‘অসির চেয়ে মসি বড়-‘ এই প্রবাদেই হয়তো বিশ্বাসী তিনি। তাই বেছে নিলেন কলমকেই। তিনি লেখেন, “প্রিয় বলাগড়বাসী বন্ধুগন, শুভানুধ্যায়ী আপনজন, যা হওয়ার ছিল তাই হয়েছে। অনেক আগে থেকেই হাটেবাজারে পথেঘাটে পত্রপত্রিকায় যে খবর ছড়িয়েছিল সেটাই আজকে সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। আমি এবারের নির্বাচনে আর টিকিট পাইনি। টিকিট যে পাবনা সেটা আমি অনেক আগে থেকেই আন্দাজ করে নিয়ে ছিলাম। সেইভাবে একটা মানসিক প্রস্ততিও নিয়ে রেখেছিলাম। তাই এই সংবাদে আমার খুব একটা আশ্চর্য লাগেনি। যা হবে সেটা জানতাম বলেই অনেকদিন পরে আজ দুপুরে খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এখন পর পর কয়েকটা ফোন এসে আমাকে দিবানিদ্রা থেকে জাগিয়ে দিল। সেই ফোনের অধিকাংশ বিষন্ন বিমর্শ হতাশ! আবার কয়েকটা ভীষন আনন্দিত উল্লাসিত! এটা তো হয়ই। কথায় তো বলে যেই দেশে করি ঘর অর্ধেক আপন অর্ধেক পর! যারা পর তাঁদের আমার কিছু বলার নেই। তবে যারা আমার একান্ত আপন তাঁদের আমার কিছু বলার আছে!”
advertisement
আরও পড়ুন: দূরত্ব ঘুচল না, বিধানসভার টিকিট পেলেন না ৫ বারের বিধায়ক পার্থ! নাম বাদ প্রাথমিকের মানিকেরও
আরও অভিমান ঝরে পড়ে কলমে, “পাঁচবছর আপনাদের সঙ্গে ছিলাম , আপনারা আমাকে খুব ভালোবেসে ছিলেন, আমিও আপনাদের খুব ভালবেসে ফেলেছিলাম। আমি যে ‘বহিরাগত’, বলাগড়ের লোক নই, সেটা কোনদিন মনে হয়নি। সত্যি বলতে কি আপনাদের ছেড়ে থাকতে খুবই কষ্ট হবে। যাহোক, তৃণমূল কংগ্রেস মাননীয়া মমতা ব্যানার্জীর শ্রম ঘাম রক্ত দিয়ে গড়ে তোলা দল। ‘ওনার দলে’ উনি কাকে টিকিট দেবেন আর কাকে দেবেননা- সেটা একান্তই ওনার ব্যক্তিগত বিষয়। সে নিয়ে কার কী বলার থাকতে পারে! বন্ধুগণ, আপনারা জানেন যে চারজেলা পার হয়ে আমি বলাগড়ে গিয়েছিলাম। কোন পরিস্থিতিতে যেতে হয়েছিল সেটা আমার ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন বইয়ের সদ্য প্রকাশিত সংস্করণে বিস্তারিত লিখে রেখেছি। যারা সেটা পড়েছেন তাঁরা আমার ব্যাপারটা জেনে গেছেন ! সে যাই হোক, আপনারা আমাকে আশীর্বাদ সমর্থন দিয়েছিলেন। আপনাদের দয়ায় আমার মতো তুচ্ছ নগন্য একজন লোক, সম্মানীয় আইনসভার সদস্য হতে পেরেছিল।