এই পরিস্থিতির সঙ্গে অনেকেই ১৯৯০ সালে উপসাগরীয় অঞ্চলে তৈরি হওয়া পরিস্থিতির মিল খুঁজে পাচ্ছেন৷ সেবারেও যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে লক্ষাধিক ভারতীয়কে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে এনেছিল কেন্দ্রীয় সরকার৷ যা এখনও পর্যন্ত বিদেশের মাটি থেকে ভারতীয়দের সবথেকে বড় উদ্ধার অভিযান হিসেবেই নথিভুক্ত হয়ে রয়েছে৷
সঙ্কটে প্রায় ১ কোটি ভারতীয়
এই মুহূর্তে উপসাগরীয় দেশগুলিতে প্রায় ৯৫ লক্ষ থেকে ১ কোটি ভারতীয় কর্মরত রয়েছেন৷ তার মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতেই রয়েছেন প্রায় ৩৫ লক্ষ ভারতীয়৷ এ ছাড়া সৌদি আরব এবং কাতারেও বিপুল সংখ্যক ভারতীয় কাজ করেন৷ ইরানের সঙ্গে ইজরায়েল ও আমেরিকার যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় অন্তত ৩৭টি ভারতীয় জাহাজ ওই এলাকায় মাঝসমুদ্রে আটকে রয়েছে৷ ওই জাহাজগুলিতেও সবমিলিয়ে প্রায় ১০০০ ভারতীয় রয়েছেন৷ ইতিমধ্যেই ওমান উপকূলের কাছে একটি তেল বহনকারী জাহাজে ইরানের হামলায় এক ভারতীয়ের মৃত্যুর খবর মিলেছে৷
advertisement
আকাশপথও বন্ধ থাকায় দুবাইয়ে কয়েকশো ভারতীয় যাত্রী মাঝপথে আটকে রয়েছেন৷ মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মুম্বই, দিল্লি, বেঙ্গালুরু এবং চেন্নাইয়ের মতো দেশের প্রধান বিমানবন্দরগুলি থেকে দিনে প্রায় ২৫০ বিমান বাতিল করতে হয়েছে৷
ইতিমধ্যেই উপসাগরীয় দেশগুলিতে আটকে থাকা ভারতীয়দের কীভাবে উদ্ধার করা যায়, তার রূপরেখা চূড়ান্ত করতে কেন্দ্রীয় সরকারের নিরাপত্তা বিষয়ক ক্যাবিনেট কমিটি বৈঠক করেছে৷ যদিও এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত এই সংক্রান্ত কোনও নির্দেশিকা জারি করা হয়নি৷
ভারতের জ্বালানি উদ্বেগ
ভারতের মোট জ্বালানির যা চাহিদা, তার ৮৮ থেকে ৯০ শতাংশ আমদানি করতে হয়৷ এই অপরিশোধিত তেলের বেশিরভাগটাই হরমুজ প্রণালী হয়ে জাহাজে করে ভারতে পৌঁছয়৷ হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকলে ভারতে জ্বালানির জোগানেও প্রভাব পড়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে৷
ভারতে এলএনজি-র বেশিরভাগটাই জোগান দেয় কাতার৷ কিন্তু ইরানের হামলার পর কাতার এলএনজি উৎপাদন বন্ধ রেখেছে৷ ফলে ভারতীয় যে সংস্থাগুলি এই গ্যাস আমদানি করে, তারাও দেশের বাজারে জোগান কমাতে বাধ্য হচ্ছে৷
ইরান-ইজরায়েল-আমেরিকার যুদ্ধের কারণে মার্চের শুরুতেই অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল পিছু ৬৫ ডলার থেকে বেড়ে ৭২ থেকে ৭৩ ডলারে পৌঁছেছে৷ উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়তে থাকলে এই দাম আরও বৃদ্ধি পাবে বলেই সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা৷
আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই মুহূর্তে ভারতের হাতে অপরিশোধিত এবং উৎপাদিত পণ্য হিসেবে প্রায় ৭ থেকে ৮ সপ্তাহের চাহিদা মেটানোর মতো জ্বালানি মজুত রয়েছে৷
নয়াদিল্লির কূটনৈতিক পদক্ষেপ
পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি উপসাগরীয় অঞ্চলের একাধিক দেশের প্রধানদের সঙ্গে ফোনে কথা বলে আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসার জন্য সংওয়াল করেছেন৷ পাশাপাশি ভারতীয়দের নিরাপত্তার বিষয়টি সুনিশ্চিত করারও আর্জি জানিয়েছেন তিনি৷ অন্যদিকে উপসাগরীয় এলাকা দিয়ে তেলের জোগান বন্ধ হওয়ায় ভারতে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া৷
