• Home
  • »
  • News
  • »
  • entertainment
  • »
  • জঙ্গলে বাঁচা-মরা স্থির করেন তিনিই! বনজীবী মানুষের আরাধ্য দেবী 'বনবিবি'

জঙ্গলে বাঁচা-মরা স্থির করেন তিনিই! বনজীবী মানুষের আরাধ্য দেবী 'বনবিবি'

জঙ্গলে বাঁচা-মরা স্থির করেন তিনিই! বনজীবী মানুষের আরাধ্য দেবী 'বনবিবি'

জঙ্গলে বাঁচা-মরা স্থির করেন তিনিই! বনজীবী মানুষের আরাধ্য দেবী 'বনবিবি'

জঙ্গলে বাঁচা-মরা স্থির করেন তিনিই! বনজীবী মানুষের আরাধ্য দেবী 'বনবিবি'

  • Share this:

    রুদ্র নারায়ন রায়, দক্ষিণ ২৪ পরগনা: জঙ্গলজীবী মানুষের আরাধ্য দেবতা তিনি। লোককথা দেবীর ইচ্ছাতেই জঙ্গলে বাঁচা-মরা স্থির হয়। তাঁর পুজোয় এক হয়ে যায় হিন্দু-মুসলমান। জঙ্গল ঘেরা সুন্দরবনের আরাধ্যা দেবী বনবিবি। জঙ্গলকে কেন্দ্র করেই সুন্দরবনের বড় অংশের মানুষের জীবন যাপন। আর এই জঙ্গল নির্ভর জীবনে প্রতি পদে অপেক্ষা করে ভয়ঙ্কর সব বিপদ। সেই বিপদ থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতেই জঙ্গলজীবী মানুষেরা আরাধনা করেন দেবী বনবিবির। সেই আরাধনায় ভেদ নেই ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায়ের। হিন্দু-মুসলমান মিলেই পুজোর আয়োজন করেন তারা। এমনকি, হিন্দু মন্দিরে বনবিবির পুজো করেন মুসলমান পীর-ও। বনবিবিকে নিয়ে নানা মিথ ছড়িয়ে আছে সুন্দরবনের আনাচে কানাচে। লোকগাথা অনুযায়ী তিনি আসলে মানবী। সেই মানবীর দেবী হয়ে ওঠার পিছনে রয়েছে এক কাহিনী। আসলে নাকি তিনি আরবের বাসিন্দা ইব্রাহিমের মেয়ে। বিয়ের বেশ কয়েক বছর পরেও ইব্রাহিম ছিলেন নিঃসন্তান। সন্তান লাভের আশায় তিনি দ্বিতীয় বার বিয়ে করেন। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী গুলাল বিবি অচিরেই সন্তানসম্ভবা হন। কিন্তু প্রথম স্ত্রীর প্ররোচনায় গুলাল বিবির উপর সন্দেহ দানা বাধে ইব্রাহিমের। সন্তানসম্ভবা দ্বিতীয় স্ত্রীকে তিনি রেখে আসেন সুন্দরবনের জঙ্গলে। সেখানে যমজ দুই ছেলে মেয়ে হয় গুলালের। তবে প্রসবের সঙ্গে সঙ্গে গুলাল বিবি মারা যান। জঙ্গলের জানোয়ারদের তত্ত্বাবধানেই বেড়ে উঠতে শুরু করে শিশুদু’টি। অনেকে বলেন, পরে শিশুদুটিকে ফিরিয়ে এনেছিলেন ইব্রাহিম। কিন্তু জঙ্গলের টানে তারা আবার ফিরে আসে। অনেকে আবার বলেন, মেয়েকে ফেলে শুধু ছেলেকে নিয়ে চলে এসেছিলেন ইব্রাহিম। কিন্তু সেই ছেলে পরে আবার ফিরে যায় জঙ্গলে দিদির কাছে। ইব্রাহিম ও গুলাল বিবির সেই মেয়েই বনবিবি। ভাই শাহ জঙ্গুলিকে নিয়ে বনেই বাস করতে শুরু করেন তিনি। জঙ্গলের মানুষের সমস্যায় হয়ে ওঠেন পরিত্রাতা। ক্রমে জঙ্গলে দাপট বাড়তে থাকে বনবিবির।সেই সময় সুন্দরবনের জলে জঙ্গলে রাজ করতেন দক্ষিণ রায়। প্রচলিত মতে তাঁকে বাঘের দেবতা ধরা হয়। দক্ষিণ ২৪ পরগনার অনেক জায়গায় দক্ষিণ রায়েরও পুজো হয়। জঙ্গলের অধিকার নিয়ে সেই দক্ষিণ রায়ের সঙ্গে দ্বন্দ্ব বাধে বনবিবির। ক্রমে দ্বন্দ্ব বাড়ে। যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। মহিলা বলে দক্ষিণ রায় তাঁর মা নারায়ণীকে পাঠান বনবিবির সঙ্গে যুদ্ধ করতে। সেই যুদ্ধে বনবিবি নারায়ণীকে পরাস্ত করেন। পরে দু’জনের সন্ধি হয়। জল-জঙ্গলের অধিকার নিয়ে একটা সমঝোতায় আসেন দু’জন। সেই সমঝোতা অনুযায়ী জঙ্গলের অধিকার পান দক্ষিণ রায়। আর জঙ্গল লাগোয়া বসতির দখল থাকে বনবিবির হাতে।