Home /News /explained /
Explained: সৌন্দর্য-রোমাঞ্চের শেষ কথা ! খাড়া পাহাড়ে গারতাং গলির কাঠের সেতু কেন পর্যটকদের এত প্রিয়?

Explained: সৌন্দর্য-রোমাঞ্চের শেষ কথা ! খাড়া পাহাড়ে গারতাং গলির কাঠের সেতু কেন পর্যটকদের এত প্রিয়?

গারতাং গলি, ইন্দো-তিব্বতীয় বাণিজ্যের জন্য ব্যবহৃত একটি প্রাচীন পথ এবং একটি খাড়া পাহাড়ে অবস্থিত।

  • Share this:

#নয়াদিল্লি: উত্তরাখণ্ড বরাবরই অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের সেরা পছন্দের গন্তব্য। ভ্রমণস্থানের তালিকায় সম্প্রতি উত্তরাখণ্ড যুক্ত করার আরেকটি কারণ রয়েছে। চার মাস শীতের বিরতির পর পর্যটকরা এখন গঙ্গোত্রী জাতীয় উদ্যানের (Gangotri National Park) মনোরম সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। উত্তরাখণ্ডের উত্তরকাশীর গারতাং গলিতে (Gartang Gali) সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং উত্তেজনাপূর্ণ ট্রেক উপভোগ করতে পারা যাবে- ঐতিহাসিক কাঠের সেতুও পর্যটকদের জন্য খুলে দিয়েছে উত্তরাখণ্ড সরকার। গারতাং গলি, ইন্দো-তিব্বতীয় বাণিজ্যের জন্য ব্যবহৃত একটি প্রাচীন পথ এবং একটি খাড়া পাহাড়ে অবস্থিত। স্কাইওয়াকের অভিজ্ঞতার স্বাদ দেওয়ার জন্য গারতাং গলি সংস্কার করে গত বছরের ১৭ অগাস্ট পর্যটকদের জন্য আবারও খুলে দেওয়া হয়েছিল। সেই থেকে এখানে ৫ হাজারের বেশি পর্যটক এসেছেন।

গঙ্গোত্রী জাতীয় উদ্যানের বৈশিষ্ট্য কী?

গঙ্গোত্রী জাতীয় উদ্যান দেশের সবচেয়ে উচ্চতায় অবস্থিত বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যগুলির মধ্যে একটি। ভাগীরথী নদীও পার্কের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, যা এই অঞ্চলের প্রাণী ও পাখির প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখে। পার্কটি এটি ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং এটি ১ হাজার ৫৫৩ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। জাতীয় উদ্যানের তুষার-ঢাকা পর্বতশৃঙ্গ, বিভিন্ন ঝরনা, জলপ্রপাত এবং সুন্দর দেবদারু, ফার এবং ওক গাছের গহিন অরণ্য মন মুগ্ধ করে দেবে। এই গন্তব্যের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করার সেরা সময় হল এপ্রিল থেকে অক্টোবর। এখানে কিছু বিপন্ন প্রজাতির জীবজন্তুর বসবাস, যেমন নীল ভেড়া (Blue Sheep), কালো ভাল্লুক (Black Bear), বাদামী ভাল্লুক (Brown Bear), হিমালয়ান মোনাল পাখি (Himalayan Monal), হিমালয়ান স্নোকক (Himalayan snowcock), হিমালয়ান তাহর (Himalayan Tahr), কস্তূরী হরিণ (Musk Deer) এবং স্নো লেপার্ড (Snow Leopard)। জানা যায়, এখানে ১৫০ প্রজাতির পাখি এবং প্রায় ১৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী রয়েছে। হিমালয়ান বারবেট, আইবেক্স, টাইগার, থার, সেরো, তিতির, তিতির, ঘুঘু, কবুতর, প্যারাকিট, বুলবুল ইত্যাদি এখানে দেখা যায়।

গারতাং গলির মূল আকর্ষণ ঠিক কোথায়?

এটি হল একটি ঐতিহাসিক ৫০০ মিটার লম্বা কাঠের সিঁড়ি, যা ভারত-চিন সীমান্তের কাছে নেলং উপত্যকায় অবস্থিত। এটা বিশ্বাস করা হয় যে গারতাং গলি পেশোয়ারি পাঠানদের (Peshawari Pathans) দ্বারা নির্মিত হয়েছিল এবং ঐতিহাসিক তালে তিব্বতি বণিকরা ভারত ও তিব্বতের মধ্যে যাতায়াতের ক্ষেত্রে একটি পথ হিসাবে এই গারতাং গলি ব্যবহার করত। তিব্বতি বণিকরা দর্জি নামেও পরিচিত। লবণ, গুড়, মশলা, সোনা এবং পশমিনা পশমের ব্যবসা করার জন্য তারা সিমলা মান্ডি হয়ে উত্তরকাশী পৌঁছানোর জন্য গারতাং গলি ব্যবহার করত। গঙ্গোত্রী ন্যাশনাল পার্কের গোমুখ-তপোবন এবং কালান্দি-সহ অন্যান্য ট্র্যাকগুলির মধ্যে গারতাং গলির বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে। গঙ্গোত্রী পার্কে গোমুখ-গঙ্গোত্রী-তপোবন, কালান্দি, গারতাং গলি, কেদারতাল থেকে বাসুকিতাল পর্যন্ত ট্রেকিং রুট রয়েছে। এছাড়াও ভৈরোঘাটি থেকে নেলং পর্যন্ত যানবাহন চলাচল করে। কোভিড অতিমারীর (Covid-19 Pandemic) কারণে পর্যটন স্পটটি দীর্ঘ দিন বন্ধ ছিল। গত বছরের অগাস্টে তা আবারও খুলে দেওয়া হয়।

ক্রমবর্ধমান পর্যটকের সংখ্যা: গারতাং গলিতে গত মরসুমে ৫ হাজার ৪৫৭, গঙ্গোত্রী-গোমুখ-তপোবনে (Gangotri-Gaumukh-Tapovan) ২ হাজার ৩৫৩, কালান্দি ট্রেকে (Kalandi Trek) ১৬৫, কেদারতাল থেকে বাসুকিটাল ট্রেকে ৩৯১ এবং ভৈরোঘাটি থেকে নেলঙে (গাড়িতে) ১ হাজারের বেশি পর্যটক এসেছিলেন। এই সমস্ত স্থান ১ এপ্রিল থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত আট মাস খোলা থাকে। নতুন মরসুম এই মাসের শুরুতে শুরু হয়েছে এবং পার্ক কর্তৃপক্ষ এবার গারতাং গলিতে আরও বেশি পর্যটক আসবে বলে আশা করছে।

ট্রেকিংয়ের পথে কী কী দেখা যাবে?

গারতাং গলি ট্রেকিংয়ের জন্য ২ কিলোমিটার পথ লঙ্কা ব্রিজ (Lanka Bridge) থেকে শুরু হয়, যা উত্তরকাশী জেলা সদর থেকে ৯০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। মাঝারি এবং খাড়া ট্রেকের মিশ্রণে পথটি ঘন দেওদার (হিমালয় সিডার) এবং কাইল (পিনাস রক্সবুর্গি) বনের মধ্য দিয়ে যায়। অতিথিরা ভাগ্যবান হলে তাঁরা হিমালয়ের নীল ভেড়া এবং হিমালয়ের ছাগলের দেখা পেতে পারেন। এছাড়াও নেলং উপত্যকায় স্নো লেপার্ডেরও আবাস রয়েছে, তবে তাদের দেখা পাওয়া খুবই বিরল। পথটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১০ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত।

কাঠের পথের গুরুত্বই বা ঠিক কোথায়?

মনোরম নেলং উপত্যকায় অবস্থিত কাঠের তৈরি সেতুটিই আকর্ষণের প্রধান কেন্দ্র। এই পথটি ১৩৬ মিটার দীর্ঘ এবং ১.৮ মিটার চওড়া। সারিবদ্ধ সিঁড়িটির একটি অপূর্ব ব্যঞ্জনা রয়েছে। কাঠের তৈরি সিঁড়ি বা সেতু থেকে নেলং উপত্যকার অতুলনীয় দৃশ্য চোখে পড়বে। ১৯৬২ সাল পর্যন্ত তিব্বতের সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যের জন্য এই পথ ব্যবহৃত হয়েছিল। কিন্তু ভারত-চিন যুদ্ধের (1962 India-China War) পর থেকে কাঠের কাঠামোটি অব্যবহৃত এবং সম্পূর্ণ অবহেলায় ছিল। সেনাবাহিনী (Indian Army) এবং উত্তরকাশীর নেহরু ইনস্টিটিউট অফ মাউন্টেনিয়ারিংয়ের (Nehru Institute of Mountaineering) দলগুলো ছাড়া খুব কমই লোক এটির ব্যবহার করত।

কাঠের কাঠামোর প্রশংসা করে জি শাহ (G Shah) তাঁর 'ঈশ্বরের বাসস্থান: উত্তরাখণ্ড' (Abode of Gods: Uttarakhand) বইতে লিখেছেন “জাধ গঙ্গার উৎস পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য আমাদের উজানে যেতে হবে। পথটি ভাল, প্রাথমিক ভাবে বিপজ্জনক। পথটি একটি বিশাল পাথুরে মুখের উপর অবস্থিত, যার নিচে জাধ গঙ্গা (Jadh Ganga) তীব্র গতিতে প্রবাহিত হয়। কিন্তু মানুষের বুদ্ধিমত্তা পাথরের উপর লোহার বার লাগিয়ে এবং তার উপর কাঠের তক্তা লাগিয়ে অলৌকিক কাজ করেছে। এটি গারতাং গ্যালারি নামে পরিচিত।"

প্রযুক্তিগতভাবে একে পথ বলা যায়?

