২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে তামিলনাড়ুতে তীব্র দ্বিমুখী লড়াইয়ের ইঙ্গিত মিলছে। শাসক ডিএমকে-নেতৃত্বাধীন জোট এবং এআইএডিএমকে-নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়েছে বলে জানাচ্ছে ভোটভাইবের সর্বশেষ ‘ভোট ট্র্যাকার’ অপিনিয়ন পোল, যা একচেটিয়াভাবে প্রকাশ করেছে সিএনএন-নিউজ১৮। ভোটের আগে করা এই সমীক্ষা অনুযায়ী, কংগ্রেস, সিপিআই এবং সিপিআই(এম)-কে সঙ্গে নিয়ে গঠিত দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝাগম (ডিএমকে) নেতৃত্বাধীন জোট ২৩৪ আসনের তামিলনাড়ু বিধানসভায় ১১৩ থেকে ১২৩টি আসন পেতে পারে।
advertisement
নেটওয়ার্ক 18-এর ওপিনিয়ন পোল অনুযায়ী তামিলনাড়ুর সাম্প্রতিক মতামত সমীক্ষায় উঠে এসেছে একেবারে বিভক্ত জনমতের ছবি। গত পাঁচ বছরে ডিএমকে সরকারের কাজকর্ম নিয়ে মানুষের প্রতিক্রিয়া মিশ্র। প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ সরকারকে ‘ভাল’ বা ‘খুব ভাল’ বললেও, প্রায় ৩৯ শতাংশ ‘খারাপ’ বা ‘খুব খারাপ’ বলে মত দিয়েছেন। নারী ভোটাররা তুলনামূলকভাবে বেশি সন্তুষ্ট হলেও পুরুষদের মধ্যে সমালোচনার সুর বেশি। বয়সের নিরিখেও পার্থক্য স্পষ্ট—৫৫ বছরের বেশি বয়সীরা সবচেয়ে বেশি সন্তুষ্ট, আর ১৮ থেকে ২৪ বছরের তরুণ ভোটাররা তুলনায় বেশি অসন্তুষ্ট। তফসিলি জাতি ও দলিত ভোটারদের মধ্যে সরকারের প্রতি সমর্থন বেশি, বিপরীতে উচ্চবর্ণ হিন্দুদের মধ্যে অসন্তোষ বেশি লক্ষ্য করা গেছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যেও গড়ের তুলনায় বেশি সন্তুষ্টি দেখা গিয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী পদে পছন্দের প্রশ্নে এম কে স্টালিন ৩৯.৯ শতাংশ সমর্থন নিয়ে সামান্য এগিয়ে থাকলেও, এডাপ্পাড়ি কে পালানিস্বামী ৩৭.৫ শতাংশ সমর্থন নিয়ে খুব কাছেই রয়েছেন। ফলে শীর্ষস্তরের লড়াই অত্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি। পুরুষ ভোটারদের একাংশ পালানিস্বামীর দিকে ঝুঁকলেও, নারী ভোটারদের বড় অংশ স্টালিনকে সমর্থন করছেন। অন্যদিকে অভিনেতা বিজয় তরুণদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়েছেন, বিশেষ করে ১৮–২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে। বয়সভিত্তিক প্রবণতায় দেখা যাচ্ছে, বয়স্ক ভোটাররা স্টালিনের দিকে বেশি ঝুঁকছেন, আর মধ্যবয়সীরা পালানিস্বামীর দিকে। তফসিলি জাতি ও দলিত ভোটাররা স্টালিনের পক্ষে, অন্যদিকে ওবিসি ও উচ্চবর্ণ হিন্দুরা বেশি ঝুঁকছেন পালানিস্বামীর দিকে। মুসলিম ও খ্রিস্টান ভোটারদের মধ্যেও স্টালিনের প্রতি সমর্থন বেশি।
রাজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে মদ ও মাদক সমস্যা, যা ২০.১ শতাংশ মানুষের কাছে প্রধান উদ্বেগ। এর পরেই রয়েছে নারী নিরাপত্তা (১৭.৮%), আইন-শৃঙ্খলা (১৭.৩%) এবং বেকারত্ব (১৫.৫%)। তরুণ ও মধ্যবয়সীদের কাছে মাদক সমস্যা সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। দুর্নীতি উচ্চবর্ণ হিন্দুদের মধ্যে বড় ইস্যু হলেও তফসিলি জাতি ও দলিতদের মধ্যে এর প্রভাব তুলনামূলক কম। বেকারত্ব তরুণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে, আর নারী নিরাপত্তা প্রায় সব গোষ্ঠীর মধ্যেই সমান গুরুত্ব পেয়েছে। ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার প্রশ্নটি বয়স্কদের মধ্যে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে, অন্যদিকে মূল্যবৃদ্ধি মুসলিম ভোটারদের কাছে বড় উদ্বেগ। ফেডারেল কাঠামোর উপর হুমকি মোটের উপর খুব বড় ইস্যু হিসেবে সামনে আসেনি।
