেল আর একসঙ্গে খাওয়াতেই রয়েছে মুক্তির পথ!





