বাংলাদেশ নির্বাচন: উন্নয়ন অথবা গণতন্ত্র
Last Updated:
প্রতিবেদন: সুবীর ভৌমিক, ঢাকা
#ঢাকা: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আদপে অর্থনীতিবিদ নয়, তবুও সম্প্রতি তাঁর বক্তব্যে বার বারই উঠে আসে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা ৷
২০০৮ থেকে ২০১৮ ৷ বাংলাদেশের মসনদে দশ বছরের রাজত্ব তাঁর ৷ এই দশ বছরে অভূতপূর্ব উন্নয়ন দেখেছে বাংলাদেশ ৷ অর্থনৈতিক দিক থেকে, সামাজিক দিক থেকে বাংলাদেশের উন্নয়ন নজর কাড়া ৷ এই উন্নয়নকে একদা ‘আ বাক্সেট কেস’ বলে অভিহিত করেছিলেন হেনরি কিসিংগার ৷ বাংলাদেশ এখন এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলির মধ্যে সবচেয়ে উন্নয়নমূলক দেশ ৷
advertisement
advertisement
যদিও শেখ হাসিনার দল আওয়ামি লিগ বিরোধীদের কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছে বহুবার ৷ এমনকী, ৩০ ডিসেম্বর সংসদীয় নির্বাচনেও বিরোধী দলের সঙ্গে কঠিন লড়াইয়েও সামিল হয়েছিল এই দল ৷ তবে হাসিনা আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, জানিয়ে ছিলেন, ‘উত্তর দেবে ব্যালট বাক্সই...’
শেখ হাসিনার লক্ষ্যই হল ২০১২ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ‘মিডল ইনকাম কান্ট্রি’ হিসেবেই গড়ে তোলা ৷ শেখ হাসিনা স্পষ্টই জানিয়েছেন, তিনি চান বাংলাদেশের মানুষ ফের তাঁর দলকে নির্বাচিত করুক, যাতে তিনি বাংলাদেশের এই আর্থিক উন্নয়নকে আরও বেশি এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন৷
advertisement
বাংলাদেশের আর্থিক উন্নয়নের বার্ষিক হার ৬ থেকে ৭ শতাংশ ৷ তবে শেখ হাসিনা এ বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী যে, আগামী আর্থিক বছরে বাংলদেশের আর্থিক বিকাশ ৮ শতাংশের মাত্রা অতিক্রম করবে ৷ সম্প্রতি এক সাংবাদিক বৈঠকে হাসিনা জানিয়েছেন, ‘আমরা যদি আবার নির্বাচিত হই ৷ তাহলে আগামী তিন বছরে আর্থিক উন্নয়নকে ১০ শতাংশ অবধি নিয়ে যেতে যাবতীয় চেষ্টা চালাব ৷ ’
advertisement
বিশ্ব ব্যাঙ্কের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৭২ সালে দারিদ্র সীমার নিচে ছিল দেশের ৮২ শতাংশ মানুষ ২০১০ সালে যা দাঁড়ায় ১৮.৫ শতাংশ, ২০১৬ সালে তা হয় ১৩.৮ শতাংশ এবং ২০১৮ সালে ৯ শতাংশের নিচে থাকে ৷ সাম্প্রতিক দারিদ্র সীমানার হিসেব যা বলছে, তাতে ২০২১ -এর মধ্যে অতিরিক্ত দারিদ্র সীমার নিচে থাকা মানুষদের নিমূল করা যেতে পারে, যা কিনা দক্ষিণ এশিয়ার দেশের মধ্যে এই প্রথম ৷
advertisement
হাসিনার ‘অর্থনৈতিক মডেল’ সম্পুর্ণভাবেই অর্থনৈতিক বিকাশ ও সামাজিক উন্নয়নের ইঙ্গিতবাহক ৷
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১৮ সালে কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের অংশগ্রহণের পরিমাপ ৪৫ শতাংশ ৷ অন্যদিকে, শিক্ষাক্ষেত্রে মহিলার উপস্থিতি ৯৮ শতাংশ ৷ যা কিনা পুরুষদের তুলনায় ৭ শতাংশ বেশি ৷ ওয়ার্ল্ড ইকোনকিম ফোরাম বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার ‘লিঙ্গ সাম্যের দেশ’ বলে অভিহিত করেছে ৷ এ বিষয়ে বাংলাদেশের স্থান ৪৭, মলদ্বীপ ১০৬, আর ভারত ১০৮-এ ৷
advertisement
