'নন্দীগ্রামে মীনাক্ষীদির লড়াই আমাদের অনুপ্রেরণা', কথাবার্তায় ঐশী ঘোষ

'নন্দীগ্রামে মীনাক্ষীদির লড়াই আমাদের অনুপ্রেরণা', কথাবার্তায় ঐশী ঘোষ

মাটি কামড়ে পড়ে আছেন ঐশী, ঘুরছেন বাড়ি বাড়ি‌। ছবি সূত্র-ফেসবুক

ছিলেন ছাত্র রাজনীতিতে। পা রাখতে চাইছেন সংসদীয় রাজনীতিতে। চড়াই উৎরাই পথটার বাঁক কতটুকু চেনেন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতির মুখ তথা জামুরিয়ার প্রার্থী ঐশী ঘোষ?কথা বললেন অর্ক দেব।

  • Share this:

    ২০১৩ সাল থেকে আপনি রাজ্যের বাইরে। পশ্চিমবঙ্গের সংসদীয় রাজনীতির সঙ্গে কার্যত সম্পর্কই নেই আপনার। রাজধানীর মায়া কাটিয়ে হঠাৎ জামুরিয়ায় কেন! আপনিও তো হালের রাজনৈতিক পরিভাষায় বহিরাগত?

    আমি বহিরাগত নই। এই তত্ত্ব আমার ক্ষেত্রে খাটে না। আমি পশ্চিমবঙ্গে বড় হয়েছি। আমার পড়াশোনার একটা বড় অংশ তো এই রাজ্যেই। উচ্চশিক্ষার পরিকাঠামো পশ্চিমবঙ্গে ছিল না (২০১৩-তে)। তাই আমায়, আমার মতো অনেককেই বাইরে পড়তে যেতে হয়েছে। আমি পশ্চিমবঙ্গের একেবারে সাধারণ শ্রমিক পরিবারের মেয়ে। বাবা শ্রমিক সংগঠন করতেন সক্রিয় ভাবে। পশ্চিম বর্ধমানের নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে বড় হয়েছি। আমায় শিক্ষার জন্য চলে যেতে হয়েছে বাইরে,  আমার মতোই কেউ পড়তে না পেরে গিয়েছে, কেউ চাকরি না পেয়ে গিয়েছে। আমার মতো অনেকেরই বাবা মা রিটায়ার্ড, বাইরে যাওয়ার কোনও কারণ নেই। কিন্তু এখানে থেকে শিক্ষা-চাকরি হচ্ছে না বলেই তো বাইরে যেতে হয়েছে।

    আপনি দুর্গাপুরের মেয়ে। দল জামুরিয়ায় দাঁড় করালো কেন? দুর্গাপুর হলে লড়াইটা একটু সহজ হত না? কে চায় হোম ম্যাচ না খেলে অ্যাওয়ে ম্যাচ খেলতে?

    আগেই বলছিলাম আমি বড় হয়েছি ঘুরে ঘুরে। আমার জন্ম বর্ধমানের দেওয়ানদিঘিতে। বাবার চাকরির জন্য বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে হয়েছে। আর আমি তো কোনও একজন ব্যক্তি হিসেবে লড়াই করছি না। একটা বিকল্পের প্রতিনিধিত্ব করছি। ছাত্রযুব, শ্রমিক শ্রেণির প্রতিনিধি হতে কমিউনিস্ট পলিটিক্স করছি। যেখানেই যাব সেখানকার সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের স‌ঙ্গে মিশে কাজ করার চেষ্টা করব।

    জামুরিয়ায় আপনি যদি জেতেন তবে তো এলাকায় পড়ে থেকে কাজ করতে হবে। জামুরিয়ার স্থানীয় ইস্যুগুলি, যা নিয়ে কাজ করা জরুরি বলে মনে করছেন, সেগুলি একটু তুলে ধরুন

    এখানে কয়লার চোরাকারবার চলে। সেটা বন্ধ করতে গেলে কাজ দিতে হবে মানুষকে। এই এলাকায় স্পঞ্জ আয়রন কারখানায় কর্মসংস্থান সংক্রান্ত বহু অসুবিধে আছে। এখানকার স্কুল কলেজে প্রচুর ড্রপআউট স্টুডেন্ট রয়েছে। ২০১১ সালের পরে এখানে কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। এইখানে‌ তিনবছরের ডিগ্রি পাঁচ বছরে পায় ছাত্রছাত্রীরা, কাজেই উচ্চশিক্ষা পাচ্ছে না তাঁরা। মহিলাদের জীবিকা, ১৫০ দিনের কাজের ব্যবস্থা করা করা, এগুলোই মোটামুটি আমার ফোকাস। এছাড়া জলের ইস্যু রয়েছে।

    ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটে জাহানারা খান ৭,৭৫৭ ভোটের লিডে জিতেছিল এই কেন্দ্রে। তৃণমূল লড়াই দিয়েছিল ভালোই। বিজেপি মাত্র ১৪ শতাংশ ভোট নিয়ে সন্তুষ্ট ছিল। ২০১৯ সালে বাবুল সুপ্রিয় রেকর্ড গোটা আসানসোলেই হিসেবটাই উল্টে দিলেন। আপনার পায়ের তলায় জমি কতটুকু?

    লোকসভার প্যাটার্নটাই আলাদা। আমরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে বুঝতে পারছি খুব ভালো জনসমর্থন রয়েছে আমাদের। মিডিয়ার একাংশ একটা আখ্যান তৈরি করেছে, যেখানে দেখানো হচ্ছে লড়াইটা আসলে তৃণমূল এবং বিজেপির। আমাদের সংগঠন এখানে মানুষের পাশে থেকে লড়ছে। এখানে একের পর এক কোলিয়ারি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বাবুল সুপ্রিয় তো সাধারণ মানুষের কাছে এসে বলেননি কোলিয়ারিগুলি বন্ধ হবে না। কোলিয়ারি বন্ধের বিরুদ্ধে ধর্মঘট‌ তৃণমূল এসে তুলে দিয়েছে। লালঝাণ্ডার পার্টি তো এই সময়ে মানুষের পাশে থেকেছে।

    ২০১৬ সালে যে বামপন্থীরা দলকে ভোট দিয়েছিল, ২০১৯ এ তো তাদেরই বড় অংশ বাবুলকে জেতালেন, সেই ভোট আপনি ফেরাতে পারবেন?

    ভোটার কী করবেন সেটা তো তাঁরাই সিদ্ধান্ত নেবে। মানুষ তো একসময়ে তৃণমূলকেও ভোট দিয়েছে। গোটা দেশের মানুষ কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছে একটা লম্বা সময়। আর তৃণমূলই তো বিজেপিকে জায়গা করে দিল গত দশ বছর। তৃণমূলের বড় বড় নেতারা, যারা বলত, দিদির আঁচল ছেড়ে যাব না তারা তো বিজেপিতে জোট দিয়েছে। ‌ আমা‌দের কাজ মানুষকে বোঝানো, আজকে যে রাজনীতিটা হচ্ছে সেখানে ধর্মের নামে জাতির নামে হিংসাকে টেনে আনা হচ্ছে। ২০১১-র আগে এই রাজনীতিটা দেখেনি পশ্চিমবঙ্গ।

    আপনি ধর্ম-জাতের কথা বললেন, সেই প্রসঙ্গেই কথা বলি। এটা তো আসলে সারা দেশে পরীক্ষিত সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পলিটিক্স। আপনার দল শ্রেণির রাজনীতি করেছে, বর্ণের কথা ভাবেনি। সেই জায়গা থেকেই তো এই রাজনীতিটার পরিসর তৈরি হয়েছে। তৃণমূল প্রথম থেকেই পিছিয়ে পড়া জনজাতি নিয়ে কাজ করছে । আর বিজেপির ক্ষেত্রে নেতা নির্বাচন থেকে টার্গেট গ্রুপ তৈরি করা, সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংই অগ্রাধিকার পেয়েছে।

    আমরা কখনও মনে করি না বর্ণের রাজনীতি করে ভোট করা উচিত। আপনি মুসলমান বলে অমুক দলকে ভোট দেবেন, হিন্দু বলে তমুক দলকে ভোট দেবেন এমনটা হতে পারে না। খিদের জ্বালা তো হিন্দু মুসলিম সকলেরই এক। দিল্লিতে যে কৃষি আন্দোলন হচ্ছে, ,সেখানে তো হিন্দু মুসলিম উভয়েই আছেন। বিজেপি তো বলছে না হিন্দু হলে চাকরি দেবে। ধর্মকে আইডেন্টিটি করে দেওয়ার চরম বিরোধী আমরা। আমাদের রাজনীতি রুজিরুটি, শিক্ষা নিয়ে।

    ২০১৪ সাল থেকেই বলা হচ্ছে ভোট হচ্ছে হোয়াটস অ্যাপে, ভোট হচ্ছে স্মার্টফোনে। সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার বা অপব্যবহার বহু জায়গায় নির্ণায়ক ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে অতীতে। আপনি বা আপনারা এর কোনও কাউন্টার তৈরি করতে পেরেছেন?

    আমাদের দল তো সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করেছে। আমরা তো মানুষের কাছে পৌঁছচ্ছি সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আর বিজেপি তো সোশ্যাল মিডিয়া কে তথ্যের অপব্যবহার করে, গুজব ছড়ায়। তাই নিয়ে তো মিডিয়া নীরব। আমার মূল মাথাব্যথা মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাওয়া। জামুরিয়াতে সেটাই করছি। মানুষের মধ্যে থাকছি।

    জামুরিয়া ছেড়ে অন্য কোথাও যাচ্ছেন না কেন?

    কারণ আমি আমার কেন্দ্রেই ফোকাস করছি। আমার ভোট ২৬ তারিখ। এখন তো অন্যত্র যেতে পারব না।

    দিল্লিতে ক্যাম্পাসে লড়তে হচ্ছিল এবিভিপির সঙ্গে। এখানে বিজেপির সঙ্গে টক্কর। কোনটা বেশি কঠিন?

    আমরা দিল্লিতে আন্দোলন করেছিলাম। শুধু আমরাই নই আমাদের অধ্যাপকরাও মার খেয়েছিল। বিজেপি সেটা মেনে নিতে পারেনি। তাই লোক পাঠিয়েছিল। আবার এখানেও গত পরশুই জামুরিয়াতে সভা চলাকালীন ভাঙচুর করে করেছে। ফলে লড়াইটা একই।

    আপনাদের দলের ম্যানিফেস্টোর এমন একটা বিষয় বলুন, যা অন্যদের প্রতিশ্রুতিতে নেই।

    আমরা স্পষ্ট ভাবে বলেছি পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য একটি দফতর হবে। স্কিলসেট অনুযায়ী কাজের জায়গা তৈরি করা হবে। এই পরিযায়ী শ্রমিকদের রাজ্যে ফিরিয়ে আনতে হবে। আমাদের এই জামুরিয়ায় একটিও কারখানা হয়নি। আমরা চাই কলকারখানা হোক, শিল্প হোক,মানুষ নিজ রাজ্যেই কাজ পাক।

    শীতলকুচি নিয়ে আপনার স্টেটমেন্ট কী?

    মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যের নিন্দা করি। তেমনই প্রশ্ন করি, সায়ন্তন বসু, দিলীপ ঘোষকে কেন সেন্সর করা হচ্ছে না? প্রধানমন্ত্রী-মুখ্যমন্ত্রীকে ব্যক্তি আক্রমণ করছেন। সিআরপিএফ-সিআইএসফ কেন্দ্রীয় বাহিনী হিসেবে কাজ করছে না বিজেপির এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে বুঝতে পারছি না। কেউ বলছে না পাঁচটা তরতাজা প্রাণ চলে গেল। দুটো দলই এর জন্য দায়ী। শীতলকুচি গণতন্ত্রের কালো দিন। নির্বাচন কমিশন সবটা চুপ করে দেখছে, ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে। আশা করব আগামী চার দফায় পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে কাজ না করুক। মানুষ ভোট দিক।

    আপনাদের দলের শরিক আইএসএফ-এর গ্রহণযোগ্যতা কতটা? সংখ্যালঘু ভোট কাটাই এই দলের বা বলা ভালো আপনাদের জোটের অভীপ্সা?

    আমরা একসঙ্গে লড়ছি। আমাদের সভায় সিপিআইএম,কংগ্রেস, আইএসএফ তিনটি দলেরই লোক থাকছে। আইএসএফ তো ধর্মের নামে ভোট চাইছে না। গোটা দলটাই ধর্মীয় রাজনীতির বিরোধিতা করছি। আমরা বলছি, তৃণমূল মুসলমান দরদি বলে নিজেকে তুলে ধরেছে তবে মুসলমানের রোজগার নিয়ে ভাবেনি।

    দিল্লি ছেড়ে বাংলায় লড়তে এসেছেন সদলবলে। আপনি জিতলে আশা রাখি বাংলায় থাকবেন। কিন্তু দিল্লির বামপন্থী ছাত্র রাজনীতিরও তো মুখ আপনারা। আপনাদের সদলবলে চলে আসায় যে শূন্যস্থানটা তৈরি হচ্ছে তা পূরণ হবে কী করে?

    আমাদের দুই হাজারের বেশি এসএফআই সদস্য রয়েছে জেএনইউ-তে। ব্যক্তি আমির থাকা-না থাকাটা কোনও বিষয় নয়। তাছাড়া একদিন তো জায়গা তো ছেড়ে দিতেই হয়। চিরকাল তো এসএফআই করব না। জেএনইউ অটুট রয়েছে।

    নন্দীগ্রামে মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের লড়াইটা কী ভাবে দেখছেন?

    নন্দীগ্রাম আমাদের জন্য অনু‌প্রেরণা। মীনাক্ষীদি যেভাবে লড়াই করেছেন তা শেখার। মীনাক্ষীদি মিডিয়ার তৈরি বাইনারিটা ভেঙে দিতে পেরেছন। আগামি দিন আমরা চাই নন্দীগ্রাম থেকেই সংযুক্ত মোর্চা লড়াইয়ে ফিরে আসুক। নন্দীগ্রামের লড়াই থেকেই আমরা আশা রাখি, সন্ত্রাসকবলিত জায়গায় আমরা আবার সংগঠনকে ফিরিয়ে আনতে পারব।

    হেরে গেলে দিল্লি ফিরে যাবেন?

    হ্যাঁ যাব। বামপন্থী লড়াইয়ের সঙ্গেই থাকব। ছাত্র-শ্রমিকের প্রতিনিধিত্বই করব।

    Published by:Arka Deb
    First published:

    লেটেস্ট খবর