এভাবেই চলতে থাকে। বনবিবির দাপটে জঙ্গলের বাইরে বেরোনো বন্ধ হয়ে যায় দক্ষিণ রায়ের। জঙ্গল লাগোয়া বসতিতে তাঁর প্রভাব কমে। একসময় বাঘ বেশে এইসব বসতি থেকেই শিকার সংগ্রহ করতেন দক্ষিণ রায়। বনবিবির জন্য বন্ধ হয়ে যায় সেসবও। লোকগাথা অনুযায়ী, সেই সময় একদিন ধনা এবং মনা নামে দুই মৎস্যজীবীকে স্বপ্নাদেশ দেন দক্ষিণ রায়। গ্রাম থেকে এক শিশুকে জঙ্গলে নিয়ে যেতে বলেন। ধনা ও মনা গ্রাম থেকে দুখে নামে এক শিশুকে নিয়ে জঙ্গলে যায়। বাঘরূপী দক্ষিণ রায় দুখেকে খেতে উদ্যত হয়। কথিত আছে, দুধের শিশুকে জঙ্গলে পাঠানোর সময় তার মা বলে দিয়েছিলেন জঙ্গলে তার আর এক মা আছে। বিপদে পড়লে সেই জঙ্গলের মা বনবিবিকে স্মরণ করতে। দুখে তাই করে। বনবিবি এসে দক্ষিণ রায়ের কবল থেকে উদ্ধার করে দুখেকে কোলে তুলে নেন। ক্ষেপে যান দক্ষিণ রায়। বনবিবিকে জানিয়ে দেন, শর্ত অনুযায়ী জঙ্গলের মধ্যে তাঁর যা ইচ্ছে করার অধিকার রয়েছে। বনবিবি পাল্টা বলেন, জঙ্গলের বাইরের মানুষকে ডেকে নিয়ে এসে মেরে ফেলার অধিকার তাঁর নেই। দ্বন্দ্ব থেকে দু’জনের যুদ্ধ বাধে।সেই যুদ্ধে বনবিবি দক্ষিণ রায়ের গলা কেটে দেন। গলা কাটা দক্ষিণ রায়ের সেই মুখ বারা মূর্তি হিসেবে পরিচিত। গাঁয়ে গঞ্জে অনেক জায়গায় বাড়ির বাইরে সেই বারা মূর্তির পুজো হয়। ওই ঘটনার পর বনবিবির উপর আস্থা বাড়ে জঙ্গল লাগোয়া এলাকার মানুষের। তাঁরা বুঝে যান, ভয়ঙ্কর বাঘ বা জঙ্গলের বিপদের হাত থেকে তাঁদের বাঁচাতে পারেন একমাত্র বনবিবিই। তাঁরা বনবিবিকে দেবীরূপে পুজো করা শুরু করেন। এখনও প্রতিবছর মাঘ মাসের এক তারিখ বনবিবির পুজো হয় সুন্দরবনের নানা জায়গায়। মেলা বসে। অনেক জায়গায় চৈত্র-বৈশাখ মাস নাগাদও বনবিবির পুজো উপলক্ষে মেলা বসে। সুন্দরবন এলাকার বাইরেও উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার অনেক জায়গাতেই বনবিবির পুজো হয়। বহু জায়গায় তিনি পরিচিত বিবিমা নামে। ছোট্ট দুখেকে রক্ষা করেই তিনি দেবীর মর্যাদা পান। তাই বনবিবির মূর্তিতে দেবীর কোলেই থাকে শিশু দুখে। সঙ্গে থাকেন বনবিবির ভাই শাহ জঙ্গুলিও।নদীতে মাছ-কাঁকড়া ধরতে যাওয়া মৎস্যজীবীরা নিত্য পুজো করেন বনবিবির। সুন্দরবনের মৎস্যজীবীরা সাধারণত নৌকায় চেপে দল বেধে মাছ-কাঁকড়া ধরতে যান। একবার বেরিয়ে চার-পাঁচ দিন বা কখনও দশ-বারো দিন পরে ফেরেন। সাধারণত প্রতিটি দলে পুজো-আচ্চার জন্য একজন বিশেষ সদস্য থাকেন। যাত্রা শুরুর আগে নৌকায় পুজো হয়। জঙ্গলে যেখানে মাছ ধরা হয়, সেখানে নেমেও তিনি আগে বনবিবির আরাধনা করেন। স্থানীয় ভাবে একে বলা হয় বন বাঁধা। মৎস্যজীবীদের বিশ্বাস, একবার বন বাঁধা হয়ে গেলে সেখানে আর বাঘের আক্রমণ হয় না। ঠিকমতো বন বাঁধা না হলে বা বনবিবি তুষ্ট না হলেই বাঘের আক্রমণের ঘটনা ঘটে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।সুন্দরবনের সংস্কৃতির সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছেন বনবিবি। বনবিবির আখ্যান নিয়ে একানি পালার চল রয়েছে সুন্দরবন ও লাগোয়া এলাকায়। চৈত্র-বৈশাখ মাসে অনেক জায়গায় বনবিবির যাত্রা, পালাগানের আসর বসে।

    Published by:Pooja Basu
    First published: