ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটির (এনটিসিএ) সরকারি জাতীয় তথ্য এবং বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত সংরক্ষণ মূল্যায়নের ভিত্তিতে উত্তরটি স্পষ্ট। ভারত বিশ্বের বৃহত্তম বন্য বাঘের আবাসস্থল, যা রাশিয়া ও চিন উভয়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রকের অধীনে এনটিসিএ দ্বারা প্রকাশিত ২০২২ সালের বাঘ গণনা প্রতিবেদন অনুসারে, ভারতের বন্য বাঘের সংখ্যা আনুমানিক ৩,৬৮২টি, যা বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়ন করা ৩,১৬৭ থেকে ৩,৯২৫টি বাঘের সীমার মধ্যে রয়েছে। এটি ভারতকে বিশ্বের যে কোনও স্থানের তুলনায় বন্য বাঘের জন্য একক বৃহত্তম আবাসস্থলে পরিণত করেছে।
advertisement
এই সংখ্যা অনুসারে, ভারত বিশ্বের মোট বন্য বাঘের জনসংখ্যার প্রায় তিন-চতুর্থাংশের অধিকারী, যা আন্তর্জাতিক সংরক্ষণ সংস্থা এবং বিশ্বব্যাপী বাঘের আবাসস্থল রূপে পরিচিত দেশগুলোর মূল্যায়ন দ্বারাও ধারাবাহিকভাবে সমর্থিত। সংখ্যা বা আবাসস্থলের বৈচিত্র্যের দিক থেকে অন্য কোনও দেশ ভারতের ধারেকাছেও নেই। ভারতের বাঘগুলো ৫৮টি ঘোষিত ব্যাঘ্র সংরক্ষণাগারে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে, যা মধ্য ভারতের ঘন জঙ্গল এবং হিমালয়ের পাদদেশ থেকে শুরু করে তৃণভূমি, জলাভূমি এবং সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ পর্যন্ত এক অসাধারণ প্রাকৃতিক ভূখণ্ড জুড়ে বিস্তৃত। এই পরিবেশগত বৈচিত্র্য বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি সম্ভব করেছে।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের বাঘের পুনরুজ্জীবন একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম সফল সংরক্ষণ উদ্যোগ, বিশেষ করে দেশের উচ্চ মানব জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনা করে দেখলে তা স্বীকার করতেই হয়।
ভারতের বাঘের সংখ্যা বিশ্বেও কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাঘ একটি প্রথম সারির শিকারি প্রাণী, যার অর্থ হল তারা বাস্তুতন্ত্রে সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থান করে। বাঘের একটি ভারসাম্যপূর্ণ সংখ্যা সর্বদা ভারসাম্যপূর্ণ বনের ইঙ্গিত দেয়। এর কারণ হল, যে বনগুলো বাঘের সংখ্যাকে টিকিয়ে রাখে, সেগুলোতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাস্তুতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো থাকে। এর মধ্যে অন্যান্য প্রাণীও অন্তর্ভুক্ত।
বিশ্বের প্রায় ৭৫ শতাংশ বন্য বাঘ ভারতের সীমানার মধ্যে বসবাস করায় ভারত এখন আর শুধু বৈশ্বিক সংরক্ষণ প্রচেষ্টার একজন অংশগ্রহণকারী নয়, বরং এটি এই প্রজাতির টিকে থাকার প্রধান রক্ষক হয়ে উঠেছে। ভারতের বাঘের সংখ্যায় যে কোনও বড় ধরনের হ্রাস বিশ্বব্যাপী বাঘের সংখ্যার উপর তাৎক্ষণিক এবং গুরুতর প্রভাব ফেলবে।
ভারত কীভাবে বাঘের সংখ্যা হ্রাসকে উল্টে দিল
ভারতের সংরক্ষণ সাফল্য রাতারাতি আসেনি। এটি ১৯৭৩ সালে চালু হওয়া প্রজেক্ট টাইগার থেকে শুরু করে পাঁচ দশকের ধারাবাহিক নীতি, প্রয়োগ এবং বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের ফল। এনটিসিএ-র চার বছর অন্তর পরিচালিত জাতীয় গণনা কার্যক্রম এখন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণ কর্মসূচি হিসেবে বিবেচিত হয়। মধ্যপ্রদেশ, কর্নাটক, উত্তরাখণ্ড এবং মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যগুলো নিয়মিতভাবে দেশের শীর্ষ বাঘ-সমৃদ্ধ রাজ্যগুলির তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।
