হোক 'হামি'

হোক 'হামি'
film still

হোক 'হামি'

  • Share this:

    #কলকাতা: 'মিস আমি প্রেগন্যান্ট!'

    ইন্টারমিশন...

    কথাটা বলছে ক্লাস ওয়ান-এর একটি মেয়ে! তাও স্কুলে, ক্লাসভর্তি স্টুডেন্টের সামনে, তার ক্লাস টিচারকে!


    নন্দনে চলছিল পরিচালক জুটি শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, নন্দিতা রায়ের 'হামি'র প্রিমিয়ার। নন্দনে ইন্টারমিশন হয় না! কাজেই সিনেমা চলতে থাকল! কিন্তু ওই শকটা তখনও বোধহয় নিতে পারেননি অনেক দর্শক! আসেপাশে গুজগুজ ফুসফুস শোনা যাচ্ছে। অনেকেই নড়েচড়ে বসছেন! সিটের ক্যাচর ম্যাচর আওয়াজ! ভাবটা এমন-- কী হচ্ছে এসব? বাচ্চাদের মুখে এসব কী কথা?

    সত্যি তো বাচ্চাদের মুখে এসব কথা কি শোভা পায়? পায় না না? কিন্তু কেন না? যদি বাচ্চারা বাড়িতে এই কথাগুলো শোনে, ওরা তো সেটা শিখবে, বলবেও! আর তাতে তো কোনও মহাভারত অশুদ্ধ হচ্ছে না! এই যেমন ছবির শুরুতেই একটা বাচ্চা স্কুলের চাইল্ড কাউন্সিলর (অপরাজিতা আঢ্য)কে বলল, তার নাকি 'টিপসি' লাগছে। গতকাল বাবার স্কচ শুঁকেছে। বাড়ির পরিচারিকা বলেছে স্কচ শুঁকলেও নাকী টিপসি লাগে!

    খুব সহজ, সুন্দরভাবে অপরাজিতা বাচ্চাটিকে বুঝিয়ে দিলেন, গাড়ি চালানোর লাইসেন্স পাওয়ার যেমন একটা নির্দিষ্ট বয়স আছে, তেমনি 'টিপসি' হওয়ার লাইসেন্স পাওয়ারও একটা বয়স আছে! ব্যস! সমস্যার সমাধান!

    আসলে বাচ্চারা তো 'স্পাঞ্জ'-এর মতো! যা দেখবে, যা শুনবে, তাই শুষে নেবে! ওরা যানে না, কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল! ওদের ঠিক পথে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব বড়দের। কিন্তু, সেটা করতে হয় বাচ্চাদের মতো করেই! বাচ্চাকে 'কালচারড' তৈরি করছি, 'সেফ' রাখছি...এই প্রচেষ্টায় আখেরে কিন্তু অনেক মা-বাবা সন্তানদের ক্ষতিই করে বসেন! ওদের থেকে শৈশব কেড়ে নেন! নিজেদের অযথা জটিল মানসিকতার শিকার করেন বাচ্চাদের! আর স্বান্তনা দেন কীভাবে? আমি আমার সন্তানের ভালর জন্য এটা করছি!

    কিন্তু শিশুরা তো ফুলের মতো নিষ্পাপ, তুলতুলে! ওখানে নোঙড়া, ময়লা, ক্লাস, স্ট্যাটাস সিম্বল, জাত-পাত কোনও কিছুই দাগ কাটে না! ওরা বোঝে শুধু ভালবাসা! আর ওদের এই মানসিকতাটা বিকৃত করবেন না! ওদেরকে ওদের মতো থাকতে দিন, ভাবতে দিন! 'হামি'র মধ্যে দিয়ে দর্শকের কাছে এই বার্তাই পৌঁছে দিলেন শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, নন্দিতা রায়।

    এই জুটির এখনও পর্যন্ত সেরা ছবি 'হামি'! ছোটরা বড়দের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, তাদের মলীন, নিচু, কষ্ট-কল্পিত জীবনের সদস্য তারা নয়! হতেও চায় না! বড়রা ছোটদের চড় মারে! এবার উলটো হল! ছোটরা সপাটে চড় মারল বড়দের গালে! এবং ন্যায্য কারণে! বড়রা মাথা নীচু করে সেই চড় খেল!

    তিনটে পরিবার আর তিনটে বাচ্চা নিয়ে গড়িয়েছে 'হামি'র চিত্রনাট্য! লাল্টু বিশ্বাস (শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়), মিতালী বিশ্বাস (গার্গী রায়চৌধুরী) ও তাদের একমাত্র ছেলে বোধিসত্ত্ব ওরফে ভুটু (ব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়) ! দিল্লি ফেরত সৃঞ্জয় সেন (সুজন মুখোপাধ্যায়), রীনা সেন (চূর্ণি গঙ্গোপাধ্যায়) ও তাঁদের মেয়ে তনুরুচি, ডাকনাম চিনি (তিয়াসা পাল)। আর তৃতীয় পরিবার-- দিলিপ রক্ষিত (খরাজ মুখোপাধ্যায়), শ্যামলী রক্ষিত (কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়) ও তাদের ছেলে অজাতশত্রু (অভিরাজ করণ)।

    'হামি' শিবপ্রসাদ, নন্দিতার ২০১৪'র ছবি 'রামধনু'র সিক্যুয়েল। যেখানে 'রামধনু' শেষ হয়েছিল সেখান থেকেই শুরু 'হামি'। 'রামধনু'র লালটু আর মিতালী এখন রীতিমতো অবস্থাপন্ন। ফার্নিচারের ব্যবসা করে ফুলেফেপে উঠেছে তাদের ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স আর লাল্টুর ভুঁড়ি! ছেলেকে বড় স্কুলে ভর্তি করেছে। কিন্তু উঠতি বড়লোক হলেও, ছাপোসা মধ্যবিত্ত মানসিকতাগুলো গায়ে লেগে রয়েছে। মিতালী ইক্কতের দামী সালোয়ার পরে ঠিকই, কিন্তু পায়ে নীল মোজা, এবং তারউপর স্ট্র্যাপ দেওয়া জুতো! তবে, মিতালী বেশ লড়াকু । উল্টো মেরুতে লালটু! পেটরোগা, অ্যাসিডিটি-তে ভোগে, ভয় পায়!