বর্তমান বিধায়কদের প্রতি আস্থার ক্ষেত্রেও বড় ফাটল দেখা যাচ্ছে। প্রায় ২৮.৭ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, তাঁরা বর্তমান বিধায়ককে ফের ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। আরও ২৩ শতাংশ ভোটার বলেছেন, প্রার্থী বদল হলে তবেই তাঁরা একই দলকে ভোট দিতে পারেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৫১.৭ শতাংশ ক্ষেত্রে এক ধরনের অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি বা শাসকবিরোধী মনোভাব স্পষ্ট। নারী ভোটাররা তুলনায় বেশি বিশ্বস্ত হলেও, ওবিসি ও উচ্চবর্ণ ভোটারদের মধ্যে অস্থিরতা বেশি। তফসিলি জাতি ও দলিতদের মধ্যে বর্তমান বিধায়কদের প্রতি আস্থা সবচেয়ে বেশি। মুসলিম ও খ্রিস্টান ভোটারদের মধ্যে ‘নিশ্চিত নই’ ধরনের উত্তরও তুলনামূলক বেশি, যা অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দেয়।
নির্বাচনের চরিত্র নিয়েও স্পষ্ট বার্তা মিলেছে। প্রায় ৪১.২ শতাংশ মানুষ মনে করছেন, লড়াই সম্পূর্ণভাবে দ্বিমুখী—ডিএমকে বনাম এআইএডিএমকে। কিছু মানুষ ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনার কথা বললেও, মাত্র ১২ শতাংশ এটিকে সম্পূর্ণ ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখছেন। অর্থাৎ, বিজয়ের দল এখনও পুরোপুরি শক্তিশালী তৃতীয় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়নি।
সরকারি পারফরম্যান্সের তুলনায়ও বিভাজন স্পষ্ট। ২০১৬ থেকে ২০২১ পর্যন্ত এআইএডিএমকে সরকারের সময়কে ৪৪.৬ শতাংশ মানুষ ভাল বলে মনে করছেন, যেখানে স্টালিনের বর্তমান সরকারের পক্ষে সমর্থন ৪০.৬ শতাংশ। তফসিলি জাতি ও দলিত ভোটাররা বর্তমান সরকারকে বেশি সমর্থন করলেও, ওবিসি, উচ্চবর্ণ ও আদিবাসী ভোটারদের মধ্যে আগের সরকারের প্রতি ঝোঁক বেশি। মুসলিম ভোটারদের বড় অংশ স্টালিনের দিকে থাকলেও, খ্রিস্টান ভোটারদের মধ্যে বিভাজন দেখা যাচ্ছে।
ভোটের সম্ভাব্য শতাংশের হিসাবে ডিএমকে জোট ৪০.১ শতাংশ এবং এআইএডিএমকে জোট ৩৮.১ শতাংশ—অর্থাৎ প্রায় সমান লড়াই। বিজয়ের দল ১৪.৮ শতাংশ ভোট পেতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। পুরুষ ভোটাররা এআইএডিএমকের দিকে ঝুঁকলেও, নারী ভোটারদের বড় অংশ ডিএমকের দিকে। তরুণদের মধ্যে বিজয়ের সমর্থন বেশি হলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা কমে। তফসিলি জাতি ও দলিতরা ডিএমকের সবচেয়ে বড় ভিত্তি, অন্যদিকে ওবিসি ও উচ্চবর্ণ ভোটারদের বড় অংশ এআইএডিএমকের দিকে। মুসলিম ও খ্রিস্টান ভোটারদের মধ্যেও ডিএমকের প্রতি ঝোঁক স্পষ্ট।
সব মিলিয়ে এই সমীক্ষা বলছে, তামিলনাড়ুর নির্বাচন কার্যত সমানে সমান লড়াইয়ে দাঁড়িয়ে। লিঙ্গ, বয়স, জাতিগত সমীকরণ এবং তরুণ ভোটারদের ভূমিকা—সব মিলিয়ে ফল নির্ধারণে একাধিক ফ্যাক্টর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে চলেছে।
