বেলঘরিয়ার বাসিন্দা শিশু তিনটির বাবা-মা তাদের অত্যাচার করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে বলে বেলঘরিয়া থানায় ২০২৩ সালের মার্চ মাসে অভিযোগ দায়ের করেন বেলঘরিয়ার এক ব্যক্তি। সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ এফআইআর দায়ের করে এবং তিন শিশুকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার পর তাদেরকে শিশু কল্যাণ কমিটির হাতে তুলে দেয়। ২০২৩ সালের জুন মাসেই বাচ্চাদের নিজের কাছে ফেরত চেয়ে চাইল্ড ওয়েল ফেয়ার কমিটির কাছে আবেদন জানিয়েছিল শিশু কন্যাগুলির বাবা। একাধিক বার আবেদন জানিয়েছেও কোনও সমাধান সূত্র না পেয়ে অবশেষে কলকাতা হাইকোর্টে গত বছর হেবিয়াস করপাসের মামলা করেন তিনি।
advertisement
তাঁর বক্তব্য, তাদেরই প্রতিবেশী এক ব্যক্তি নিজের কোনও সন্তান না থাকায় ঈর্ষার কারণে সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করে থানায়। তারা বাচ্চাদের পর্যাপ্ত আদর যত্ন করেন। তিন বাচ্চার সব থেকে বড় যে তার বয়স ১১ বছর, ৮ বছর ও ৬ বছর। একজন সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী, একজন তৃতীয় শ্রেণির আর ছোট শিশুটি প্রথম শ্রেণির।
বড় মেয়েটি পড়া না করতে পারায় তার মা তাকে মারে এবং ঘর থেকে বের করে দেয়। প্রতিবেশী এক ব্যক্তি ২০২৩ সালের ৯ মার্চ সন্ধ্যে সাড়ে আটটার সময় বাচ্চাদের অত্যাচার করে, লাথি মেরে বের করে দিয়েছে বলে লিখিত অভিযোগ করেন বেলঘরিয়া থানায়। থানা সমস্ত কিছু খতিয়ে না দেখেই তাদের বিরুদ্ধে শিশু অধিকার সুরক্ষা আইনের ৭৫ ধারায় অভিযোগ দায়ের করে। কোনও আদালতের নির্দেশ ছাড়াই পুলিশ শিশু তিনজনকে চাইল্ড ওয়েল ফেয়ার কমিটির হাতে তুলে দেয়। ওই ব্যক্তি জানতে পারেন তাদের কমিটির সল্টলেকের একটি হোমে রাখা হয়েছে। পরে সেখান থেকে অন্য হোমে সরিয়ে দেওয়া হয়। তারপর আর খোঁজ পাননি কোন হোমে রাখা হয়েছে।
কলকাতা হাইকোর্টে মামলা দায়ের হলে দুই বিচারপতির বেঞ্চ রাজ্যের কাছে রিপোর্ট তলব করে। চাইল্ড ওয়েল ফেয়ার কমিটি আদালতে যে রিপোর্ট দেয়, তাতে জানানো হয়, বাচ্চা গুলোকে যখন তাদের হাতে তুলে দিয়েছিল পুলিশ, তখন তারা রীতিমতো আতঙ্কিত ছিল। তাদের উপর অত্যাচারের ছাপ স্পষ্ট ছিল। তারা ভাল করে কথা পর্যন্ত বলতে পারছিল না।
বিচারপতি দেবাংশু বসাকের ডিভিশন বেঞ্চ গত ২৭ জানুয়ারি শুনানিতে তিনটি শিশুকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পাশাপাশি শিশু কন্যা তিনটির বাবা মাকেও আদালতে ডাকা হয়। দুই বিচারপতি বাচ্চাদের ডেকে তাদের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের মনের কী ইচ্ছা জানতে চান। তারা আদৌ বাড়ি ফিরতে চায় কিনা, বাবা-মায়ের কাছে থাকতে চায় কিনা। তারা কে কোন স্কুলে পড়তে চায়, সে ব্যাপারেও জানতে চান বিচারপতি।
তিন শিশুই আদালতেই কেঁদে ফেলে এবং তারা জানায়, বাবা-মায়ের কাছে ফিরতে চায়। বিচারপতিদ্বয় নির্দেশে জানিয়েছেন, বাচ্চারা আজকেই বাবা-মায়ের হাত ধরে আদালত থেকে সরাসরি বাড়ি ফিরবে। তবে বাবা- মাকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, তারা যেন বাচ্চাদের আদর-যত্নে খামতি না রাখে। অত্যাচার যেন না করা হয়। মামলায় রাজ্যের পক্ষে সওয়ালকারী আইনজীবী বিবেকানন্দ বোস ও তীর্থঙ্কর দে জানিয়েছেন, “রাজ্য প্রথম থেকে চাইছিল বাচ্চারা যাতে তাদের পরিবারে বাবা-মায়ের কাছে ফিরতে পারে। বাচ্চাদের স্বার্থই রাজ্যের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।”
