ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে চিঠিতে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রথমত, এসআইআর শুনানির জন্য প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার পরেও ভোটারদের কোনও প্রাপ্তি স্বীকারপত্র দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ। তার ফলেই পরবর্তীতে ‘নট ফাউন্ড’ দেখিয়ে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীর মতে, এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অসংবিধানিক ও অগণতান্ত্রিক এবং এর ফলে সাধারণ মানুষ চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
advertisement
এখন দেখছেন স্থল? আগে এই ৫ স্থানই ছিল অথৈ সমুদ্রের তলায়! জানেন কোনগুলো?
দ্বিতীয়ত, ২০০২ সালের এসআইআর-এর পর ভোটার তালিকা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে অনুবাদ করার কারণে বহু ক্ষেত্রে নাম, পদবি এবং বাবা-মায়ের নামের মধ্যে অসঙ্গতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। এই তথাকথিত ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’র কারণ দেখিয়ে বহু বৈধ ভোটারকে শুনানির জন্য তলব করা হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, গত ২৩ বছর ধরে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ফর্ম-৮ পূরণ করে ইআরও ও এআরও-রা প্রয়োজনীয় সরকারি নথি যাচাই করে ভোটারদের নাম তালিকাভুক্ত করেছেন। এমনকি ২০২৫ সালের ভোটার তালিকাতেও তাঁদের নাম রয়েছে। অথচ এখন কমিশনই তাদের পূর্বনির্ধারিত নিয়ম উপেক্ষা করে আবার ভোটারদের বৈধতা প্রমাণ করতে বাধ্য করছে। মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্ন, এটি কি আইনের চোখে অপরাধ নয়?
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, বানান বা পদবীর মতো ছোটখাটো ভুল সংশোধনের ক্ষমতা বিএলও, ইআরও ও এআরও-দের রয়েছে। তা সত্ত্বেও সেই সংশোধনের নামে ভোটারদের শুনানিতে ডেকে পাঠানো হচ্ছে, অথচ নোটিশ পাঠানো ছাড়া তাঁদের অন্য কোনও সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না।
মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে জানানো হয়েছে—২০০২ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে যাঁদের নাম ‘ম্যাপ’ হয়নি, তাঁদের শুনানির জন্য নোটিশ পাঠানো হবে। কিন্তু যাঁদের কাছে এই ধরনের নোটিশ যাচ্ছে, তাঁদের অনেকের নাম ইতিমধ্যেই লিংক করা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে ‘প্রজেনি’ সংক্রান্ত অজুহাতে কেন তাঁদের আবার নোটিশ পাঠানো হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
চিঠির শেষে মুখ্যমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন, বিষয়গুলি দ্রুত কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে এবং সমস্যার সমাধান হবে, যাতে সাধারণ মানুষ ও বৈধ ভোটাররা তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন।
এই প্রথম নয়, আগেও ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে—এই অভিযোগ তুলে কমিশনারকে চিঠি দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি ছিল, এসআইআর প্রক্রিয়ায় সংবেদনশীলতার ঘাটতি স্পষ্ট। চিঠিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘‘এসআইআরের নামে নির্বাচন কমিশন যে ভাবে সাধারণ মানুষকে হেনস্থা করছে, তাতে আমি স্তম্ভিত এবং বিরক্ত।’’
চিঠির টাইপ করা অংশের শেষে তিনি নিজের হাতে আরও দু’টি লাইন লিখে দেন। সেখানে মুখ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, ‘‘আমরা হয়তো এই চিঠির কোনও উত্তর পাব না। তবু আমার কর্তব্য, বিষয়গুলি আপনার নজরে আনা।’’
একাধিক বার মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে চিঠি দিয়ে এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী।তাঁর অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের এই প্রক্রিয়া অতিরিক্ত যন্ত্রনির্ভর হয়ে পড়েছে, যেখানে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাব রয়েছে।এছাড়াও এসআইআর আতঙ্কে মৃত্যুর অভিযোগও তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, এসআইআর পর্বে মোট ৭৭ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং এই সব মৃত্যুর নেপথ্যে ‘এসআইআর আতঙ্ক’ কাজ করেছে।
মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ অনুযায়ী, শুধু সাধারণ মানুষই নয়, এসআইআর শুনানিতে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকেও। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন নোবেলজয়ী অধ্যাপক অমর্ত্য সেন, কবি জয় গোস্বামী, অভিনেতা দীপক অধিকারী এবং ভারতীয় ক্রিকেটার মহম্মদ শামি। শুনানির জন্য তাঁদেরও তলব করা হয়েছে বলে দাবি করে কমিশনের আধিকারিকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করেছিলেন, নাম বা ঠিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিবাহিত মহিলাদেরও শুনানির নামে ডেকে অপ্রয়োজনীয় হয়রানি করা হচ্ছে। এই ধরনের প্রক্রিয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিপন্থী বলে দাবি করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, ভোটার তালিকার সংশোধনের মতো সংবেদনশীল প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের স্বার্থ ও মর্যাদা রক্ষায় নির্বাচন কমিশনের আরও দায়িত্বশীল ও মানবিক হওয়া প্রয়োজন।
