সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা যখন ব্যবহারকারীদের তথ্য বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ভাগাভাগি করার এই নীতিকে “শোষণমূলক” বলে আক্রমণ করেন, তখন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আপনি যদি আমাদের সংবিধান মানতে না পারেন, তবে ভারত ছেড়ে দিন। আমরা কোনও নাগরিকের গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হতে দেব না।” প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ মার্কিন প্রযুক্তি সংস্থাটিকে আরও জানায়, “আপনারা প্রাইভেসি নিয়ে খেলতে পারেন না… আমরা আমাদের ডেটার একটি অঙ্কও শেয়ার করতে দেব না।”
advertisement
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, সলিসিটর জেনারেল মেহতা ও প্রতিযোগিতা কমিশন অব ইন্ডিয়া (CCI)-র আইনজীবীরা বলেন, এনক্রিপশন থাকা সত্ত্বেও ব্যবহারকারীদের তথ্য বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ডিজিটাল পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন (DPDP) আইন প্রয়োগ করে মেটাডেটা সুরক্ষা ও ব্যবহারকারীর সম্মতি নিশ্চিত করা জরুরি মতামত প্রকাশ করেন তাঁরা৷
প্রযুক্তি সংস্থাগুলি ‘ইনফর্মড কনসেন্ট’-এর দাবি করলেও সুপ্রিম কোর্ট জানায়, দেশের লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ—যার মধ্যে রাস্তার হকার ও গ্রামীণ নাগরিকরাও রয়েছেন—এত জটিল প্রাইভেসি নীতি বোঝার অবস্থায় নেই। “আপনাদের নীতির ভাষা এমন যে একজন সাধারণ ব্যবহারকারী তা বুঝতে পারে না। আপনি কী ধরনের বিকল্প দিচ্ছেন? ভাবুন, রাস্তায় বসে ফল বিক্রি করা এক দরিদ্র মহিলা—তিনি কীভাবে অপ্ট-ইন বা অপ্ট-আউট সংক্রান্ত আপনার শর্তাবলি বুঝবেন?” বেঞ্চ আরও যোগ করে, এই নীতি “খুব চতুরভাবে তৈরি”, জানায় সুপ্রিম কোর্টের অধীনস্ত বেঞ্চ৷
আরও পড়ুন: ৫০ থেকে একধাক্কায় ট্যারিফ কমে ১৮%! নয়া চুক্তিতে চিন, পাকিস্তান, বাংলাদেশের অনেক এগিয়ে গেল ভারত
প্রধান বিচারপতি বলেন, “এটা সিংহ আর মেষশাবকের মধ্যে বেছে নেওয়ার মতো। হয় আপনি লিখিত অঙ্গীকার দিন যে কোনও ডেটা শেয়ার করা হবে না, নতুবা আমরা আপনার মামলা খারিজ করে দেব।” হোয়াটসঅ্যাপের আইনজীবী যুক্তি দেন, তাদের প্রাইভেসি নীতি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মেটার পক্ষ থেকেও বলা হয়, ডেটা শেয়ারিং শুধুমাত্র মূল সংস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
আদালত আরও জোর দিয়ে বলে, ব্যবহারকারীর আচরণগত ও বাণিজ্যিক শোষণ—যার মধ্যে চ্যাটের ধরণ অনুযায়ী লক্ষ্যভিত্তিক বিজ্ঞাপন দেখানোও রয়েছে—ব্যবহারকারীদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে। বেঞ্চ এমন উদাহরণও উল্লেখ করে, যেখানে রোগীরা চিকিৎসকের সঙ্গে ব্যক্তিগত চ্যাটের পরপরই ওষুধ সংক্রান্ত লক্ষ্যভিত্তিক বিজ্ঞাপন পেয়েছেন, যা ডেটা মনিটাইজেশনের মাত্রা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
এই শুনানি হয় একাধিক আপিলের প্রেক্ষিতে—যার মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপ, মেটা ও CCI-এর দায়ের করা আবেদনও রয়েছে—যেখানে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ন্যাশনাল কোম্পানি ল’ অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনাল (NCLAT)-এর ডেটা শেয়ারিং ও বাজারে আধিপত্য সংক্রান্ত রায়কে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।
মেটা ও হোয়াটসঅ্যাপ সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানায়, যাতে NCLAT-এর সেই রায় বাতিল করা হয়, যেখানে ২০২১ সালের প্রাইভেসি নীতির মাধ্যমে আধিপত্যের অপব্যবহারের অভিযোগে CCI আরোপিত ₹২১৩.১৪ কোটি টাকার জরিমানা বহাল রাখা হয়েছিল। মামলার কেন্দ্রে রয়েছে—ফেসবুক/মেটা সংস্থাগুলির সঙ্গে বাধ্যতামূলক ডেটা শেয়ারিং, যাকে CCI ব্যবহারকারীদের জন্য “অন্যায্য” ও “নাও-নয়তো-ছাড়ো” শর্ত বলে অভিহিত করেছে।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালে হোয়াটসঅ্যাপ তাদের প্রাইভেসি নীতি আপডেট করে, যাতে পরিষেবা চালু রাখতে ব্যবহারকারীদের মেটা সংস্থাগুলির সঙ্গে ডেটা শেয়ার করতে বাধ্য করা হয়। প্রতিযোগিতা কমিশন অব ইন্ডিয়া (CCI) ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে মেসেজিং বাজারে আধিপত্যের অপব্যবহারের অভিযোগে হোয়াটসঅ্যাপ/মেটাকে ₹২১৩.১৪ কোটি টাকা জরিমানা করে। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে NCLAT সেই জরিমানা বহাল রাখে এবং ব্যবহারকারীদের পছন্দের অধিকার জোরদার করে, হোয়াটসঅ্যাপকে ডেটা শেয়ারিং থেকে অপ্ট-আউটের সুযোগ দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