রাশিয়া: বাঘের সংখ্যায় দ্বিতীয় বৃহত্তম
রাশিয়া বিশ্বে বন্য বাঘের দ্বিতীয় বৃহত্তম আবাসস্থল। এই দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও রাশিয়ায় বাঘের সংখ্যা ভারতের তুলনায় অনেক কম। রাশিয়া প্রধানত আমুর বাঘ বা সাইবেরিয়ান বাঘের আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত (বন্য পরিবেশে ৫০০-৭৫০টি)। আমুর বাঘের আবাসস্থল হল রাশিয়ার সুদূর প্রাচ্যের শীতল বনভূমি।
রাশিয়ায় বাঘের আনুমানিক সংখ্যা কয়েক শত, যা এটিকে যে কোনও দেশের মধ্যে বাঘের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনসংখ্যায় পরিণত করেছে। বিশ্বের অন্যতম বিরল এবং ভৌগোলিকভাবে অনন্য বাঘের উপপ্রজাতিকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে রাশিয়ার কাজ সংরক্ষণবাদী সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কিন্তু প্রতিকূল জলবায়ু পরিস্থিতি, আবাসস্থলের পরিসর এবং খাদ্যের সহজলভ্যতার অভাবে রাশিয়া ভারতের মতো অনুপাতে বাঘের সংখ্যা বাড়াতে পারছে না।
চিন: বন্য বাঘের উপস্থিতি নগণ্য
চিনে বাঘের বেশ কয়েকটি উপপ্রজাতি ছিল, কিন্তু বাসস্থান ধ্বংস এবং মানুষের বিস্তারের কারণে বিগত কয়েক দশকে বন্য বাঘের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছে। বর্তমানে সেখানে মুক্তভাবে বিচরণকারী বন্য বাঘের সংখ্যা মোটেও উল্লেখযোগ্য নয়। চিনে বর্তমান প্রচেষ্টাগুলি মূলত বড়, স্থিতিশীল বন্য জনসংখ্যা পরিচালনার পরিবর্তে বাসস্থান পুনরুদ্ধার, শিকারের উপযোগী প্রাণীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণ পরিকল্পনার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে। ফলস্বরূপ, বন্য বাঘের সংখ্যার বৈশ্বিক র্যাঙ্কিংয়ে চিনের অবস্থান তেমন উল্লেখযোগ্য নয়।
যদিও ভারতের বাঘের জনসংখ্যা বিশ্বে বৃহত্তম, সংরক্ষণবাদীরা কেবল সংখ্যাগুলিকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। বাঘের জনসংখ্যা বৃদ্ধি নতুন চ্যালেঞ্জও নিয়ে আসে, বিশেষ করে মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাত, বাসস্থান এবং জলবায়ু-সম্পর্কিত চাপ। তবে, সংরক্ষণবাদীরা জোর দেন, ভবিষ্যতে সহাবস্থানের উপর মনোযোগ দিতে হবে। বাঘের সুরক্ষার এমন ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে সংরক্ষণের খরচ স্থানীয় জনগণকে বহন করতে না হয়।
ভারতে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি প্রমাণ করে যে বিলুপ্তি অবশ্যম্ভাবী নয়। যখন বাঘের সংখ্যা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তখন থেকে সংরক্ষণ প্রচেষ্টার মাধ্যমে তাদের সংখ্যা পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। এনটিসিএ-র সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুসারে, বর্তমানে আনুমানিক ৩,৬৮২টি বন্য বাঘের সংখ্যা নিয়ে ভারত বর্তমানে বাঘের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল হিসেবে বিশ্বে গৌরব অর্জন করেছে।