এটি বিশ্বাস করা হয় যে কাঠের পথটি এক শতাব্দীরও বেশি পুরনো। তবে এই দাবির উপর কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় না। কাঠের তক্তাগুলি বন্ধুর পথে জীবনের একটি নতুন উদ্যম প্রদানের জন্য প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল। রাস্তাটির সংস্কারের ভার পড়েছিল ঠিকাদার রাজপাল বিস্তের সংস্থার উপরে। তিনি বলেছেন, "প্রথমটি ১২ মিটার এবং অন্যটি ২৪ মিটার- গারতাং গলি একটি সেতু হিসাবে কাজ করে এবং বাকি অংশতে শক্ত পাথর কেটে পথ তৈরি করা হয়েছে।"

গারটং গালিতে হাঁটা কতটা সহজ?

এই পথ দিয়ে হাঁটতে হলে সাহস লাগবে। সাহসী পর্যটকরাও ধীরে ধীরে হেঁটে যান এই পথে। ২০০ মিটার নিচে জাধ গঙ্গা নদীর প্রবলভাবে প্রবাহিত হওয়া উপর থেকে দেখলে রক্ত শীতল হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। পর্যটকরা কাঠের পথের শেষ বিন্দুর বাইরে যেতেও পারেন না।

পর্যটকদের কী মাথায় রাখতে হবে?

ট্রেক রুট সাধারণত সুখী ভ্রমণের জায়গা নয়। যাঁরা ট্রেক করতে ভালবাসোন, তাঁরা কেবল পছন্দ করেন প্রকৃতির সান্নিধ্য। এই পাহাড়ি পথও সেরকম তো বটেই, একটু বেশি দুর্গমও বা! গারতাং গালি ট্রেক রুটে কোনও ক্যান্টিন, ধাবা, ক্যাফে এবং বাসস্থান এলাকা নেই। তাই জল-সহ অন্য জরুরি প্রয়োজনীয় জিনিস বহন করতে হবে। বর্ষাকালে ছাতা, রেইনকোট সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। ২ কিমি পথে কোনও শেড নেই। ধীরে ধীরে হাঁটতে হবে। সেতুর উপর বেশি নড়াচড়া করা মোটেই কাজের কাজ নয়। হাঁটার জন্য স্পোর্টস জুতো ও এবং ট্র্যাক প্যান্ট ব্যবহার করলে আরাম লাগবে। সেলফি এবং ছবি তোলার জন্য একটি নিরাপদ স্থান নির্বাচন করতে হবে।

গারতাং গলিতে যেতে হলে কি টিকিট কাটতে হয়? তার দাম কত? যে কোনও জাতীয় উদ্যানেই ভ্রমণের জন্য একটা নির্দিষ্ট মূল্যের টিকিট কাটতে হয়, গারতাং গলিও তার ব্যতিক্রম নয়। ভারতীয়দের জন্য জনপ্রতি ১৫০ টাকা এবং বিদেশিদের জন্য ৬০০ টাকা। গুরুতর অসুস্থ, হার্টের সমস্যা থাকা লোকজনের ট্রেক করা এড়িয়ে চললেই ভালো।

নতুন করে উন্নয়নের কারণ কী?

১৯৬২ সালের যুদ্ধ জাদং এবং নেলংয়ের গ্রামবাসীদের তাদের শীতকালীন গ্রাম দুন্ডা এবং বাগোরিতে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করতে বাধ্য করেছিল। কিন্তু এখন ভারত সরকার তাদের সীমান্তবর্তী গ্রামে জাদ ভোটিয়াদের পুনর্বাসনের জন্য নতুন প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এমনকী ভৈরোঘাঁটি-নেলং রুটটি কার্যকরী হওয়ায় পুরনো ট্রেক রুটটি আবারও চালু করার একটা সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যান্য স্কাইওয়াকের সঙ্গে গারতাং গলির পার্থক্য কোথায়?

ভারতীয় পর্যটন মানচিত্রে স্কাইওয়াক একটি নতুন ধারণা। দেশের অন্যান্য স্কাইওয়াকের তুলনায়, গারতাং গালি সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা দেয়। বন্য অঞ্চলে ট্রেকিং করা এবং একটি প্রাচীন কাঠের সেতুর উপর দিয়ে হাঁটার এমন নিবিড় অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণতই বিরল!

First published:

Tags: Gartang Gali

পরবর্তী খবর