আমেরিকা F-35 নিয়ে গর্ব করলেও, প্রায় ৬০ বছর আগে সমুদ্রের ‘সম্রাট’ তৈরি করেছিল রাশিয়া, একটি ভুলেই যার মূল্য চোকাতে হয়েছিল!
- Published by:Tias Banerjee
Last Updated:
K-222, সোভিয়েত ইউনিয়নের তৈরি ইতিহাসের দ্রুততম পারমাণবিক সাবমেরিন, গতি ও প্রযুক্তিতে অতুলনীয় হলেও উচ্চ শব্দ ও ঝুঁকির কারণে এর ভবিষ্যৎ সীমিত হয়েছিল।
আমেরিকা আজ F-35-এর মতো আধুনিক যুদ্ধবিমান নিয়ে গর্ব করলেও, প্রায় ৬০ বছর আগে সাগরের তলায় এমন এক ‘সম্রাট’ তৈরি করেছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন, যার নজির আজও মেলেনি। তবে সেই যুগান্তকারী সাফল্যের মাঝেই ছিল একটি মারাত্মক ভুল, যা শেষ পর্যন্ত সেই অস্ত্রব্যবস্থার ভবিষ্যৎ সীমিত করে দেয়।
পরিবর্তিত কৌশলগত পরিবেশে আমেরিকা, রাশিয়া, চিন ও ভারত—সব দেশই দ্রুত নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আধুনিকীকরণে ব্যস্ত। স্থল, আকাশ ও সমুদ্র—তিন ক্ষেত্রেই নতুন প্রযুক্তির সংযোজন চলছে। বিমানবাহী রণতরী, সাবমেরিন, রাডার, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা—সব কিছুর উন্নয়ন হচ্ছে। কিন্তু আধুনিক যুগের অনেক আগেই এমন এক প্রযুক্তি তৈরি হয়েছিল, যা আজও তুলনাহীন।
advertisement
advertisement

K-222 দ্রুততম পারমাণবিক সাবমেরিন: ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত K-222 সাবমেরিনের গতির কাছাকাছি আজও পৌঁছতে পারেনি কোনও সাবমেরিন
advertisement
ষাটের দশকের শেষ দিকে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন এমন এক সাবমেরিন তৈরি করে, যা জলের নীচে যুদ্ধের প্রচলিত ধারণাই বদলে দিয়েছিল। ঠান্ডা যুদ্ধের সময়, যখন আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন একে অপরের ওপর নজর রাখছিল, তখন সোভিয়েত নৌবাহিনী এমন একটি সাবমেরিন তৈরি করে, যার নাম ছিল K-222। ন্যাটো দেশগুলির কাছে এটি পরিচিত ছিল ‘পাপা-ক্লাস’ সাবমেরিন নামে।
advertisement
এই K-222 আজও ইতিহাসের দ্রুততম পারমাণবিক সাবমেরিন। ১৯৭১ সালে পরীক্ষামূলক যাত্রায় এটি ৪৪.৭ নট, অর্থাৎ প্রায় ৮২.৮ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতিতে ছুটেছিল—যে গতি আজও কোনও সক্রিয় সাবমেরিন অতিক্রম করতে পারেনি।
তবে এই অভূতপূর্ব সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল বিপুল প্রযুক্তিগত ঝুঁকি, মানবিক সমস্যা ও নিরাপত্তাগত ত্রুটি। ফলে K-222-এর সামরিক জীবন খুব দীর্ঘ হয়নি। এই গল্প শুধু একটি যন্ত্রের নয়, বরং তৎকালীন কৌশলগত ভাবনা, প্রযুক্তিগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং তার সীমাবদ্ধতার প্রতিচ্ছবি।
advertisement
কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের পরপরই সোভিয়েত নৌ নেতৃত্ব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে যে, আমেরিকার বিমানবাহী রণতরীর মোকাবিলায় তাদের কাছে যথেষ্ট দ্রুত ও কার্যকর জলতলের অস্ত্র নেই। সেই প্রেক্ষিতেই এমন একটি সাবমেরিনের ধারণা আসে, যা দ্রুত শত্রুপক্ষের বহরের কাছে পৌঁছে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে আবার অদৃশ্য হয়ে যেতে পারবে। এই ভাবনা প্রচলিত সাবমেরিন কৌশলের বিপরীত ছিল, যেখানে নীরবতাই ছিল প্রধান শক্তি। কিন্তু K-222-এর ক্ষেত্রে নীরবতার বদলে গতি ছিল মুখ্য।
advertisement