    মিস্টার এ্যন্ড মিসেস সেন আবার ভীষণ পলিশড, রাতে ওয়াইন খান, খুশি হলে শ্যামপেইন! বেশিরভাগ কথাই বলেন ইংরেজিতে! আর তৃতীয় জন, মানে রক্ষিত পরিবারের দিলীপ রক্ষিত স্থানীয় কাউনসিলর! তাঁর স্ত্রী শ্যামলী দজ্জাল! মীতালির সঙ্গে আদায় কাচকলায় সম্পর্ক!

    এই তিন পরিবারের বাচ্চারা একই স্কুলে পড়ে। বোধিসত্ত্ব ও তনুরুচি 'বেস্ট ফ্রেন্ড'! সব ঠিকঠাকই চলছিল! মাঝে গোল বাধল একটা হামি নিয়ে। ভুটু ফ্রেন্ডশিপ ডে-তে নিছক খেলাচ্ছলে চিনির গালে একটা হামি খেয়ে বসল! আর সেই খবরটা মুহূর্তে রটিয়ে দিল অজাতশত্রু! ব্যাস! শুরু হয়ে গেল ধুন্ধুমার কাণ্ড! রে-রে করে উঠল বড়রা! কিন্তু কীভাবে একটা 'হামি'-ই বড়দের চোখের ঠুলি সরিয়ে দেবে, সেটাই ফুটে ওঠে ছবির ক্লাইম্যাক্সে!

    নির্মেদ চিত্রনাট্য। ঝরঝরে ডায়ালগ। প্রাসঙ্গিকভাবে কলকাতার একটি নামীদামি স্কুলে সদ্য ঘটে যাওয়া এক বাচ্চা মেয়েকে যৌন হেনস্থার ঘটনা তুলে ধরেছেন পরিচালক! দশর্কের কাছে প্রশ্ন তুলে ধরেছেন, আমরা কী সবসবময় ভেবেচিন্তে, সঠিক বিচার করে কাউকে দোষী তকমা দিই? না কি অনেকসময়েই স্রেফ কল্পনা বা 'হতে পারে' এমনটা ভেবে কারওর জীবন, ইমোশন নিয়ে ছিনিমিনি খেলি! প্রশ্ন উঠেছে মিডিয়ার দায়িত্ব নিয়েও! চ্যানেলের টিআরপি বাড়াতে, 'যৌন হেনস্থার অভিযোগ উঠেছে' বলে প্রাইমটাইমে খবর তো টেলিকাস্ট করে দেওয়া হয়, কিন্তু তার আগে কি একবারও খতিয়ে দেখা হয়, আদৌ অভিযোগটার কোনও ভিত্তি আছে কী না?

    ছবির মূল ইউএসপি-- ভুটু আর চিনি! গোটা ছবি জুড়ে ওদেরকে দেখার পরও যেন মন ভরে না! ওইটুকু দুটো বাচ্চা এত সাবলীল অভিনয় করল কী করে? নাহ! ভুল বলা হল! ওরা তো অভিনয় করেনি! ওরা নিজের মনটাকেই তুলে ধরেছে। ওরা তো টাটকা। ভেজাল নেই! আর তাই এত নিখাদ!

    শিবপ্রসাদ বেশ মজার! চূর্ণি সাবলীল! সুজনের তেমন কিছু করার ছিল না! খরাজ দুর্দান্ত! তবে, গার্গী আর কনীনিকা বড্ড বেশিই লাউড! তাদের চরিত্রটা যে মারকাটারি, যাকে চলতি ভাষায় বলে দাঙ্গাড়ে, সেটা বোঝাতে গিয়ে একটু ওভারঅ্যাকটিং করে ফেলেছেন! স্কুল বাসের কেয়ারটেকার 'চাচাজান'-এর চরিত্রে মাসুদ আখতার অসামান্য! অপরাজিতা আঢ্য খুব স্বাভাবিক অভিনয় করেছেন, ক্লাস টিভারের চরিত্রে দেবলীনা কুমারও বেশ ভাল!

    যার কথা না বললে সম্পূর্ণ হবে না, তিনি তনুশ্রী শঙ্কর! স্কুলের প্রিন্সিপালের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তাঁর অভিনয় নিয়ে কিছু বলার নেই, খালি এটুকুই বলার, 'এলিগ্যান্স'-এর আরেক নাম তনুশ্রী শঙ্কর!

    অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায় গানগুলো খুব মিষ্টি, সহজ! আর হ্যাঁ, অনেকদিন বাদে বাংলা গানেরও মানে বোঝা গেল! মানে, ইদানীংকালে তো বাংলা গান যত দুর্বোধ্য, তত হিট!

    সিনেম্যাটোগ্রাফি আলাদা করে কোনও ছাপ ফেলে নি! সবশেষে এটাই বলার, হোক 'কলরব', হোক 'আলিঙ্গন'-এর পর, এবার হোক 'হামি'! সমাজটা অনেক বেশি সুন্দর হবে!

    First published:

    লেটেস্ট খবর