উৎক্ষেপণের পর, আর্টেমিস ২-এর নভোচারী দলই হবে মহাকাশ সংস্থার ওরিয়ন ক্যাপসুলে চড়ে মহাকাশে যাওয়া প্রথম নভোচারী, যা সুউচ্চ স্পেস লঞ্চ সিস্টেমের উপরে চড়ে কক্ষপথে পৌঁছাবে। এই নভোচারী দল চাঁদে অবতরণ করবেন না। কিন্তু তাদের প্রত্যাশিত ১০-দিনের এই অভিযানটি ২০২৮ সালের মধ্যেই চন্দ্রপৃষ্ঠে হাঁটার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওরিয়নের ভেতরে থাকা নভোচারীদের সঙ্গে পরিচিত হন এবং মহাকাশযাত্রার সময় তাদের প্রত্যাশিত ভূমিকা সম্পর্কে জানুন।
advertisement
কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান
কমান্ডার হিসেবে, ৫০ বছর বয়সি রিড ওয়াইজম্যান হলেন সেই মহাকাশচারী যিনি ক্রুদের মধ্যে যোগাযোগ থেকে শুরু করে মহাকাশযাত্রার সময় নেওয়া সিদ্ধান্ত পর্যন্ত-মিশনের সমস্ত দিক নির্বিঘ্নে কাজ করে তা নিশ্চিত করেন। নাসার মতে, ওয়াইজম্যান পাইলটের সঙ্গে মহাকাশযাত্রা পরিচালনা করেন এবং তিনিই প্রধান মহাকাশচারী যিনি পৃথিবীতে থাকা মিশন কন্ট্রোলের সঙ্গে কথা বলেন। নাসার মতে, ওয়াইজম্যান একজন টিম ম্যানেজারের মতো, যিনি মহাকাশচারীদের পক্ষ থেকে দেশে থাকা প্রকৌশলীদের সাথে কথা বলেন অথবা অভিযান চলাকালীন ক্রু-দের মধ্যেকার প্রশ্ন বা দ্বন্দ্ব সমাধানে সাহায্য করেন । কোনও ধরনের সিদ্ধান্তহীনতার ক্ষেত্রে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি ওয়াইজম্যানের কাছেই যায়।
পদকপ্রাপ্ত একজন প্রবীণ নৌ-বিমানচালক ওয়াইজম্যান মধ্যপ্রাচ্যে দুইবার দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০০৯ সালে নাসার মহাকাশচারী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার আগে একজন পরীক্ষামূলক পাইলট হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন। ওয়াইজম্যান এর আগে আরও একবার মহাকাশে গিয়েছিলেন।২০১৪ সালে, তিনি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে প্রায় ছয় মাস কাটিয়েছিলেন, যেখানে তিনি দুটি স্পেসওয়াক সম্পন্ন করেন এবং এক সপ্তাহে ৮২ ঘণ্টা গবেষণা করে স্টেশনের একটি রেকর্ড গড়তে ক্রুদের সাহায্য করেন। বাল্টিমোরের বাসিন্দা ওয়াইজম্যান দুই সন্তানের একক পিতা। তিনি ২০২০ সালে ক্যানসারে তাঁর স্ত্রী ক্যারল টেলর ওয়াইজম্যানকে হারান।
পাইলট ভিক্টর গ্লোভার
নাসার তথ্যমতে, ৪৯ বছর বয়সি পাইলট ভিক্টর গ্লোভার আর্টেমিস II-এর আরোহণ ও অবতরণের সময় একটি অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেন। তিনি নিজে হাতে মহাকাশযানটি চালনা করেন এবং ফ্লাইট তথ্যের দায়িত্ব নেন। মহাকাশযানটি পরিচালনা করার জন্য গ্লোভার ওয়াইজম্যানের সঙ্গে সমন্বয় করবেন। গ্লোভার মিশনের নির্দেশনাগুলো খুব নিবিড়ভাবে অনুসরণ করবেন এবং চাঁদকে প্রদক্ষিণ করার সময় ক্যাপসুলটি যেন সঠিক পথে থাকে, তা নিশ্চিত করবেন।
আর্টেমিস II-এর ভূমিকা সম্পর্কে নাসার বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “পাইলটের জন্য প্রোটোকল হুবহু অনুসরণ করা এবং সর্বোত্তম অনুশীলন প্রতিষ্ঠা করা গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে ধারাবাহিকতাই মূল চাবিকাঠি।” প্রয়োজন অনুযায়ী গ্লোভার অন্যান্য দায়িত্বে সাহায্য করতে পারেন এবং তিনি দ্বিতীয় প্রধান, যিনি দরকার পড়লে অভিযানটির নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত। নৌবাহিনীর বৈমানিক এবং পরীক্ষামূলক পাইলট গ্লোভার আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে ক্রু-১ মিশনের পাইলট ছিলেন। এই অভিযানটি ছিল গ্লোভারের প্রথম এবং একমাত্র মহাকাশযাত্রা, যিনি মার্কিন সিনেটে লেজিসলেটিভ ফেলো হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন ২০১৩ সালে নাসার মহাকাশচারী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর নাসার জীবনী অনুসারে, গ্লোভার ৪০টিরও বেশি বিমানে ৩,৫০০ ঘণ্টা উড্ডয়ন , ৪০০টিরও বেশি বিমানবাহী জাহাজে নিয়ন্ত্রিত অবতরণ এবং ২৪টি যুদ্ধ অভিযান সম্পন্ন করেন। ক্যালিফোর্নিয়ার পোমোনার বাসিন্দা গ্লোভার বেশ কয়েকটি স্নাতকোত্তর ডিগ্রির অধিকারী এবং তিনি বিবাহিত ও চার কন্যার জনক।
মিশন বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিনা কোচ