যেখানে আমেরিকা B-52 বোমারু বিমান বা F-35-এর মতো পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান নিয়ে গর্ব করে, সেখানে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রায় ছয় দশক আগেই এমন একটি সাবমেরিন তৈরি করেছিল, যা এখনও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ১৯৬৯ সালে কমিশন হওয়া এই পারমাণবিক সাবমেরিনে ছিল নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড বহনে সক্ষম ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। শুধু নজরদারি নয়, প্রয়োজনে দ্রুত যুদ্ধজাহাজ ও উপকূলীয় লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানাই ছিল এর উদ্দেশ্য।
advertisement
অসাধারণ গতি পেতে K-222-এর হাল তৈরিতে ব্যাপক ভাবে টাইটানিয়াম ব্যবহার করেছিলেন সোভিয়েত প্রকৌশলীরা। টাইটানিয়াম ইস্পাতের তুলনায় হালকা, শক্তিশালী ও ক্ষয় প্রতিরোধী হলেও, ঢালাই ও জোড়া লাগানো অত্যন্ত কঠিন এবং ব্যয়বহুল। এত বড় সাবমেরিনে এই ধাতু ব্যবহার করা তখন নিজেই ছিল এক বিশাল প্রযুক্তিগত ঝুঁকি।
প্রথমে লক্ষ্য ছিল প্রায় ৩৮ নট গতি। কিন্তু ১৯৭১ সালের পরীক্ষায় সেই সীমা ছাড়িয়ে ৪৪.৭ নটে পৌঁছে যায় K-222। দৈর্ঘ্যে ১০৬.৬ মিটার এই সাবমেরিনে প্রায় ৮২ জন নাবিক কর্মরত ছিলেন। শক্তিশালী রিঅ্যাক্টর ও বিশেষ নকশার জন্যই এই গতি সম্ভব হয়েছিল।
পানির ঘনত্ব বেশি হওয়ায় জলের তলায় এত দ্রুত গতি অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন। আধুনিক পারমাণবিক সাবমেরিন সাধারণত ২৫ নট গতিতে টহল দেয়। সেই তুলনায় K-222-এর গতি ছিল কৌশলগত দিক থেকে বিস্ময়কর। সোভিয়েত নৌবাহিনীর কাছে এর অর্থ ছিল, শত্রুপক্ষের বিমানবাহী রণতরীর সঙ্গে দ্রুত তাল মেলানো, থিয়েটার বদল করা, এমনকি তৎকালীন অনেক টর্পেডোর চেয়েও দ্রুত চলা।
কিন্তু এই গতিই শেষ পর্যন্ত কাল হয়ে দাঁড়ায়। বেশি গতি মানেই বেশি কম্পন, চাপ এবং শব্দ। পরীক্ষায় দেখা যায়, সর্বোচ্চ গতিতে সাবমেরিনের ভিতরের শব্দ প্রায় ১০০ ডেসিবেলে পৌঁছে যেত—যা রক কনসার্ট বা জ্যাকহ্যামারের সমান। দীর্ঘদিন এমন শব্দে কাজ করা নাবিকদের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর ছিল। আরও বড় সমস্যা ছিল সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে—এই শব্দে সাবমেরিনের গোপনীয়তা নষ্ট হচ্ছিল, শত্রুপক্ষের সোনারে ধরা পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছিল।
এই কারণেই প্রশ্ন ওঠে, এত সফল হওয়া সত্ত্বেও কেন আরও K-222 তৈরি হয়নি। ঠান্ডা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, একটু ধীর হলেও অত্যন্ত নীরব সাবমেরিন অনেক বেশি প্রাণঘাতী। তাই আধুনিক নৌবাহিনীগুলি এখন গতি নয়, বরং শব্দ কমানো ও সোনার এড়ানোর প্রযুক্তির উপর জোর দেয়।
আমেরিকার USS Seawolf সাবমেরিনের সর্বোচ্চ গতি আনুমানিক ৩৫ নট হলেও, তার আসল শক্তি গোপনীয়তা ও নীরবতায়। সেই তুলনায় K-222 ইতিহাসে থেকে গেছে এক অতুলনীয় প্রযুক্তিগত পরীক্ষা হিসেবে—যেখানে এক ভুলই ভবিষ্যৎ বদলে দিয়েছিল।
দেশের সব লেটেস্ট খবর ( National News in Bengali ) এবং বিদেশের সব খবর ( World News in Bengali ) পান নিউজ 18 বাংলায় ৷ দেখুন ব্রেকিং নিউজ এবং টপ হেডলাইন নিউজ 18 বাংলার লাইভ টিভিতে ৷ ডাউনলোড করুন নিউজ 18 বাংলার অ্যাপ অ্যান্ড্রয়েড এবং আইওএস-এ ৷ News18 Bangla-কে গুগলে ফলো করতে ক্লিক করুন এখানে ৷
Location :
Kolkata,West Bengal
First Published :
Jan 26, 2026 9:02 AM IST