সংবাদমাধ্যমকে হাসিনা জানিয়েছেন, ‘আমরা গর্বিত ৷ আমার দেশের মহিলারা, দেশের বিকাশের মূল ধারক ও বাহক ৷ বাংলাদেশের বস্ত্রশিল্পা, যা বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় এবং এদেশের সর্বাধিক রপ্তানিতে সাহায্য করে, সেই বস্ত্রশিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে দেশের ৭০ শতাংশ মহিলারা ৷ ’ সঙ্গে হাসিনা বলেন, এই অর্থনৈতিক বিকাশ দেশের গরীব মানুষ ও বিশেষ করে গ্রামীণ বাংলাদেশেরই উন্নতিসাধন করবে ৷
advertisement
কৃষক ও ভ্যান রিক্সা চালকদের উদ্দেশ্যে হাসিনা জানান, ‘বাংলাদেশের হৃদপিণ্ডই হল এই সব মানুষ ৷ যারা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন ! ’
মার্কিন-চিনের বাণিজ্যিক যুদ্ধ বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলির বাণিজ্যিক ক্ষেত্রকে বেশিরভাগ সময়ই লাভবান করছে ৷ তাই হাসিনা এই সুযোগকে কোনও মতেই হাত ছাড়া করতে রাজি নন ৷ হাসিনা পরিকল্পনা করছেন দেশের মধ্যে ১০০ টি স্পেশাল ইকোনমিক জোন তৈরি করার ৷ যার মধ্যে ১১টি ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে গিয়েছে ৷ বাকি রয়েছে ৭৯টি ৷
বিশ্ব ব্যাঙ্কের অনুদানকে বাতিল করে, বাংলাদেশের নিজস্ব রাজকোষের অর্থেই পদ্মানদীর ওপর তৈরি হচ্ছে সেতু ৷ আগামী বছরের মধ্যেই তা তৈরি হয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে ৷ এই সেতু ২১টি জেলার সঙ্গে সংযুক্ত হবে ৷ বিশিষ্ট সম্পাদক স্বদেশ রায়ের কথায়, ‘শুধুমাত্র দেশের একটি নতুন সেতু নয়, এই সেতু বাংলাদেশের মানুষদের জন্য গর্বের বিষয় ৷ ’
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে উন্নততর রাস্তা, সেতু ৷ কখনও চিন থেকে আর্থিক সাহায্য, কখনও ভারত থেকে আর্থিক সাহায্য, আবার কখনও নিজস্ব রাজকোষের অর্থ দিয়েই বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিকাশসাধন করে চলেছে হাসিনা সরকার৷
হাসিনা ভারত ও চিনের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে সবসময়ই সমতা বজায় রেখে চলেছেন ৷ বস্ত্রশিল্পের পরেই বাংলাদেশ, সবচেয়ে বেশি শ্রমিক রপ্তানি করে গোটা বিশ্বে ৷
বাংলাদেশ বিশেষজ্ঞ সুখরঞ্জন দাশগুপ্তের কথায়, ‘হাসিনা যেমনভাবে বাংলাদেশের উন্নয়নের কথা ভাবছেন, কোনও নেতা তেমনভাবে ভাবেন না’ ৷ দাশগুপ্ত আরও বলেন, ‘হাসিনা তাঁর পিতা শেখ মুজিবর রহমনের মতোই ৷ তাঁর মতোই বাংলাদেশকে অর্থে সোনার বাংলা করে তুলে চান !’
শেখ হাসিনাকে নিয়ে তৈরি একটি তথ্যচিত্র ‘হাসিনা: আ ডটার’স টেল’ মু্ক্তি পাওয়ার পরে উচ্চ প্রশংসা পায় ৷ যা কিনা নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিতে সাহায্য করে ৷
প্রাইস ওয়াটার কুপার্স মনে করে, আগামী দুই শতকে বাংলাদেশ সবচেয়ে উন্নয়নমূলক দেশ হয়ে উঠবে ৷ আর সেই কারণেই হয়তো নির্বাচনে হাসিনার একমাত্র স্লোগান ‘উন্নয়ন এবং একমাত্র উন্নয়ন ৷’
নির্বাচনের আগে হাসিনার দলকর্মীদের মুখে একটাই স্লোগান আওয়ামি দলের পরাজয়ের অর্থই হল বিকাশকে থমকে দেওয়া ৷ আর বাংলাদেশকে ফের ২০০১-০৬-এর বিএনপি ও জামাত-এ-ইসলামি ‘কালো’ শাসনের দিকে ঠেলে দেওয়া ৷ যেখানে কিনা উগ্রপন্থা, আতঙ্কেরই একমাত্র বিকাশ ঘটে ৷
আওয়ামি লিগের জেনারেল সেক্রেটারি ওবাইদুল কুয়াদেরের কথায়, ‘ওরা (বিএনপি ও জামাত-এ-ইসলামি ) মানুষকে কী দিতে পারবে ? রক্ত আর চোখের জল ? আমরা যদি পরাজিত হই, তাহলে বাংলাদেশের বিকাশ কয়েকশো যুগ পিছিয়ে যাবে !’
