আসলে, আমরা এই যুদ্ধের কথা বলছি না, বরং এই যুদ্ধের প্রসঙ্গে একটা প্রজেক্টের কথা বলা হচ্ছে। যদি সেটা বাস্তবায়িত হত, তাহলে ভারতের একটা বড় সমস্যা মিটে যেত। ভারত জল পাঠিয়ে তেল আনত আর ভারতের মানুষ প্রতিদিন মুম্বই-দুবাইয়ের মধ্যে আপ-ডাউন করত। এই কথা শুনে আপনার কল্পনাপ্রসূত মনে হতে পারে, কিন্তু এটা সত্যি। ভারতের মুম্বই শহরকে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সঙ্গে সমুদ্রে সুড়ঙ্গ বানিয়ে যুক্ত করার একটা পরিকল্পনা হয়েছিল। এটা ছিল একটা অনেক বড় প্রজেক্ট এবং এটা শেষ করতে ৫০০ থেকে ৬০০ বিলিয়ন ডলার খরচ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। যদি এই প্রজেক্টটা শেষ হতো, তাহলে সুড়ঙ্গের একদিকে হাইপারলুপ ট্রেন আর অন্যদিকে জল আর কাঁচা তেলের পাইপলাইন থাকত। এই প্রজেক্টের আওতায় ফুজায়রা মুম্বইয়ের সঙ্গে যুক্ত করার কথা ছিল। এই দূরত্ব প্রায় ২০০০ কিমি হতো।
advertisement
মুম্বই-ফুজায়রা সাবসি টানেল:
ইউএই-র এক সংস্থা ন্যাশনাল অ্যাডভাইজার ব্যুরো লিমিটেড এই প্রজেক্টের প্রস্তাব দিয়েছিল। কোম্পানির পরিকল্পনা ছিল ২০০০ কিমি দূরত্ব আল্ট্রা হাইস্পিড ম্যাগলেভ বা হাইপারলুপ টেকনোলজি দিয়ে সম্পূর্ণ করার। এর গতি ৬০০ থেকে ১০০০ কিমি প্রতি ঘণ্টা হতে পারত। মানে মুম্বই থেকে ফুজায়রাহ যেতে মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগত।
এই প্রজেক্টে হাইপারলুপ টিউব ট্রেন চালানোর সঙ্গে সঙ্গে সুড়ঙ্গে দু’টো বড় পাইপলাইন বিছানোর পরিকল্পনা ছিল। এর মধ্যে একটা পাইপলাইনের মাধ্যমে ইউএই থেকে কাঁচা তেল আর গ্যাস ভারত আনা হতো, আর অন্য পাইপলাইনের মাধ্যমে নর্মদা নদীর টাটকা জল দুবাই পৌঁছানো হতো।
এই প্রজেক্টের প্রস্তাব অনেক আগেই রাখা হয়েছিল। কিন্তু, আজও এই প্রজেক্ট শুধু কনসেপ্টের স্তরে আছে। এর উপর এখনও কোনও দৃঢ় অগ্রগতি হয়নি। এ নিয়ে ভারত আর আমিরশাহি সরকারের মধ্যে কোনও অফিশিয়াল চুক্তিও হয়নি। এই প্রজেক্টের ফিজিবিলিটি স্টাডি করানোর কথা নিয়েও আলোচনা হয়ে আসছে।
আরও পড়ুন– বেঙ্গালুরু ভূমি সঙ্কট: এমব্যাসি ডেভেলপমেন্টসকে ৩০ দিনের মধ্যে KIA-র ৭৮ একর জমি ফেরত দেওয়ার নির্দেশ
এই প্রজেক্ট কতটা গুরুত্বপূর্ণ:
রিপোর্ট অনুযায়ী, এই প্রজেক্টে যদি ভারত আর ইউএই এগিয়ে যেত, তাহলে এটা বিশ্বের সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্পগুলোর একটা হতো। এতে ভারত আর ইউএই-র মধ্যে যাতায়াত দিল্লি-মেরঠের মতো হয়ে যেত। এতে বিশাল অর্থনৈতিক উন্নতি হত। ভারতের বিশুদ্ধ আর মিষ্টি জল দিয়ে ইউএই সমৃদ্ধ হত আর ভারতও ইউএই-র তেল দিয়ে ধনী হতে পারত।
Photo: Reuters
স্ট্রেট অফ হরমুজ-এর দরকার পড়ে না:
