এই মন্তব্যের পাল্টা দিতে উঠে তৃণমূল বিধায়ক উদয়ন গুহ বলেন, “ওড়িশায় গেলে বাঙালিদের মারধরের ঘটনা ঘটে—সেই বিষয়টি কেন উপেক্ষা করা হচ্ছে?” উদয়নের এই বক্তব্যের পরেই সভায় উত্তেজনা ছড়ায় এবং বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে সরাসরি বাক্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন তিনি।
এর মধ্যেই অশোক লাহিড়ী উদয়ন গুহকে উদ্দেশ্য করে কটাক্ষ করে বলেন, “আপনি আছেন তো, আপনি বলুন—ম্যায় হুঁ না!” এই মন্তব্য ঘিরে আরও চড়তে থাকে উত্তেজনা।
advertisement
পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন উদয়ন গুহকে লক্ষ্য করে শুভেন্দু অধিকারী ব্যক্তিগত আক্রমণে নামেন। বিধানসভায় দাঁড়িয়ে তিনি উদয়নের বাবাকে ‘চোর’ বলে কটাক্ষ করেন এবং উদয়ন গুহকে ‘গুন্ডা’ বলে আক্রমণ করেন। একই সঙ্গে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “এবার ওকে হারাব।”
বিধানসভায় এই তীব্র বাক্যুদ্ধ ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে শোরগোল শুরু হয়েছে।
বিধানসভায় বাজেট বিতর্কের আলোচনায় বুধবার শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক তরজা দেখা গেল। একদিকে সামাজিক প্রকল্প ও ভাতা বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন, অন্যদিকে বাজেটের ভাষা ও দর্শন ঘিরে কটাক্ষ—সব মিলিয়ে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে অধিবেশন কক্ষ।
বাজেট আলোচনার শুরুতেই বিজেপি বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্প প্রসঙ্গে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ৬০ বছর বয়স হলেই লক্ষ্মীর ভান্ডারের উপভোক্তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বার্ধক্য ভাতার আওতায় চলে যান। লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পে ৫০০ টাকা ভাতা বাড়ানো হলেও বার্ধক্য ভাতার অঙ্ক বাড়ানোর কোনও উল্লেখ বাজেট ভাষণে নেই। এই বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য তিনি মাননীয়া অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ জানান।
এরপর বক্তব্য রাখতে উঠে বিজেপি বিধায়ক ডঃ অশোক লাহিড়ী বলেন, “বহুদিন ধরে বাজেট নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছি, অত্যন্ত নিরস একটি বিষয়। কিন্তু মাননীয়া অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য যে বাজেট পেশ করেছেন সেটা একদমই সরস বাজেট।
কেন্দ্রীয় বাজেটকে মুখ্যমন্ত্রী ‘হামটি ডামটি’ বাজেট বলেছিলেন। হামটি ডামটি বাজেট মানে আমি তেমন কোনও মানে খুঁজে পাই নি ইংরাজি অভিধানে। সেটা যদি ভাল অর্থে বলে থাকেন তাহলে ভাল, যদি খারাপ অর্থে বলে থাকেন তাহলে খারাপ। মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর কথা নিয়ে আমি রাজ্য সরকারের পেশ করা এই বাজেটকে হামটি ডামটি বাজেট বলছি।
দীর্ঘদিন ধরে বাজেট নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতায় তাঁর কাছে বিষয়টি সাধারণত নিরস মনে হলেও, এবছর অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য যে বাজেট পেশ করেছেন, তা ‘সরস’ বলেই তাঁর মনে হয়েছে।অশোক লাহিড়ীর অভিযোগ, বিপুল নথিপত্রের মাধ্যমে এই বাজেট পেশ করে বিধায়কদের হকচকিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং সরকারের মনোভাব যেন ‘ম্যায় হুঁ না’—সবকিছু সামলে নেওয়ার আত্মবিশ্বাসে ভরা।
এই সময় তাঁর বক্তব্যের মাঝেই তৃণমূল বিধায়ক উদয়ন গুহ কিছু টিপ্পনী করলে অশোক লাহিড়ী বক্তব্য থামিয়ে বলেন, “আপনি আছেন তো, আপনি বলুন—ম্যায় হুঁ না।” এর পরেই পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীকে উদয়ন গুহের উদ্দেশে বলতে শোনা যায়, “ওকে এবার হারাব। ও গুণ্ডা। বাবাকে চোর বলে।” এই মন্তব্যের জেরে অধিবেশন কক্ষে তুমুল হইচই শুরু হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে হস্তক্ষেপ করেন অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। তাঁদের উদ্যোগে দুই পক্ষকেই শান্ত করা হয়।
পরবর্তী বক্তব্যে অশোক লাহিড়ী রাজ্যপালের ভাষণের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, রাজ্যে বর্তমানে ৯৪টি প্রকল্প চালু রয়েছে। তাঁর কটাক্ষ, “এত প্রকল্প যে ঠিকমতো গুনে ওঠাই কঠিন, ভবিষ্যতে হয়তো গিনেস বুকেও নাম উঠে যেতে পারে।” তিনি পরামর্শ দেন, একটি পুস্তিকা প্রকাশ করা হলে মানুষ জানতে পারবেন কোন প্রকল্প কার জন্য। একইসঙ্গে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রসঙ্গ তুলে বলেন, নতুন সরকার আসতেও পারে, তাঁরাও ফিরতে পারেন, আবার তিনি নিজে ফিরে আসবেন কি না তাও নিশ্চিত নয়। যদি তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসে, তা ভাল কথা, কিন্তু নতুন কোনও দল এলে এই বিপুল প্রতিশ্রুতি পূরণে সমস্যায় পড়তে হতে পারে।
এর আগে বাজেট ভাষণের আলোচনায় অশোক লাহিড়ী দাবি করেন, ২০১৮ সাল থেকে ওড়িশা মাথাপিছু আয়ের নিরিখে পশ্চিমবঙ্গের থেকে এগিয়ে রয়েছে। এই মন্তব্যের পাল্টা দিয়ে উদয়ন গুহ বলেন, উড়িষ্যায় গেলে বাঙালিদের মারধরের ঘটনা ঘটে, সেই দিকটি উপেক্ষা করা হচ্ছে কেন। এই বক্তব্য ঘিরেই ফের একবার শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে উদয়ন গুহের সরাসরি বাক্বিতণ্ডা শুরু হয়।
সব মিলিয়ে বাজেট বিতর্কের আলোচনাকে ঘিরে বিধানসভায় যে রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি হল, তা আগামী দিনে আরও তীব্র হতে পারে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