এই সঙ্কটে কূটনৈতিক ভাবে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে৷ একদিকে বন্ধু রাষ্ট্রগুলির উপরে হামলার নিন্দা করেছে নয়াদিল্লি, আবার কৌশলগত স্বার্থেই আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমনের জন্য ইরান এবং ইজরায়েলকে বার্তা দিয়েছে মোদি সরকার৷
১৯৯০-এর উপসাগরীয় যুদ্ধ
১৯৯০-৯১ সালে সাদ্দাম হুসেনের শাসনে থাকা ইরাক কুয়েত অভ্যুত্থানের চেষ্টা করে৷ যা থেকে শুরু হয় উপসাগরীয় যুদ্ধ৷ ১৯৯০ সালের ২ মার্চ কুয়েতে হামলা চালায় ইরাক৷ ইরাকের অভিযোগ ছিল, রুমাইলা তৈল ভাণ্ডার থেকে ওপেক-এর বেঁধে দেওয়ার পরিমাণের থেকেও বেশি মাত্রায় তেল উত্তোলন করছে কুয়েত৷ যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমছে এবং ইরাকের অর্থনীতির ক্ষতি হচ্ছে৷ পাশাপাশি, ৮ বছর ধরে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পর ইরাকের উপর বিপুল ঋণের বোঝা চেপেছিল৷ কুয়েতের কাছে তাই ঋণ মকুবের আবেদনও জানিয়েছিলেন সাদ্দাম হুসেন৷ যা খারিজ করে দেয় কুয়েত৷ সাদ্দাম হুসেনের দাবি ছিল, একসময় কুয়েত ইরাকেরই বাসরা প্রদেশের অংশ ছিল৷ ফলে কুয়েত দখল করে মূলত জ্বালানি সরবরাহের উপরে নিজেদের আধিপত্য আরও বৃদ্ধি করতে চেয়েছিলেন সাদ্দাম৷
এই উপসাগরীয় যুদ্ধের কারণেই সেই সময় ওই অঞ্চলে আটকে থাকা ভারতীয়দের উদ্ধারে বাধ্য হয় কেন্দ্রীয় সরকার৷ ইরাক যখন কুয়েতে হামলা চালায়, তখন সেখানে প্রায় ১ লক্ষ ৭০ হাজার ভারতীয় আটকে ছিলেন৷ তাদের দেশে ফেরাতে বড়সড় উদ্ধার অভিযানের পরিকল্পনা করে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক৷
কুয়েতে থাকা ভারতীয়রা বাসে এবং গাড়িতে করে জর্ডনের সীমান্তে পৌঁছন ৷ প্রায় ৫৯ দিন ধরে জর্ডনের আম্মান থেকে ৪৮৮টি উড়ান চালিয়ে প্রায় ১ লক্ষ ১২ হাজার ভারতীয়কে দেশে ফিরিয়ে আনে এয়ার ইন্ডিয়া৷ আকাশপথে এটিই ছিল ভারতের সর্ববৃহৎ উদ্ধার অভিযান৷
একসঙ্গে এই বিপুল সংখ্যক ভারতীয় দেশে ফিরে আসায় তার ব্যাপক প্রভাব পড়ে দেশের অর্থনীতিতে৷ উপসাগরীয় দেশগুলিতে কর্মরতদের মধ্যে সাধারণ শ্রমিকও যেমন ছিলেন, তেমনই মোটা টাকা উপার্জনকারী বহু ভারতীয় ছিলেন৷ নিয়মিত তাঁরা দেশে টাকা পাঠাতেন৷ আচমকাই উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধে তাঁরা রোজগারহীন হয়ে পড়েন৷ চাকরি, ব্যবসা থেকে সঞ্চয়, রাতারাতি সবই হারান তাঁরা৷ উপসাগরীয় এলাকা থেকে দেশে আসা এই টাকার জোগান বন্ধ হওয়ায় দেশের অর্থনীতির উপরে চাপ বাড়ে৷ দেশের বাজারে জ্বালানির দাম লাফিয়ে বাড়তে থাকে৷ ভারতের আমদানি খরচও বৃদ্ধি পায়৷ অন্যদিকে দেশের বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডারও সেই সময় প্রায় তলানিতে পৌঁছয়৷
এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিদেশে বসবাসকারী ভারতীয়দের নিরাপত্তা এবং স্বার্থরক্ষায় আরও উদ্যোগী হয় কেন্দ্র৷ তৈরি করা হয় ওভারসিজ ইন্ডিয়ান অ্যাফেয়ার্স মন্ত্রক৷ পরে অবশ্য তা বিদেশমন্ত্রকের সঙ্গেই মিশিয়ে দেওয়া হয়৷ ১৯৯০ সালে উপসাগরীয় অঞ্চলে এই সঙ্কটে ভারতীয়দের অবস্থা কী হয়েছিল এবং তাঁদের কীভাবে আকাশপথে উদ্ধার করা হয়, সেই ঘটনাক্রমের উপরে ভিত্তি করেই বলিউডে ২০১৬ সালে এয়ারলিফট নামে একটি ছবিও তৈরি হয়৷