যে কারনে আমি আপনাদের ঋনের বোঝার তলে আকন্ঠ ডুবেছিলাম। গোটা বিধায়ক কাল আমি সেই ঋন আপ্রান পরিশোধ করার চেষ্টা করেছি। খালি পেটে রেল ষ্টেশনে শুয়ে জীবন কাটানো মানুষ আমি। তাই আমি জানি গরীব মানুষের কত কষ্ট! জানি গরীব মানুষের ন্যায্য প্রাপ্ত কি ভাবে মাঝপথে উধাও হয়ে যায়। নির্বাচনের প্রচারের সময় আমি বলেছিলাম যে আমি একটা ঘর ভাড়া নিয়ে গোটা বিধায়ক কাল আপনাদের সঙ্গেই কাটাবো। আমি আমার কথা রেখে ছিলাম। বিধায়ক হবার পর থেকে চারবছর দশমাস রাতদিন চব্বিশ ঘণ্টা আপনাদের মাঝেই পড়ে ছিলাম। আপনাদের সঙ্গে থেকে আমি আমার সাধ্যমত সততার সাথে সাহসের সাথে কঠিন পরিশ্রম করে যতটা পারি আপনাদের সেবা পরিষেবা দেবার চেষ্টা করেছি। সরকারের কাছ থেকে আপনাদের জন্য যে সব জামা কাপড় ত্রিপল এসেছে আমি নিজে ঘুরে ঘুরে আপনাদের হাতে তুলে দিয়েছি। সত্যি বলতে কি সেই সময় সাধারন গরীব মানুষের মুখে যে খুশির হাসি দেখেছি সেটাই আমার বিধায়ক জীবনের চরম ও পরম অর্জন। বিধায়ক তহবিলের যে অর্থ তার সবটাই আমি এলাকার উন্নয়নে খরচ করতে সমর্থ হয়েছি। আমি আমার সীমিত শক্তি নিয়ে মাটি মাফিয়া বালি মাফিয়া গরু পাচার গাঁজা পাচার, সবুজদ্বীপের গাছচোর, রেশনের চাল চোর, পাড়ায় পাড়ায় সচল জুয়ার ঠেক, সবার বিরুদ্ধে সাধ্যমত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলাম। এটা আপনারাও জানেন।”
শেষে তিনি বলেন, “এই সব কাজের কারনে বলাগড়ের সাধারন মানুষ, অটো টোটো অলা, চাষী ক্ষেতমজুর, বাজারের ছোট ব্যাপারী সবার প্রসংশা পেয়েছিলাম। ভালবাসা পেয়ে ছিলাম। আপনাদের কাছে থেকে বিদায় নেবার বেলায় সেই ভালোবাসার ভাণ্ডার সাথে করে নিয়ে যাচ্ছি।সারা জীবন এই সম্পদ আগলে রাখতে চেষ্টা করবো। আপনাদের মনে আছে নিশ্চয় সেই ২১ এর নির্বাচনের সময় আমি বলেছিলাম, আমি যদি কোন দূর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হই আপনারা আমার দিকে এত থুতু ছুড়বেন আমি যেন সেই থুতুর বন্যায় ডুবে মরে যাই।ধন্যবাদ আপনাদের যে কেউ আমার দিকে থুতু ছোড়েননি! বলাগড়ের সাধারন মানুষ- এমন কি বিরোধী দলের লোকেরাও, রাজনৈতিক সমালোচনা যেটা করার সেটা করেছে বটে কিন্ত আমার গাঁয়ে কেউ কালির ছিটে দিতে পারেনি। যাবার বেলায় তাদেরও একটা প্রনাম জানিয়ে যাচ্ছি।আমি তো এক লেখোয়ার! লেখা বা বলার মাধ্যমে সারা জীবন আপনাদের কথাই তো তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। পাঁচ বছর তেমন কিছু লিখে ওঠা হয়নি । আজ থেকে আবার সেই লেখার কাজে মনোনিবেশ করতে চলেছি। ব্যাস আমার আর কিছু বলার নেই ।সবাই ভালো থাকবেন । শত্রু মিত্র সবাইকে প্রনাম !” (বিদায়ী বিধায়কের মূল পোস্টের বানান অপরিবর্তিত)
গত কয়েকমাস ধরেই বলাগড়ের রাজনীতিতে গোষ্ঠীকোন্দল প্রকাশ্যে এসে পড়ে। আগেই দলীয় সভায় আমন্ত্রণ না পাওয়ায় সরব হয়েছিলেন বিধায়ক মনোরঞ্জন ব্যাপারী। তবে শুধু মনোরঞ্জন নন। একাধিক প্রভাবশালী বিধায়ককেও দেয়নি তৃণমূল। ২৬-এর ভোটে বলাগড়ে টিকিট দেওয়া হল রঞ্জন ধাড়াকে।