আর্টেমিস ২-এর আগে ক্রিস্টিনা কচ একজন রেকর্ড সৃষ্টিকারী মহাকাশচারী কর্মজীবন অতিবাহিত করেন। তিনি একজন প্রকৌশলী এবং ২০১৩ সালে মহাকাশচারী হিসেবে নির্বাচিত হন। ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে প্রথম সম্পূর্ণ নারী মহাকাশচারীদের পদচারণা পরিচালনা করে তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করেন। ২০১৯ সালের ২৮শে অক্টোবর, কচ ‘ক্রু-১২’ মিশনের অংশ হিসেবে ফের মহাকাশ স্টেশনে থাকা মহাকাশচারী জেসিকা মেয়ারের সঙ্গে সাত ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বিশেষ পোশাক পরে মহাশূন্যে কাটান।
ক্রিস্টিনা তাঁর প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র অভিযানে ২০১৯ সালের প্রায় পুরোটাই মহাকাশে কাটিয়েছেন এবং ৩২৮ দিনব্যাপী মহাকাশযাত্রার মাধ্যমে যে কোনও আমেরিকান নারীর দীর্ঘতম মহাকাশযাত্রার রেকর্ড গড়েন । নাসার মাত্র তিনজন নভোচারী এর চেয়ে দীর্ঘ একক অভিযানে অংশ নিয়েছেন। ৪৭ বছর বয়সি ক্রিস্টিনা মিশিগানের গ্র্যান্ড র্যাপিডসের বাসিন্দা এবং নর্থ ক্যারোলাইনার জ্যাকসনভিলে বেড়ে উঠেছেন। তিনি নর্থ ক্যারোলাইনার র্যালিতে অবস্থিত নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর ও স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তাঁর নাসার জীবনী থেকে জানা যায় যে, ফোটোগ্রাফি, সার্ফিং এবং রক ক্লাইম্বিং-সহ তাঁর পছন্দের কার্যকলাপের একটি দীর্ঘ তালিকা রয়েছে।
মিশন স্পেশালিস্ট ১ হিসেবে ক্রিস্টিনার ভূমিকা বৈজ্ঞানিক এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকেই। তিনি একজন উচ্চ প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞ এবং স্থায়ী নভোচারী দলের সদস্য, যাঁকে আর্টেমিস ২-এর কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হবে। নাসার তথ্য অনুযায়ী, ক্রিস্টিনা মহাকাশযানের পাশের হ্যাচের সবচেয়ে কাছে বসবেন এবং হ্যাচ সিস্টেম ও এর কার্যক্রমের প্রধান ব্যক্তি হবেন। আর হ্যাঁ, নভোচারীদেরও শৌচাগার ব্যবহার করার প্রয়োজন হয়৷ কক্ষপথে পৌঁছনোর পর পরীক্ষার জন্য ক্রিস্টিনা শৌচাগার ব্যবস্থাটি স্থাপন করবেন।
মিশন বিশেষজ্ঞ জেরেমি হ্যানসেন
কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির মহাকাশচারী জেরেমি হ্যানসেন, যিনি নাসার আর্টেমিস ২ চন্দ্রাভিযানের একজন মিশন স্পেশালিস্ট। ৫০ বছর বয়সি কানাডীয় জেরেমি হ্যানসেন আর্টেমিস II-এর মিশন স্পেশালিস্ট ২। নাসার তথ্যমতে , প্রথম দিনে তাঁকে ওরিয়নের পানীয় জল এবং জরুরি সরঞ্জামের মতো জীবনধারণ সহায়ক পরিকাঠামোর প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হবে। জরুরি অবস্থার ক্ষেত্রে জলে অবতরণের পর ডকিং হ্যাচ পরিচালনার দায়িত্বও এই পদের।
নাসার মতে, মিশন বিশেষজ্ঞ হিসেবে জেরেমি এবং ক্রিস্টিনা দু’জনকেই ‘কারেকশন বার্ন’- এ সহায়তা করার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়, যখন মিশন চলাকালীন মহাকাশযানটিকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্য থ্রাস্ট দিতে হয়। এই সমন্বয়গুলো মূলত পূর্বনির্ধারিত থাকে। মিশন বিশেষজ্ঞরা মূলত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন এবং ক্রু-রা যখন কোনও সিদ্ধান্ত নেয়, তখন উপলব্ধ সমস্ত বিকল্প খতিয়ে দেখা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করেন। জেরেমি এবং ক্রিস্টিনা, উভয়েই প্রয়োজনে কমান্ডার বা পাইলটের দায়িত্ব পালনের জন্য প্রশিক্ষিত।
আর্টেমিস ২-এর ক্রু সদস্যদের মধ্যে জেরেমি-ই একমাত্র, যিনি প্রথমবারের মতো মহাকাশে যাত্রা করবেন। ফাইটার পাইলট হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা থাকায়, জেরেমি ২০০৯ সালে কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির অধীনে নভোচারী প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচিত হন। তাঁর কৃতিত্বের মধ্যে অন্যতম হল, ২০১৭ সালে জেরেমি নাসার নতুন নভোচারী নিয়োগপ্রাপ্তদের একটি দলের নেতৃত্বদানকারী একমাত্র কানাডিয়ান হয়েছিলেন। তিন সন্তানের জনক জেরমি অন্টারিও-র একটি খামারে বেড়ে উঠেছিলেন।
