১৯৭৩ সালের ২৭ নভেম্বর রাতে তাঁর সঙ্গে এক ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। তার পর তিনি ৪২ বছর ধরে প্রায় অচেতন অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলেন। খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে সব কিছুর জন্যই তাঁকে অন্যের উপর নির্ভর করতে হত।
খবর অনুযায়ী, একই হাসপাতালের ওয়ার্ড বয় সোহনলাল ভাল্মিকি অরুণার উপর ক্ষুব্ধ ছিল। অরুণা তাঁকে বকাঝকা করেছিলেন। সেই রাতেই ডিউটি শেষ করে পোশাক পরিবর্তনের সময় সোহনলাল তাঁর উপর হামলা করে। কুকুর বাঁধার লোহার চেইন দিয়ে অরুণার গলা চেপে ধরে।
advertisement
অরুণার গলায় চেইন শক্ত করে বাঁধার কারণে তাঁর মস্তিষ্কে অক্সিজেন পৌঁছনো বন্ধ হয়ে যায়। পরদিন যখন তাকে খুঁজে পাওয়া যায় তখন তিনি জীবিত ছিলেন। কিন্তু তাঁর মস্তিষ্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়। তিনি পার্মানেন্ট ভেজিটেটিভ স্টেট (PVS)-এ চলে যান।এমন একটি অবস্থা যেখানে শরীর বেঁচে থাকে কিন্তু চেতনা কার্যত শেষ হয়ে যায়।
গাজিয়াবাদের হরিশ রানার ইচ্ছামৃত্যুর মামলার আগে ভারতে ইচ্ছামৃত্যু নিয়ে আলোচনায় এই ঘটনাই ছিল সবচেয়ে বড় উদাহরণ।নৃশংসতার শিকার অরুণা শানবাগ দীর্ঘ ৩৭ বছর ধরে হাসপাতালের বিছানায় অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিলেন। তাঁর দেখাশোনা পরিবার নয়, বরং মুম্বইয়ের সেই হাসপাতালের নার্সরাই করতেন। সবাই তাঁকে নিজের বোনের মতো দেখতেন। হাসপাতালের নার্সরাই তাঁকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বছরের পর বছর সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিলেন।
সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী পিঙ্কি বিরানি ২০০৯ সালে সুপ্রিম কোর্ট অব ইন্ডিয়া-এ অরুণা শানবাগ-এর জন্য ইচ্ছামৃত্যুর আবেদন দাখিল করেন। পিঙ্কি বিরানির যুক্তি ছিল, অরুণা প্রায় ৩০–৩৫ বছর ধরে একপ্রকার মৃতদেহের মতো জীবনযাপন করছেন, তাই তাঁকে এই দীর্ঘ কষ্ট থেকে মুক্তি দেওয়া উচিত।
অরুণা শানবাগ-এর জন্য ইচ্ছামৃত্যুর আবেদন করা হলে এর বিরোধিতা করেন মুম্বইয়ের হাসপাতালের নার্সরা। তাঁদের বক্তব্য ছিল, অরুণা তাঁদেরই একজন। তাঁকে মেরে ফেলার অধিকার দেওয়া যায় না। বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে দীর্ঘ শুনানি হয়।
২০১১ সালের ৭ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট অরুণা শানবাগের ইচ্ছামৃত্যুর আবেদন খারিজ করে দেয়। আদালত জানায়, তিনি “মৃত” নন, তিনি খাবার গ্রহণ করছেন এবং মাঝে মাঝে প্রতিক্রিয়াও দেখাচ্ছেন। আদালত তাঁর দেখাশোনা করা নার্সদের মতামত ও চিকিৎসা পরামর্শকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে।
তবে ওই মামলার মাধ্যমে আদালত ভারতে Passive Euthanasia বা নিষ্ক্রিয় ইচ্ছামৃত্যুকে আইনি স্বীকৃতি দেয়। অর্থাৎ কোনও রোগী যদি সম্পূর্ণ নিরাময়হীন অবস্থায় থাকেন, তা হলে আদালতের অনুমতি নিয়ে তাঁর লাইফ সাপোর্ট (যেমন ভেন্টিলেটর বা ফিডিং টিউব) সরিয়ে নেওয়া যেতে পারে।
আরও পড়ুন- হাসপাতালের বিল ছুঁয়েছে ১.৫ কোটি টাকা! ৪ বছর পার…কেন স্ত্রীকে বাড়ি নিয়ে যাননি স্বামী?
রায়ের পরও অরুণা আরও প্রায় চার বছর একই হাসপাতালের ওয়ার্ডে ছিলেন। পরে তিনি নিউমোনিয়া-তে আক্রান্ত হন। ২০১৫ সালের ১৮ মে, দীর্ঘ ৪২ বছরের সংগ্রামের পর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। হাসপাতালের কর্মীরাই তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করেন।
এই নৃশংস হামলার দায়ে অভিযুক্ত সোহনলাল ভাল্মিকি মাত্র ৭ বছরের সাজা ভোগ করে জেল থেকে মুক্তি পেয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা নয়, শুধু হত্যার চেষ্টা ও চুরির মামলা হয়। তবে অরুণা শানবাগের দীর্ঘ কষ্টের গল্প আজও ভারতে মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুর অধিকার (Right to Die with Dignity) নিয়ে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে আছে।
