গত ৪ মার্চ শ্রীলঙ্কার কাছে ভারত মহাসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি সাবমেরিন থেকে ছোড়া টর্পেডোর আঘাতে ইরানের যুদ্ধজাহাজ আইআরআইএস ডেনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জাহাজটি অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনমে একটি সামরিক মহড়ায় অংশ নেওয়ার পর নিজ দেশে ফিরছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শ্রীলঙ্কার গলের দক্ষিণে প্রায় ৪০ নটিক্যাল মাইল দূরে এই হামলা হয়। মার্কিন কর্তৃপক্ষ ওই স্থানকে আন্তর্জাতিক জলসীমা হিসেবে উল্লেখ করেছে, যেখানে ভারতের কোনও আইনি কর্তৃত্ব নেই। যদিও ঘটনাস্থল শ্রীলঙ্কার সামুদ্রিক অঞ্চলের মধ্যে পড়ে, আন্তর্জাতিক যুদ্ধকালীন নিয়ম অনুযায়ী সেখানে নৌচলাচল অনুমোদিত।
advertisement
নাক, জিভ কাটা, শরীরে যৌন নির্যাতনের আঘাত! বৃদ্ধা মাকে যে অবস্থায় উদ্ধার করলেন ছেলে…মর্মান্তিক!
নামেই ‘ভারত মহাসাগর’! ভারতের নিয়ন্ত্রণ কতটুকু?
পেন্টাগন হামলার একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে দেখা যায় জাহাজটির পশ্চাৎভাগে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে এবং পরে সেটি ধীরে ধীরে সমুদ্রের জলে ডুবে যায়।
আন্তর্জাতিক জলসীমা বা ‘হাই সিস’ সাধারণত উপকূলবর্তী দেশের ২০০ নটিক্যাল মাইলের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন (EEZ)-এর বাইরে শুরু হয়। এই এলাকায় সব দেশের জাহাজ চলাচল, মাছ ধরা এবং গবেষণার স্বাধীনতা থাকে, যদিও সমুদ্রতলের সম্পদ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির নিয়মে নিয়ন্ত্রিত হয়। আইআরআইএস ডেনা শ্রীলঙ্কার EEZ-এর মধ্যে থাকলেও নৌচলাচলের ক্ষেত্রে সেটিকে আন্তর্জাতিক জলসীমা হিসেবেই ধরা হয়।
ভারত মহাসাগর বিশ্বের একমাত্র মহাসাগর যার নাম একটি দেশের নামে। ভারতের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই এই নামকরণ হয়েছে। প্রায় ৭ কোটি বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত এই সমুদ্র এশিয়া, আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়াকে যুক্ত করেছে এবং ভারতীয় উপদ্বীপ সমুদ্রের দিকে অনেকটা এগিয়ে থাকায় ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলের সঙ্গে ভারতের নাম জড়িয়ে গেছে।
তবে নামের কারণে ভারত মহাসাগর ভারতের নিজস্ব এলাকা নয়। ১৯৮২ সালে স্বাক্ষরিত জাতিসংঘের সমুদ্র আইন সনদ (UNCLOS) অনুযায়ী সমুদ্রকে বিভিন্ন সামুদ্রিক অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে এবং প্রতিটি অঞ্চলে উপকূলবর্তী দেশের অধিকার আলাদা।
এই নিয়ম অনুযায়ী ভারতের উপকূল থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত অংশকে ভারতের আঞ্চলিক জলসীমা ধরা হয়, যেখানে ভারতের পূর্ণ কর্তৃত্ব রয়েছে। এর পরবর্তী ২৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত অঞ্চলকে সংলগ্ন অঞ্চল বলা হয়, যেখানে শুল্ক, অভিবাসন ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত আইন প্রয়োগ করা যায়।
এর বাইরে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত ভারতের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন রয়েছে, যার আয়তন প্রায় ২৩ লক্ষ বর্গকিলোমিটার। এই অঞ্চলে তেল, গ্যাস এবং মৎস্যসম্পদের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান ও ব্যবহারের অধিকার ভারতের রয়েছে।
যদিও পুরো ভারত মহাসাগরের উপর ভারতের নিয়ন্ত্রণ নেই, তবু এই অঞ্চলকে ভারত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত এলাকা হিসেবে বিবেচনা করে। ভারতের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ পণ্য পরিবহণ এই সমুদ্রপথেই হয়। সেই কারণে সমুদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারত বিমানবাহী রণতরী, সাবমেরিন এবং আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে নজরদারি চালায়।
এই ঘটনার পর বিশেষজ্ঞ মহলেও প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। বিশ্লেষক ব্রহ্মা চেলানি এক্স-এ লিখেছেন, ভারতের সামুদ্রিক এলাকার কাছাকাছি মার্কিন বাহিনীর দ্বারা ইরানের ফ্রিগেট আইআরআইএস ডেনাকে টর্পেডো করা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের ঘটনা নয়, বরং এটি নয়া দিল্লির জন্য একটি কৌশলগত অস্বস্তির পরিস্থিতি তৈরি করেছে। তাঁর মতে, ওয়াশিংটন এটিকে বৈধ যুদ্ধকালীন পদক্ষেপ হিসেবে দেখলেও ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি এমন একটি ঘটনা, যা ভারতের কূটনীতি এবং আঞ্চলিক সামুদ্রিক নেতৃত্বের দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
ভারত মহাসাগরের নাম ভারতের নামে হলেও বাস্তবে অন্য উপকূলবর্তী দেশগুলির মতো ভারতও এই বিশাল সমুদ্রের কেবল একটি সীমিত অংশের উপরই অধিকার রাখে।
