নিহত ৪৯ বছর বয়সী মানবেন্দ্র সিং, যিনি ‘বর্ধমান প্যাথোলজি ল্যাব’-এর মালিক ছিলেন। অভিযোগ, তাঁর ২১ বছরের ছেলে অক্ষত সিং বাড়ির ভিতরেই তাঁকে গুলি করে খুন করে দেহ টুকরো টুকরো করে ফেলে। পরে তাঁর ধড় একটি নীল ড্রামের ভিতর থেকে উদ্ধার হয়।
সূত্রের খবর অনুযায়ী, নিহত মানবেন্দ্র সিং গত ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে নিখোঁজ ছিলেন। চাঞ্চল্যকরভাবে, অভিযুক্ত পুত্র অক্ষত সিং-ই থানায় গিয়ে নিখোঁজ ডায়েরি করেন। তদন্তকারীদের মতে, সন্দেহ এড়াতেই তিনি এই পদক্ষেপ নেন।
advertisement
অক্ষত পুলিশকে জানান, ২০ ফেব্রুয়ারি সকাল ৬টা নাগাদ তাঁর বাবা তাঁকে ঘুম থেকে ডেকে বলেন, তিনি দিল্লি যাচ্ছেন এবং ২১ ফেব্রুয়ারি দুপুরের মধ্যে ফিরবেন। এরপর থেকেই তাঁর বাবার তিনটি মোবাইল ফোন বন্ধ ছিল এবং তিনি আর বাড়ি ফেরেননি।
ঘটনাটি ঘটে আশিয়ানা থানার অন্তর্গত সেক্টর এল-এর ৯১ নম্বর বাড়িতে। তদন্তে পুলিশ মনবেন্দ্রর শেষ মোবাইল লোকেশন খুঁজে পায় কাকোরিতে, যেখানে তাঁর প্যাথোলজি ল্যাব অবস্থিত। সেখানে তল্লাশি চালিয়েও প্রথমে বিশেষ সূত্র মেলেনি। তবে অক্ষতের বয়ানে অসঙ্গতি ধরা পড়ে।
জিজ্ঞাসাবাদের সময় অক্ষত একাধিকবার নিজের বয়ান বদলান বলেই পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। এক পর্যায়ে তিনি দাবি করেন, তাঁর বাবা আত্মহত্যা করেছেন। পরে তিনি খুনের কথা স্বীকার করেন।
আরও পড়ুন: ‘মমতার অনুরোধকেই’ মান্যতা দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট! SIR শুনানির পরেই বিবৃতিতে জানাল তৃণমূল
ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশ (সেন্ট্রাল) বিক্রান্ত বীর জানান, অক্ষত স্বীকার করেছে যে ২০ ফেব্রুয়ারি ভোর সাড়ে ৪টা নাগাদ তাঁর ও বাবার মধ্যে তীব্র বাগ্বিতণ্ডা হয়। রাগের মাথায় সে লাইসেন্সপ্রাপ্ত রাইফেল তুলে বাবাকে গুলি করে। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। পুলিশের দাবি, এরপর অক্ষত তৃতীয় তলা থেকে দেহ টেনে নিচে নামায়। একটি ফাঁকা ঘরে দেহ কেটে টুকরো করা হয়। প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে দেহাংশগুলি আলাদা করা হয়।
কিছু দেহাংশ গাড়িতে করে সদরৌনা এলাকায় ফেলে দেওয়া হয়। ধড়টি একটি নীল ড্রামে ভরে বাড়ির ভিতরেই রাখা হয়। পুলিশের অনুমান, বাকি অংশও সরানোর পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু তার আগেই তাকে গ্রেফতার করা হয়।
সোমবার সন্ধ্যায় পুলিশ অক্ষতকে নিয়ে আশিয়ানা বাড়িতে যায় এবং নীল ড্রাম থেকে মনবেন্দ্র সিংয়ের ধড় উদ্ধার করে। কাটা মাথাটি এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি, অভিযোগ, সেটি আলাদা করে ফেলে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ জানায়, অক্ষত তাঁর বোন কৃতি (এপিএস স্কুলের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী)-র সামনেই বাবাকে গুলি করে। পরে বোনকে হুমকি দেওয়া হয়, ঘটনা ফাঁস করলে তাকেও খুন করা হবে। ভয়েই সে এতদিন চুপ ছিল বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মাথা ফেলে দেওয়ার পর অক্ষত বাড়ি ফিরে গাড়ি পরিষ্কার করে রক্তের দাগ মুছে ফেলার চেষ্টা করে। পিসি যখন গাড়ি ধোয়ার কারণ জানতে চান, সে বলে গাড়ি নোংরা হয়েছিল। পরে গাড়ির ভিতর রক্তের চিহ্ন পাওয়া যায়। ফরেন্সিক দল ঘটনাস্থলে তদন্ত চালাচ্ছে। ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই বাড়ির সামনে ভিড় জমে যায়।
জানা গিয়েছে, মানবেন্দ্র সিং জালাউন জেলার বাসিন্দা ছিলেন। প্যাথোলজি ল্যাব ছাড়াও তিনি মদের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে। তাঁর স্ত্রী নয় বছর আগে মারা যান। পরিবারে ছেলে অক্ষত ও মেয়ে কৃতি রয়েছেন। তাঁর বাবা সুরেন্দ্র পাল সিং, অবসরপ্রাপ্ত উত্তরপ্রদেশ পুলিশ কর্মী, লাঠিতে ভর দিয়ে ঘটনাস্থলে আসেন। মনবেন্দ্রর ছোট ভাই এস এস রাজাওয়াত উত্তরপ্রদেশ সচিবালয়ে কর্মরত।
স্বীকারোক্তি মিললেও খুনের সঠিক কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। পুলিশের বক্তব্য, কী কারণে সেই মারাত্মক বচসা শুরু হয়েছিল তা জানার জন্য আরও জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। নিখোঁজ ডায়েরি থেকেই তদন্ত শুরু হয় এবং পরে জানা যায়, ছেলে অক্ষতই বাবাকে গুলি করে হত্যা করেছে। আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এই ঘটনা ফের মনে করিয়ে দিল ২০২৪ সালের মিরাটের ‘ব্লু ড্রাম’ হত্যাকাণ্ডের কথা, যেখানে এক গৃহবধূ ও তাঁর প্রেমিক স্বামীকে খুন করে দেহ টুকরো করে সিমেন্টভর্তি নীল ড্রামে ভরে রেখেছিল বলে অভিযোগ ওঠে। সেই ঘটনার মতোই লখনউয়ের এই নৃশংসতা আবারও জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