নির্বাচনের আগে হাসিনা একদিকে উন্নয়নের কথা বলছে, অন্যদিকে বিরোধীরা গণতন্ত্রের মন্ত্র উচ্চারণ করছে ৷
২০১৪ সালে বিএনপি ও তার সহযোগী পার্টি নির্বাচন বয়কট করেছিল ৷ তাদের দাবি ছিল হাসিনা সরকার নির্বাচন সুষ্ঠভাবে করতে দেয়নি ৷ তবে বিরোধীদের এই অভিযোগকে নসাৎ করে ৷ এর ফলে আগুন জ্বলেছিল গোটা বাংলাদেশে ৷ হাসিনা সরকারের বিরোধিতায় তীব্র প্রতিবাদ দেখা দিয়েছিল ৷ যা প্রাণ কেড়েছিল একশো মানুষের ৷
ঠিক এই সময়ই বিএনপি-র সঙ্গে যুক্ত হয় গণ ফোরাম (পিপলস ফোরাম) ৷ যা নেতৃত্ব দিয়েছিল প্রাক্তন আওয়ামি লিগের নেতা কামাল হোসেন ৷ যিনি কিনা শেখ মুজিমর রহমের প্রতিদ্বন্ধি ছিলেন ৷ হাসিনার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল তীক্ত ৷ কামাল হাসনের মতে, ‘হাসিনা গত পাঁচ বছর ধরে গণতন্ত্রের মুখে ধুলো দিয়ে সরকার পরিচালনা করছেন ৷ গণতন্ত্রকে ফের বাংলাদেশে নিয়ে আসতে হবে ৷ সাধারণ মানুষের হাতে ভোটাধিকারকে সুনিশ্চিত করতে হবে ৷’
অন্যদিকে, বিএনপি-র জেনারেল সেক্রেটারি রুহুল কবীর রিজভি মনে করেন, ‘নির্বাচনে জেতার জন্য হাসিনার সরকার পুলিশ আধিকারিকদের সঙ্গে বসে প্ল্যান তৈরি করেছে ৷ এমনকী, অতিরিক্ত ব্যালট পেপারও ছাপানো হয়েছে ৷ যা দিয়ে ব্যালট বাক্স পূর্ণ করবে হাসিনা সরকার ৷’ তিনি আরও জানিয়েছেন, ‘২০০,০০০ আওয়ামি লিগের কর্মীদের বিশেষ ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে ভোটের সময় বুথ অধিগ্রহণের জন্য ৷ ’
তবে উত্তরে আওয়ামি লিগের যুবনেতা সুফি ফারুখ জানিয়েছেন, ‘এসব একেবারেই ভ্রান্ত অভিযোগ ৷ আসলে বিরোধীরা জানতে পেরেছে, তাঁদের অস্তিত্ব বলে কিছুই নেই ৷ এমনকী, বুঝতে পারছে জনসাধারণ ঠিক কি চাইছেন ৷ সেই কারণেই নিজেদের ব্যর্থ মনোভাব পোষণ করছেন বিরোধী নেতারা ৷’
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংস্থার মতে, হাসিনার সরকারে ফিরে আসার সম্ভাবনা ৬৬ শতাংশ, অন্যদিকে ২১ শতাংশ মানুষ চাইছেন বিএনপি-র খালেদা জিয়াকে ৷ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আর্থিক দুর্নীতিতে জড়িয়ে আপাতত রয়েছেন হাজতে৷ অন্যদিকে, খালেদা পুত্র তারিক দেশ ছেড়ে লন্ডনে পলাতক ৷ ২০০৪ সালে হাসিনার ওপর গ্রেনেড আক্রমণের মামলায় খালেদা পুত্র তারিকও যাবজ্জীবন সাজা পেয়েছেন ৷ সেক্ষেত্রে এই মুহূর্তে বিএনপি দল শীর্ষনেতৃত্বহীন অবস্থায় রয়েছে ৷
তবে গত দশ বছরে আওয়ামি লিগ পার্টির প্রতি বহু আনুগত্যের জন্ম দিয়েছে ৷ পার্টি টিকিট পাওয়ার জন্য তাই লড়াইটাও বেশিমাত্রায় ৷ সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত মনে করছেন, ‘এই বহু আনুগত্যই দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে আওয়ামি লিগের জন্য৷ এর মধ্যে প্রবেশ করতে পারে দুর্নীতিও ৷’
দেশের সব লেটেস্ট খবর ( National News in Bengali ) এবং বিদেশের সব খবর ( World News in Bengali ) পান নিউজ 18 বাংলায় ৷ দেখুন ব্রেকিং নিউজ এবং টপ হেডলাইন নিউজ 18 বাংলার লাইভ টিভিতে ৷ ডাউনলোড করুন নিউজ 18 বাংলার অ্যাপ অ্যান্ড্রয়েড এবং আইওএস-এ ৷ News18 Bangla-কে গুগলে ফলো করতে ক্লিক করুন এখানে ৷
Location :
First Published :
December 10, 2018 8:19 PM IST

