‘তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে’ রবিঠাকুরের বিখ্যাত কবিতার এই লাইনটিকে বাদ দিয়েই গত বছর বাংলাদেশে স্কুলের পাঠ্যবইতে পড়ানো হয় ৷ ‘বাংলাদেশের হৃদয়’ নামের এই কবিতা বিকৃত করে ছাপানোর পর সমালোচনা শুরু হয় গোটা বাংলাদেশে ৷ তা নিয়ে তদন্ত হলেও ঘটনার প্রমাণও মেলে ৷ কিন্তু সেই তদন্তে আসা রিপোর্ট অনুসারে কোনও পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি ৷ ২০১৭-এর পাঠক্রমে ‘বাংলাদেশের হৃদয়’ কবিতাটি বাতিল করে তার বদলে রবীন্দ্রনাথের আরেকটি কবিতা ‘নতুন দেশ’-কে পাঠক্রমে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে ৷
advertisement
বাংলাদেশে জনপ্রিয় পত্রিকা ঢাকা টাইমস ও জনকণ্ঠে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বাংলাদেশের মৌলবাদী গোষ্ঠীর দাবি পূরণের অজুহাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুরো কবিতাটিই বাদ দেওয়া হচ্ছে বই থেকে ৷ শুধু কবিগুরুর লেখাই নয়, বাদ পড়েছে লেখক হুমায়ুন আজাদের ‘বই’ কবিতাটিও। মৌলবাদীরা যাকে নাস্তিক বলে দাবি করে, সেই হুমায়ুন আজাদের কবিতা বাদ পড়ায় প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশের প্রগতিশীল এবং বুদ্ধিজীবীরা ৷ এছাড়াও নজরুল ইসলাম, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, বুদ্ধদেবের মতো কালজয়ী কবি-সাহিত্যিকদেরও লেখাও বাদ পড়েছে নয়া পাঠক্রমে ৷
বাংলাদেশের পত্রিকাতে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, মৌলবাদীদের আবদার ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একজন হিন্দু এবং তাঁর কবিতায় মন্দিরের কথা বলা হয়েছে ৷ তা এই কবিতা বাদ দিতেই হবে পাঠ্যবই থেকে ৷ প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রক এবং পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের আধিকারিকরা এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি ৷
অন্যদিকে, গত এক বছর ধরে পাঠ্যক্রমের সংস্কার চেয়ে আন্দোলন চালিয়ে আসা সংগঠন হেফাজতে ইসলামী এই লেখাগুলি বাতিল হওয়ায় ভীষণই খুশি ৷ তাদের মতে, এই সংস্কার তাদের আন্দোলনের বিজয় ৷
নতুন পাঠক্রমে দ্বিতীয় শ্রেনীতে হজরত মুহাম্মদকে নিয়ে লেখা একটি প্রবন্ধ, তৃতীয় শ্রেনীতে খালিফা আবু বক্কর, চতুর্থ শ্রেনীতে খলিফা ওমর, পঞ্চম শ্রেনীতে বিদায় হজ ও শহীদ তিতুমীরকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধ অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেনীতে ভারতের ‘রাঁচি ভ্রমণ’ লেখাটির বদলে যুক্ত হয়েছে মুসলিম দেশ মিশর ভ্রমণ সংক্রান্ত লেখা। সত্যেন সেনের ‘লাল গরুটার’ লেখাটি বাতিল হয়ে যুক্ত হয়েছে ‘সততার পুরষ্কার’। সপ্তম শ্রেনীতে শরতচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গল্প বাদ দিয়ে এসেছে ‘মরু ভাস্কর’। অষ্টম শ্রেণীতে বাদ গেছে রামায়ণের সারাংশ নিয়ে লেখা একটি কাহিনী। নবম শ্রেণীতে বাদ পড়েছে বৈষ্ণব পদাবলী ও মঙ্গল কাব্যের সাথে মিল থাকা দুটি কবিতা।
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে খবর অনুযায়ী, গতবছর পাঠ্যবই নিয়ে হাসিনা সরকারের তদন্ত রিপোর্ট একটি গোষ্ঠী এতদিন ধামাচাপা দিয়েই রেখেছিল ৷ মঙ্গলবার তদন্ত রিপোর্টের একটি কপি জনকণ্ঠের হাতে আসে। রিপোর্টে দেখা যায়, কেবল রবীন্দ্রনাথের বাংলাদেশের হৃদয় কবিতাই নয়। এমন অনেক বিখ্যাত কবিতার লাইন বিকৃত করে পড়ানো হয়েছে কেবল সাম্প্রদায়িক মনোভাবের কারণে।
ভুলগুলো তদন্তে ধরা হলেও এবার ভুল সংশোধন করে বই না ছাপিয়ে মৌলবাদীদের কথায় প্রতিটি কবিতাই বাদ দেয়া হয়েছে বই থেকে। এভাবে এবার ভুল সংশোধন ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো লেখা ও কবিতাই বাদ দেয়া হয়েছে। নামকাওয়াস্তে ছোটখাটো কিছু ভুল ঠিক করা হলেও তদন্ত রিপোর্ট ধামাচাপা দিয়ে রক্ষা করার চেষ্টা করা হয়েছে দায়ী প্রতিটি কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞকে। কিন্তু এমন কেন হলো? এ প্রশ্নে এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা জনকণ্ঠকে বলেছেন, ‘দেখেন এ ঘটনা যখন হয়েছে কিংবা যখন তদন্ত হয়েছে তখন আমি এ পদে আসিনি। মানে আমি তখন দায়িত্বে ছিলাম না। যারা করেছেন তারা বলতে পারবেন। তবে বিষয়টি যেহেতু মন্ত্রণালয়ে জমা হয়েছিল, দেখতে হবে তারা কোন ব্যবস্থা নিয়েছে কিনা। মন্ত্রণালয়ে কথা বলে পরবর্তীতে এ বিষয়ে মন্তব্য করবেন বলে জানান চেয়ারম্যান।
শুধু পাঠক্রম পরিবর্তন নিয়েই বিতর্ক নয় ৷ পাঠ্যবইয়ের বহু জায়গায় পংক্তি বিকৃতি ও ভুল বানান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে ৷ পাঠ্য বইয়ে ভুল ত্রুটির কথা স্বীকার করেছেন স্বয়ং বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। মঙ্গলবার তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ভুল ত্রুটির সাথে জড়িতরা রেহাই পাবে না। ভুল হয়েছে তা শুধরে নেওয়া হবে ৷ একইসঙ্গে পাঠক্রম পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্তদুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার ঘোষণাও তিনি করেন ৷ শিক্ষামন্ত্রীর আশ্বাস, ‘তদন্ত কমিটির কাজ শুরু হয়েছে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর মধ্যে নেতিবাচক প্রচার না করতে অনুরোধ জানাচ্ছি।’