এই প্রজেক্টের সামরিক গুরুত্বও অনেক বেশি। যদি এই প্রজেক্ট তৈরি হয়ে যেত তাহলে আজ স্ট্রেট অফ হরমুজ বন্ধ হওয়ার কারণে ভারত আর বিশ্বের অন্য দেশগুলির যে সমস্যা হচ্ছে সেটা হতো না। ওমান আর ইরানের মধ্যে অবস্থিত স্ট্রেট অফ হরমুজের রাস্তা দিয়ে দুনিয়ার প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহণ হয়। কিন্তু, এই টানেলের পরিকল্পনা ছিল ইউএই-এর ফুজায়রাহ থেকে মুম্বইকে কানেক্ট করার। এটা ইউএই-এর একমাত্র এমন জায়গা যা স্ট্রেট অফ হরমুজ থেকে আলাদা। কৌশলগতভাবে এই ফুজায়রাহ আমন-এর খাড়িতে অবস্থিত। এমন অবস্থায় যদি এই পাইপলাইন তৈরি হয়ে যেত তাহলে ভারত সরাসরি ইউএই থেকে তেল পেত। শুধু তাই না, স্ট্রেট অফ হরমুজ বন্ধ হলেও এর সাপ্লাইতে কোনও প্রভাব পড়ত না।
চিনকেও অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা:
এই প্রজেক্টের ধারণা ইউএই-এর ন্যাশনাল অ্যাডভাইজার ব্যুরো করেছিল। ওরা এটাকে শুধু মুম্বই পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না। ওদের পরিকল্পনা ছিল এই টানেল দিয়ে চিনকে অ্যাক্সেস দেওয়া। অর্থাৎ, ইউএই চায় এই টানেলকে মাঝখানে পাকিস্তানের গ্বদর পোর্টের সঙ্গে যুক্ত করতে। গ্বদর পোর্ট চিন ডেভেলপ করেছে। এতে চিনকে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে গ্বদর পোর্ট থেকে সরাসরি পৌঁছানোর সুযোগ মিলত। এইভাবে এই পুরো অঞ্চলে ব্যবসা অনেক বেড়ে যেত। যদি এটা হতো, তাহলে পশ্চিম এশিয়ার পুরো এলাকায় ভারত সরাসরি পৌঁছতে পারত। ভারত থেকে জল ছাড়াও টাটকা ফল আর সবজির জন্য বড় বাজার পাওয়া যেত। বদলে ভারতও কম দামে আর বাধাহীনভাবে তেলের সাপ্লাই পেত। এতে আমেরিকাও ভারতের ট্রেড ডিল আর ট্যারিফের হুমকির মধ্যে মাঝে মাঝে চোখ রাঙানোর চেষ্টা করত না।
প্রজেক্টের সবচেয়ে বড় বাধা কী:
এই প্রজেক্টের সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে এর ইঞ্জিনিয়ারিং দিক। এখনও পর্যন্ত পৃথিবীর কোথাও সমুদ্রের ভিতরে এত বড় টানেল তৈরি হয়নি। ব্রিটেন আর ফ্রান্সের মধ্যে সমুদ্রের নীচে একটা ৫০ কিমি লম্বা টানেল আছে, যেটা দুই দেশকে রেলপথে যুক্ত করে। এছাড়া ভারতেও আহমেদাবাদ-মুম্বই বুলেট ট্রেন প্রজেক্টের জন্য সমুদ্রের নীচে টানেল তৈরি হচ্ছে। কিন্তু, এর দৈর্ঘ্য শুধু ৭ কিমি। এই অবস্থায় ২০০০ কিমি লম্বা টানেল তৈরি করা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দিক থেকে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয় সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে এর খরচ। অনুমান করা হয়, এক কিমি লম্বা টানেল তৈরি করতে ২০০০ কোটি টাকার বেশি খরচ হবে। ফ্রান্স আর ব্রিটেনের মধ্যে ৫০ কিমি লম্বা টানেল তৈরি করতে ১৫ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছিল। মুম্বই-আমিরশাহির মধ্যে টানেলটা এর থেকে ৪০ গুণ বেশি লম্বা হবে। এই অবস্থায় এর খরচের হিসাব আপনি নিজেই করতে পারেন।
